অতএব, যখন মেশিনারির ব্যবহার একটি নির্দিষ্ট শিল্পে প্রসার লাভ করে, তার আশু ফল হয় অন্যান্য শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধি, যে-শিল্পগুলি প্রথমোক্ত শিল্পটিকে উৎপাদনের উপকরণসমূহ সরবরাহ করে। তার দ্বারা কত সংখ্যক বাড়তি লোকের জন্য কর্মসংস্থান হয় তা নির্ভর করে, কাজের দিনের দৈর্ঘ্য ও শ্রমের তীব্রতা যদি নির্দিষ্ট থাকে তা হলে, বিনিয়োজিত মূলধনের গঠন-বিন্যাসের উপরে অর্থাৎ অ-স্থির উপাদানের সঙ্গে স্থির-উপাদানের অনুপাতের উপরে। এই অনুপাত আবার তার বেলায় প্রভূত ভাবে পরিবর্তিত হয় যে-মাত্রায় মেশিনারি ইতিমধ্যেই সেই ব্যবসাগুলি দখল করে নিয়েছে কিংবা তখনো দখল করে নিচ্ছে, সেই মাটির উপরে। ইংল্যাণ্ডে কারখানা ব্যবস্থার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কয়লা ও তামার খনির কাজে অভিশপ্ত লোকদের সংখ্যা বিপুল ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল, কিন্তু খনির কাজে নোতুন মেশিনারি প্রবর্তিত হবার দরুন গত কয়েক দশক ধরে এই বৃদ্ধি কম দ্রুত গতিতে ঘটেছে।[৬] মেশিনের সঙ্গে সঙ্গে নোতুন এক ধরনের শ্রমিকের জন্ম হয়—মেশিনের নির্মাণকারী। আমরা ইতিপূর্বেই জেনেছি, এমন কি উৎপাদনের এই শাখাটিকে মেশিন এমন আয়তনে অধিকার করে নিয়েছে যে আয়তন প্রতিদিনই বৃদ্ধি পায়।[৭] কাচামালের ক্ষেত্রে[৮] এবিষয়ে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই যে, সুতো কাটার প্রবল পদক্ষেপে অগ্রগতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেবল তুলে উৎপাদনে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রাচুর্য এবং আফ্রোদেশীয় দাস ব্যবসাতেই প্রেরণা সৃষ্টি করেনি, সেই সঙ্গে, তা সীমান্তের দাস-রাষ্ট্রগুলিতে দাস প্রজননকে প্রধান ব্যবসাতে পরিণত করল। যখন, ১৭৯০ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দাসদের প্রথম আদমসুমারি তৈরি হয়েছিল, তখন তাদের সংখ্যা ছিল ৩,৯৭,০০০; ১৮৬১ সালে এই সংখ্যা গিয়ে দাড়ায় প্রায় ৪০ লক্ষে। অপর পক্ষে, এটাও কম নিশ্চিত নয় যে, ইংল্যাণ্ডে উল-কারখানাগুলির উদ্ভব এবং সেই সঙ্গে আবাদি জমির মেষ-চারণ ভূমিতে রূপান্তর কৃষি-শ্রমিকদের সংখ্যায় ঘটাল মাত্রাতিরিক্ত বাহুল্য এবং দলে দলে তাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেল শহরগুলিতে। আয়াল্যাণ্ড গত কুড়ি বছরে তার জনসংখ্যাকে নামিয়ে এনেছে অর্ধেকে এবং এখন তার অধিবাসী-সংখ্যাকে আরো কমিয়ে আনছে, যাতে করে তা তার জমিদারদের এবং ইংল্যাণ্ডের উল-ম্যানুফ্যাকচারকারীদের প্রয়োজনের সঙ্গে সঠিক ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
শ্রমের বিষয়কে সম্পূর্ণতা লাভের জন্য যে সমস্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে পার হতে হয়, তাদের যে কোনো একটি পর্যায়ে যদি মেশিনারি প্রবর্তিত হয়, তা হলে সেই সমস্ত পর্যায়ে দ্রব্যসামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং সেই একই সঙ্গে হস্তশিল্পে ও ম্যানুফ্যাকচারে শ্রমের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়—সেই সব হস্তশিল্পে ও ম্যানুফ্যাকচারে যেগুলি তাদের সরবরাহ পায় মেশিন-জনিত উৎপন্নসভায় থেকে। যেমন, মেশিনারি দিয়ে সুতো কাটার দরুন সুতোর সরবরাহ এত সস্তা ও প্রচুর হল যে হাতে তঁত-চালকেরা প্রথমে সক্ষম হল বিনিয়োগ না বাড়িয়েও পুরো সময় কাজ করতে। সেই অনুসারে তাদের আয়ও বৃদ্ধি পেল।[৯] তার ফলে চলল তুলা-বয়ন শিরে জনতার স্রোত, যে পর্যন্ত না অবশেষে পাওয়ারলুম এসে ঠেলে ফেলে দিল সেই ৮,০০,০০০ মানুষকে যাদের স্থান করে দিয়েছিল ‘জেনি’, ‘খুশ-এবং ‘মিউল। ঠিক সেই ভাবে, মেশিনারি দ্বারা উৎপাদনের ফলে কাপড়ের দ্রব্যসামগ্রীর এত প্রাচুর্য দেখা দিল যে দর্জি, সেলাই ও সুচের কাজে নিযুক্ত মেয়েদের সংখ্যা বেড়েই যেতে থাকল, যে পর্যন্ত না সেলাই কলের আবির্ভাব ঘটল।
যে অনুপাতে মেশিনারি, অপেক্ষাকৃত অল্প লোকের সাহায্যে, কাঁচামাল, মধ্যবর্তী সামগ্রী, শ্রমের উপকরণ ইত্যাদির পরিমাণ বৃদ্ধি করে, সেই অনুপাতে এইসব কাচামাল ও মধ্যবর্তী সামগ্রীর প্রস্তুতি-প্রক্রিয়াও অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় ভাগ হয়ে যায়। সামাজিক উৎপাদনে বৃদ্ধি পায় বৈচিত্র্য। ম্যানুফ্যাকচার-ব্যবস্থা শ্রম বিভাজনকে যতদূর পর্যন্ত নিয়ে যায়, কারখানা-ব্যবস্থা তাকে নিয়ে যায় বহু বহু গুন দূরে; কারণ যে-সব শিল্প সে করায়ত্ত করে, তাদের উৎপাদশীলতাকে সে বাড়িয়ে দেয় অনেক উচু মাত্রায়।
মেশিনারির আশু ফল হল উদ্বৃত্ত-মূল্যের বৃদ্ধি এবং সেইসব দ্রব্যসম্ভারের উৎপাদন বৃদ্ধি, যার মধ্যে উদ্বৃত্ত-মূল্য বিধৃত থাকে। এবং ধনিক ও তাদের পরিবার-পরিজন যেসব দ্রব্যসামগ্রী পরিভোগ করে, সেগুলির প্রাচুর্য যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি বুদ্ধি পায় সে সবের জন্য সমাজের ফরমাশ। একদিকে, তাদের ঐশ্বর্যের বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে জীবনধারণের আবশ্যিক দ্রব্যাদি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক-সংখ্যায় হ্রাসের ফলে সৃষ্টি হয় বিবিধ নতুন ও বিলাসী অভাব এবং সেই সঙ্গে সেই অভাব-পুর্তির উপকরণ। সমাজের উৎপন্ন সম্ভারের একটা বৃহত্তর অংশ পরিবর্তিত হয় উদ্বৃত্ত উৎপয়ে এবং এই উদ্বৃত্ত-উৎপন্নের একটি বৃহৎ অংশ পরিভোগর জন্য সরবরাহ করা হ বহুবিধ সুসংস্কৃত আবারে। অন্যভাবে বলা যায়, বিলাসদ্রব্যাদির উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।[১০] বিশ্বের বাজারের সঙ্গে নোতুন নোতুন সম্পর্কের উদ্বোধনও উৎপন্ন-দ্রব্যাদির এই সংস্কৃত ও বিচিত্র রূপের জন্য দায়ী, আধুনিক শিল্প এই নোতুন সম্পন্দহের স্রষ্টা। কেবল যে স্বদেশে তৈরি দ্রব্যাদির সঙ্গে বিদেশে তৈরি বিলাস-ব্যাদির বিনিময় ঘটে, তাই নয়, সেই সঙ্গে বিদেশী কাঁচামাল, উপাদান, মধ্যবর্তী উৎপন্ন সামগ্রীও বিপুল পরিমাণে স্বদেশী শিল্পগুলিতে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বের বাজারের সঙ্গে এই সম্পর্কসূত্রের সুবাদে, পরিবহণ-ব্যবস্থাগুলিতে শ্রমের চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং এই ব্যবসাগুলি অসংখ্য প্রকারে বিভক্ত হয়।[১১]
