এটা একটা সন্দেহাতীত ঘটনা যে, মেশিনারি নিয়ে শ্রমিকদের তাদের জীবন ধারণের উপায়-উপকরণ থেকে মুক্ত করে দেবার জন্য দায়ী নয়। যেখানেই মেশিনারি আত্মবিস্তার করে, উৎপাদনের সেই শাখাতেই সে উৎপাদনকে সস্তা করে এবং বৃদ্ধি করে, এবং অপরাপর শাখায় উৎপাদিত জীবনধারণের উপায়-উপকরণের পরিমাণে গোড়ার দিকে কোনো পরিবর্তন ঘটায় না। অতএব, মেশিনারি প্রবর্তনের পরে কর্মচ্যুত শ্রমিকদের জন্য সমাজ পায়, আগেকার তুলনায় বেশি না হলেও, অন্তত সম-পরিমাণ জীবনধারণের সামগ্রী; এবং সেটা অ-শ্রমিকদের দ্বারা প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ উৎপন্ন সম্ভার অপচয়িত হয়, তা বাদ দিয়েই। এবং এই পয়েন্ট’-টির উপরেই আমাদের কৈফিয়ৎদাতারা দাড়িয়ে আছেন ! মেশিনারির গনতান্ত্রিক নিয়োগের সঙ্গে যেসব দ্বন্দ্ব ও বৈরিতা অবিচ্ছেদ্য, এরা বলেন, সেগুলির নাকি কোনো অস্তিত্ব থাকেনা, কেননা সেগুলির উদ্ভব স্বয়ং মেশিনারি থেকে নয়, মেশিনারির ধনতান্ত্রিক নিয়োগ থেকে ! সুতরাং যেহেতু মেশিনারিকে যদি আলাদা করে একক ভাবে বিবেচনা করা যায়, তা হলে সে শ্রমের ঘণ্টা কমিয়ে দেয়, কিন্তু যখন সে মূলধনের সেবায় নিয়োজিত থাকে তখন সে শ্রমের ঘণ্টা বাড়িয়ে দেয়, যেহেতু এককভাবে সে শ্রমের তীব্রতাকে হ্রাস করে এবং যখন সে নিযুক্ত থাকে মূলধনের অধীনে তখন তা বৃদ্ধি করে; যেহেতু একক ভাবে সে প্রকৃতির শক্তিসমূহের উপরে মানুষের জয়লাভের সূচক কিন্তু মূলধনের হাতে পড়ে পরিণত হয় ঐ শক্তিসমূহের ক্রীতদাসে; যেহেতু একক ভাবে সে উৎপাদনকারীদের ঐশ্বর্য বৃদ্ধি করে কিন্তু মূলধনের হাতে সে তাদের করে দেয় সর্বস্বান্ত—এই সমস্ত কারণে এবং আরো অন্যান্য কারণে, বুর্জোয়া অর্থবিকেরা বেশি হৈ চৈ না করেই বলে থাকেন যে, এটা দিনের আলোর মতই পরিষ্কার যে এই সব দ্বন্দ্ব-বিরোখ কেবল বাস্তবের আপাত-দৃশ্য রূপ মাত্র আসলে, এদের না আছে কোনো বস্তুগত অস্তিত্ব না আছে কোনো তগত অস্তিত্ব। এইভাবে ওঁর মন্তিকের অধিকতর বিভ্রান্তি থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে থাকেন; আরো বড় কথা, ওঁরা ইঙ্গিতে বলে থাকেন যে তাদের বিরোধিরা এত বোকা যে মেশিনারির ধনপন্ত্রিক নিয়োগের বিরুদ্ধে না দাড়িয়ে, তাঁরা পঁড়ান খোদ মেশিনারিরই বিরুদ্ধে।
সন্দেহ নেই, মেশিনারির গনতান্ত্রিক ব্যবহার থেকে যে কিছু সাময়িক অসুবিধা ঘটতে পারে, ওঁরা তা মোটেই অস্বীকার করেন না। কিন্তু এমন ‘মেছাল কোথায় আছে, যার এক পিঠ আছে, অন্য পিঠ নেই ! মূলধনের দ্বারা ছাড়া অন্য কোনো ভাবে তার নিয়োগ একটা অসম্ভব ব্যাপার। সুতরাং ওঁদের কাছে মেশিনের দ্বারা শ্রমিকের শোষণ এবং শ্রমিকের দ্বারা মেশিনের শোষণ অভিন্ন। অতএব, মেশিনারির ধনতান্ত্রিক নিয়োগে আসল অবস্থা কি দাঁড়ায় যিনিই সেটা উদঘাটিত করুন না কেন, তিনিই তার যে-কোনো ভাবে নিয়োগেরই বিরোধী; এবং সামাজিক প্রগতিরও শত্রু।[৪] প্রখ্যাত বিল স্কাইজ যে যুক্তি দিয়েছিলেন, অবিকল সেই যুক্তি। “জুরির ভদ্রমহোদয়গণ, কোনো সন্দেহ নেই যে এই বাণিজ্যিক সফরকারীর গলা কাটা হয়েছে। কিন্তু সেটা আমার দোষ নয়, সেটা ছুরিটার দোষ। এমন সাময়িক অসুবিধার জন্য কি আমাদের ছুরির ব্যবহারকে নির্বাসন দিতে হবে? কেবল ভেবে দেখুন, চুরির ব্যবহার বাদ দিলে কৃষি ও শিল্প কোথায় গিয়ে দাড়াবে? অঙ্গ-সংস্থানের ক্ষেত্রে যেমন সে উপকারক, অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রেও সে তেমন উপকারক নয় কি? অধিকন্তু, ভোজের টেবিলেও কি তা একটি স্বেচ্ছামূলক সহায়ক নয়? যদি আপনারা ছুরিকে নির্বাসনে পাঠান, তা হলে আপনারা ফের আমাদের বর্বরযুগের গভীরে ছুড়ে দেবেন।”[৫]
যদিও যেসব শিল্পে মেশিনারি প্রবর্তিত হয়, সেখানে অবধারিত ভাবেই মানুষকে কর্মচ্যুত হতে হয়, কিন্তু তৎসত্বেও তা অন্যান্য শিল্পে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ঘটালেও ঘটাতে পারে। অবশ্য, এই ফলের সঙ্গে তথাকথিত ক্ষতিপূরণ তত্বের কোন মিল নেই। যেহেতু হাতে তৈরি প্রত্যেকটি জিনিসের তুলনায় মেশিনে তৈরি প্রত্যেকটি জিনিস সন্ত হয়, সেই হেতু আমরা নিম্নলিখিত অভ্রান্ত নিয়মটি নির্ণয় করতে পারি : যদি মেশিনারি দ্বারা উৎপাদিত জিনিসটির মোট পরিমাণ পূর্বে হস্তশিল্প বা ম্যানুফ্যাকচারের দ্বারা উৎপাদিত, এবং এখন মেশিনারি দ্বারা তৈরি, জিনিসটির মোট পরিমাণের সমান হয়, তা হলে মোট ব্যয়িত শ্রম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। শ্রমের উপকরণসমূহের উপরে, মেশিনারির উপরে, কয়লা ইত্যাদির উপরে নোতুন যে-শ্রম ব্যয়িত হয় তা অবশ্যই মেশিনারি দ্বারা কর্মচ্যুত শ্রমের তুলনায় কম হবে; অন্যথায় মেশিনারির দ্বারা উৎপাদিত দ্রব্য দৈহিক শ্রমের-দ্বারা উৎপাদিত দ্রব্যের সমান মহার্ঘ বা অধিকতর মহার্ঘ হত। কিন্তু, কার্যত, অল্পতর সংখ্যক শ্রমিকের সাহায্যে মেশিনারি জিনিসটির যে-মোট পরিমাণ উৎপন্ন করে তা হাতে-তৈরি জিনিসটির মোট পরিমাণের সমান থাকেনা, তাকে টের ছাড়িয়ে যায় হাতে-তৈরি জিনিসটির যে পরিমাণটি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ধরা যাক, যতসংখ্যক তাতী হাত দিয়ে ১,০০,০০০ গজ কাপড় তৈরি করতে পারত, তার চেয়ে কম সংখ্যক তাঁতী পাওয়ারলুম দিয়ে ৪,৭০,৭৪০ গজ কাপড় তৈরি করেছে। চতুগুণিত উৎপন্ন সম্ভারে চারগুণ কাচামালের দরকার হয়েছে। কিন্তু শ্রমের উপকরণ সমূহের বেলায়, বাড়ি-ঘর, কয়লা, মেশিনারি ইত্যাদির বেলায় ব্যাপারটা অন্য রকম; সেগুলির উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনমত অতিরিক্ত শ্রম যে-মাত্রা পর্যন্ত বর্ধিত করা যায়, তা মেশিনে তৈরি জিনিসের পরিমাণ এবং সেই একই সংখ্যক লোক একই জিনিসের যে-পরিমাণ হাতে তৈরি করতে পারত—এই দুয়ের মধ্যেকার পার্থক্যের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।
