৫. “সুতোকাটার যন্ত্র (চরকা) ভারতকে ধবংস করে দিয়েছে। অবশ্য এটা এমন একটা ঘটনা, যাতে সামান্যই যায় আসে।”—এম. তিয়েস: “দ্য লা এপিয়েতে”। তিয়েস এখানে সুতোকাটার যন্ত্রকে তাতের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন, যেটা “এমন একটা ঘটনা, যাতে আমাদের সামাই যায় আসে।”
৬. ১৮৬১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, (২য় খণ্ড, লণ্ডন ১৮৬৩) ইংল্যাণ্ড ও ওয়েলস-এ কয়লা খনিতে নিযুক্ত লোকসংখ্যা ছিল ২,৪৬৬১৩ জন, যাদের মধ্যে ৭৩,৫৪৫ জন ছিল ২০ বছরের নীচে এবং ১,৭৩,৬৭ জন ছিল, উপরে। ২০ বছরের নীচে যারা ছিল, তাদের মধ্যে ২০,৮৩৫ জন ছিল ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে, ৩০,৭১ জন ছিল ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে, ৪২,১০ জন ছিল ১৫ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। লোহা, তামা, সীসা, টিন এবং অন্যান্য খনিতে নিযুক্তদের সংখ্যা ছিল ৩,১৯,২২২ জন।
৭. ১৮৬১ সালে ইংল্যাণ্ড ও ওয়েলস-এ মেশিনারি তৈরিতে নিযুক্ত ছিল ৬০,৮০৭ জন। মালিক, করণিক, দালাল, শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধরে কিন্তু সেলাই-কল ইত্যাদির মত ছোট মেশিনের নির্মাতাদের বাদ দিয়ে) সিভিল ইঞ্জিনিয়র, মোট সংখ্যা ৩,৩২৯ জন।
৮. যেহেতু লোহা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাচামালগুলির মধ্যে একটি সেই হেতু আমি বলতে চাই যে ১৮৬১ সালে ইংল্যাণ্ড ও ওয়েলসে ছিল ১২৫,৭৭১ চাল লোহা লোহা-চালাইকার, যাদের মধ্যে ১২৩,৪৩০ জন ছিল পুরুষ, ২৩৪১ জন নারী। পুরুষদের মধ্যে ৩৮২ জন ২০ বছর বয়সের নীচে, ২৬২ জন তার উপরে।
৯. চার জন বয়স্ক লোকের একটি পরিবার, গুটি পাকানোর জন্য দুজন শিশু সহ, গত শতকের শেষে এবং এই শতকের শুরুতে, দৈনিক দশ ঘণ্টা শ্রম করে, উপার্জন করত সপ্তাহে ৪ পাউণ্ড। যদি কাজটা খুব জরুরি হত, তা হলে বেশি উপার্জন করতে পারত। তার আগে পর্যন্ত সুতোর সরবরাহে সব সময়েই ছিল ঘাটতির দুর্ভোগ। (গ্যাসকেল দি ম্যানুফ্যাকচারিক পপুলেশন অব ইংল্যাণ্ড পৃঃ ২৫-২৭)।
১০. এফ. এসে তাঁর “Lag…Klasse in England-এ দেখিয়েছেন এসব বিলাস-দ্রব্যাদি উৎপাদনে যারা কাজ করে, তাদের বিপুল অংশের কী শোচনীয় অবস্থা। “শিশু-নিয়োগ কমিশন”এর রিপোর্টগুলিতেও অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
১১. ১৯৬১ সালে ইংল্যাণ্ড ও ওয়ালেসে মার্চেন্ট সার্ভিসে ছিল ৯৪,৬৬৫ জন নাবিক।
১২. এদের মধ্যে মাত্র ১৭৭, ৫৯৬ জন পুরুষ, যাদের বয়স ১৩ বছরের উপরে।
১৩. এদের মধ্যে ৩৭,৫০১ জন নারী।
১৪. এদের মধ্যে ১৩৭,৪৪৭ জন পুরুষ। ব্যক্তিগত বাড়িতে কাজ করে না এমন একজনকেও এদের মধ্যে ধরা হয় নি। ১৮৬১ এবং ১৮৭০ সালের মধ্যে পুরুষ ভৃত্যের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। তা বেড়ে দাড়ায় ২৬৭,৬৭১। ১৮৪৭ সালে (জমিদারদের পশু-জননক্ষেত্রের জন্য) ছিল ২,৬৯৪ জন পশু-পালক, ১৮৬৯ সালে ছিল ৪,৯২১ জন। লণ্ডনের নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাড়িতে নিযুক্ত অল্পবয়সী কাজের মেয়েদের সাধারণ ভাবে বলা হয় বাদী।
.
সপ্তম পরিচ্ছেদ — কারখানা-ব্যবস্থার দ্বারা মেহনতি মানুষের বিকর্ষণ ও আকর্ষণ। তুলো ব্যবসায়ে সংকট
যে কোনো মানের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিবিদেরা স্বীকার করেন যে, নতুন মেশিনারি প্রবর্তন পুরনো হস্তশিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারে শ্রমিকদের উপরে সর্বনাশা ফল সৃষ্টি করে -এই হস্তশিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারের সঙ্গেই নোতুন মেশিনারি প্রথম প্রতিযোগিতা করে। তারা প্রায় সকলেই কারখানা-শ্রমিকের ক্রীতদাসত্বে শোক প্রকাশ করেন। এবং তাদের হাতে সেই মস্ত তুরুপের তাসটি কি, যেটি তারা খেলেন? সেটি হল এই যে, প্রথম প্রবর্তন ও বিকাশের যুগের বিভীষিকাগুলি প্রশমিত হবার পরে, মেশিনারি শ্রমের ক্রীতদাসদের সংখ্যা না কমিয়ে বরং বাড়িয়ে দেয় ! হ্যা, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি এই বীভৎস তত্ত্বটিতে—ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের চিরন্তন প্রকৃতি-নির্দিষ্ট ভবিতবতায় বিশ্বাসী প্রত্যেকটি “লোক-হিতৈষী ব্যক্তির কাছেই যা বীভৎস, সেই তত্ত্বটিতে—উল্লাস প্রকাশ করেন যে, অগ্রগতি ও অতিক্রান্তির একটা যুগের পরে, এমন কি তার চুড়ান্ত সাফল্যের পরে, কারখানা-ব্যবস্থা তার প্রথম প্রবর্তনের কালে যত শ্রমিককে পথে ছুড়ে দেয়, তার চেয়ে বেশি সংখ্যক শ্রমিককে পেষণ করে।[১]
এটা ঠিক যে কিছু ক্ষেত্রে, যেমন আমরা জেনেছি ইংল্যাণ্ডের পশম ও রেশম কারখানাগুলিতে, কারখানা-ব্যবস্থার অসাধারণ সম্প্রসারণ, তার বিকাশের বিশেষ এক পর্যায়ে, ঘটাতে পারে কর্ম-নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যায় কেবল আপেক্ষিক হ্রাসই নয়, অপেক্ষিক হ্রাসও। ১৮৬০ সালে, যখন পার্লামেন্টের নির্দেশে যুক্তরাজ্যের সমস্ত কারখানার একটি বিশেষ সুমারি তৈরি করা হয়, তখন কারখানা-পরিদর্শক মি বেকার-এর জেলায় অন্তর্ভুক্ত ল্যাংকাশায়ার, চেশায়ার ও ইয়র্কশায়ারের অংশগুলিতে কারখানার সংখ্যা ছিল ৬৫২টি; এদের মধ্যে ৫৭টিতে ছিল ৮৫,৬২২টি পাওয়ার লুম ৬৮,১৯, ১৪৬টি স্পিণ্ডল (ডাবলিং স্পিণ্ডল বাদে); এরা নিয়োগ করত ২৭,৪৩৯ অশ্বশক্তি ( বাম্প) ও ১৩৯০ অশ্বশক্তি (জল) এবং ৯৪, ১১৯ জন ব্যক্তি ১৮৬৫ সালে ঐ একই কারখানাগুলিতে লুমের সংখ্যা দাঁড়াল ১৫,১৬৩ স্পিণ্ড-এর ৭৩২৫ ৩১; বাপ-শক্তির পরিমাণ দাড়াল ২৮,৯২৫ অশ্ব এবং জলশক্তির ১৪,৪৫ অশ্ব; এবং কর্ম নিযুক্ত লোকের সংখ্যা দাড়াল ৮৮,৯১৩। অতএব, ১৮৬০ থেকে ১৮৩৫ এই পাঁচ বছরের মধ্যে লুমের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল ১১ শতাংশ, স্পিণ্ডল-এর ৩ শতাংশ, ইঞ্জিন-শক্তির পরিমাণ ৩ শতাংশ, কিন্তু কর্মনিযুক্ত লোকের সংখ্যা কমে গেল ৫২ শতাংশ। ১৮৫২ থেকে ১৮৬২ সালের মধ্যে ইংল্যাণ্ডের উল ম্যানুফ্যাকচার প্রভৃতি প্রসার ঘটে অথচ তাতে কর্মনিযুক্ত লোকের সংখ্যা থাকে প্রায় স্থির। এ থেকে বোঝা যায়, নোতুন নোতুন মেশিনের প্রবর্তন পূর্বতন কালের কত সংখ্যক শ্রমিকের স্থান দখল করছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে, নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি কেবল আপাত-দৃশ্য; অর্থাৎ ইতিপূর্বেই প্রতিষ্ঠিত কারখানাগুলির প্রসারণের দরুন এই বৃদ্ধি ঘটেনি, ঘটেছে সংষ্টি অন্যান্য ব্যবসাগুলিকে অজীভূত করে নেবার দরুন; যেমন, ১৮৩৮ থেকে ১৮৫৬-র মধ্যে তুলা-শিল্পে পাওয়ার লুমের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে কেবল এই শিল্পেরই প্রসারলাভের কারণে; কিন্তু অন্যান্য শিল্পে তা ঘটে কার্পেট-লুমে, রিবন-লুমে এবং লিনেন-লুমে বাম্পশক্তি প্রয়োগের কারণে; পূর্বে এগুলি চালিত হত মনুষ্য-শক্তির দ্বারা।[৪] সুতরাং; এই শেষোক্ত শিল্পগুলিতে কর্মী সংখ্যায় বুদ্ধি হচ্ছে কেবল মোট সংখ্যায় হ্রাসপ্রাপ্তিতে লক্ষণমাত্র। সর্বশেষে, আমরা এই সমগ্র প্রশ্নটিকে আলোচনা করেছি একটি ঘটনা থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে; সেই ঘটনাটি এই যে, ধাতব শিল্পগুলি ব্যতিরেকে সর্বত্রই অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা (যারা আঠারো বছরের কমবয়সী, তারা) এবং নারী ও শিশুরাই গঠন করে কারখানা কর্মীদের অধিপ্রধান অংশ।
