শ্রমিক-সংখ্যায় আপেক্ষিক হ্রাসের সঙ্গে উৎপাদন ওজীবনধারণের উপায়-সমূহের এই বৃদ্ধির ফলে খাল, ‘ডক (জাহাজঘাটা), টানেল’ (সুড়ঙ্গপথ ), সেতু ইত্যাদি তৈরি করার জন্য শ্রমিকেরা চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এই সব নির্মাণকার্য কেবল সুদূর ভবিষ্যতেই ফল করতে পারে। হয় মেনািরির, নয়ত, তজ্জনিত সাধারণ শিল্পগত পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ফল হিসাব সম্পূর্ণ নোতুন নোতুন উৎপাদন-শাখার উদ্ভব ঘটে এবং তার ফলে মের নোতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। কিন্তু এমনকি সবচেয়ে বিকশিত দেশগুলিতেও সামগ্রিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই উৎপাদনশাখাগুলির স্থান আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেগুলিতে কত সংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়, তা ঐসব শিল্প কত পরিমাণ স্থূলতম প্রকারের দৈহিক শ্রমের চাহিদা সৃষ্টি করে, তার সঙ্গে আনুপাতিক। বর্তমানে এই ধরনের প্রধান শিল্প হচ্ছে গ্যাস-কারখানা, টেলিগ্রাফি, বাষ্পীয় নৌ-চলাচল এবং রেলওয়ে। ইংল্যাণ্ড ও ওয়েলস-এর ১৮৬১ সালের আদমশুমারি অনুসারে আমরা দেখতে পাই যে গ্যাস শিল্পে (গ্যাস-কারখানা, মেকানিক্যাল অ্যাপারেটাসের উৎপাদন, গ্যাস-কোম্পানিগুলির কর্মীবৃন্দ ইত্যাদি) ছিল ১৫,২১১ জন ব্যক্তি, টেলিগ্রাফিতে ২,৩৯৯ জন, ফটোগ্রাফিতে ২,৩৬৬ জন। বাষ্পীয় নৌ-চলাচলে ৩,৫৭৩ জন এবং রেলওয়েতে ১,৫৯৯ জন, যাদের মধ্যে কম-বেশি স্থায়ীভাবে নিযুক্ত অদক্ষ “আনাড়িদের” এবং সমগ্র প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক স্টাফের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ২৮,০০০ জন। সুতরাং এই পাঁচটি শিলে মোট নিযুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা হল ৯৪,১৪৫ জন। সর্বশেষে, উৎপাদনের সমস্ত ক্ষেত্রে শ্রম-শক্তির আরো ব্যাপক ও আরো তীব্র শোষণের সঙ্গে সংযুক্ত আধুনিক শিল্পের অসাধারণ উৎপাদনশীলতা সুযোগ করে শ্রমিক-শ্রেণীর এক ক্ৰম-বৃহত্তর অংশের অনুৎপাদক কর্মসংস্থানের এবং নিরন্তরবর্ধমান আয়তনে প্রাচীন ঘরোয়া ক্রীতদাসের পুনরুৎপাদনের পরিচারক-শ্রেণী নামের আড়ালে এই ক্রীতদাস-শ্রেণীর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত থাকে পুরুষ-পরিচারক, নারী-পরিচারিকা, পার্শ্বচর-ভৃত্য ইত্যাদি। ১৮৬১ সালের আদম-সুমারি অনুযায়ী, ইংল্যাণ্ড ও ওয়েলসের জনসংখ্যা ছিল ২,০০,৬৬, ২৪৪; এদের মধ্যে পুরুষ ৯৭, ৬,২৫৯ এবং নারী ১,২,৮৯,৯৬৫। এই জনসংখ্যা থেকে যদি আমরা বাদ দিই এমন সকলকে যারা কাজের পক্ষে অতি বৃদ্ধ বা অতি কচি তাদেরকে, সমস্ত অনুৎপাদনশীল নারী, তরুণ ও শিশুদেরকে, সরকারী কর্মচারী, পুরোহিত, আইনজীবী ও সৈনিক ইত্যাদির মত “ভাবাদর্শগত” শ্ৰেণীসমূহকে এবং সেই সঙ্গে, এমন সকলকে যাদের খাজনা, সুদ ইত্যাদির আকারে অন্যের শ্রম পরিভোগ করা ছাড়া আর কোন পেশা নেই এবং সর্বশেষে, নিঃস্ব, ভবঘুরে ও দুবৃত্তদেরকে, তা হলে থাকে পুরো সংখ্যায় সব বয়সের নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে ৮০ লক্ষ মানুষ, যাদের মধ্যে ধরা হয়েছে এমন প্রত্যেকটি ধনিককে, যে কোন-না-কোন ভাবে শিল্প, বাণিজ্য বা ফিন্যান্স (অর্থসংস্থান )-এর কাজে লিপ্ত। এই ৮০ লক্ষের মধ্যে আছে।
কৃষি শ্রমিক (মেষপালক, খামার-কর্মী, কৃষকের বাড়িতে কর্ম নিযুক্ত ঝি সমেত) —১,৯৮,২৬১ জন
তুলো, উল, পশম, শণ রেশম ও পাট কলে এবং মেশিনারি সহযোগে মোজা ও লেম তৈরিতে নিযুক্ত এমন এমন সকলে –৬৪২,৬০৭[১২] জন
কয়লা ও ধাতুর খনিতে নিযুক্ত এমন সকলে— ৫৬৫,৮৩৫ জন
ধাতুর কারখানায় (ব্লাস্ট ফার্নেস, রোলিং মিল ইত্যাদি) এবং প্রত্যেক ধরনের মেটাল-ম্যানুফ্যাকচারে নিযুক্ত এমন সকলে— ৩৯৬,৯৯৮[১৩] জন
ভৃত্য-শ্রেণী—১,২৮,৬৪৮৩[১৪] জন।
কাপড়-কলে ও খনিতে নিযুক্ত এবং সকলকে ধরে সংখ্যা দাঁড়ায় ১,২০৮,৪৪২; কাপড় কলে ও ধাতু শিল্পে নিযুক্ত এমন সকলকে ধরে সংখ্যা দাঁড়ায় ১,৩৯,৬০৫; উভয় ক্ষেত্রেই সংখ্যাটি আধুনিক ঘরোয়া ক্রীতদাসদের সংখ্যার চেয়ে কম; মেশিনারির ধনতান্ত্রিক শোষণের কী চমৎকার ফল।
————
১. রিকার্ডোও গোড়ার দিকে এই মত পোষণ করতেন কিন্তু পরে তাঁর স্বভাবসুলভ বৈজ্ঞানিক নিরপেক্ষতা ও সত্যানুরাগের জন্য তিনি খোলাখুলি ভাবেই তা পরিহার করেন। (ঐ, “অন মেশিনারি”)।
২. দ্রষ্টব্যঃ আমার উদাহরণগুলি সম্পূর্ণ ভাবেই উল্লিখিত অর্থনীতিকদের প্রদত্ত নকশার অনুরূপ।
৩. জে বি সে-র মামুলিপনার জবাবে রিকার্ডোর এক শিষ্য বলেন, শ্রম-বিভাজন যেখানে বিকশিত, সেখানে শ্রমিকের দক্ষতা কেবল সেই শাখাতেই সুপ্রাপ্য, যে শাখাতে তা অর্জিত হয়েছে; সে নিজেই এক ধরনের মেশিন। সুতরাং, কেবল তোতা পাখির মত এই একই বুলি আউড়ে যাওয়া যে, জিনিসের স্বভাবই হচ্ছে নিজের মন খুজে নেওয়া—এতে কোনো সুরাহা হয় না। আমাদের চারদিকে তাকিয়ে আমরা এটা না দেখে পারি না যে সে তার মান অনেক কাল পর্যন্ত খুঁজে পায় না; এবং যখন তা পায় তখন সেই মানটি উক্ত প্রক্রিয়ার শুরুতে যা ছিল, তার চেয়ে নিচু।” (নিকুইরি ইনটু প্রিন্সিপলস নেচার অব ডিম্যাও,” লণ্ডন, ১৮২১, পৃ: ৭২)।
৪. অন্যান্যদের মধ্যে ম্যাককুলক-ও এই ধরনের হাবাগোবার ভান করতে একজন বাহাদুর ব্যক্তি। ৮ বছরের শিশুর কৃত্রিম সরলতার ভান দেখিয়ে তিনি বলেন, “যদি, শ্রমিকের দক্ষতার আরো বিকাশ সাধন করা সুবিধাজনক হয়, যাতে করে সে একই পরিমাণ বা অল্পতর পরিমাণ শ্রমের সাহায্যে নিরন্তরবর্ধিত পরিমাণে পণ্য উৎপাদন করতে পারে, তা হলে এটাও সুবিধাজনক হবে যে, সে এমন মেশিনারিরও সাহায্য গ্রহণ করবে যা তাকে এই ফল অর্জন করতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করে।” (ম্যাককুলক: “প্রিন্সিপলস অব পলিটিক্যাল ইকনমি,” লণ্ডন, ১৮৩৩, পৃঃ ১৬৬)।
