বাস্তবিক পক্ষে, এই কৈফিয়ৎদাতারা এই ধরনের মুক্তি দানের কথা বোঝান না। তাদের মনে আছে মুক্তিপ্রদত্ত শ্রমিকদের জীবনধারণের উপায়ের কথা। উল্লিখিত দৃষ্টান্তগুলিতে এটা অস্বীকার কথা যায় না যে, মেশিনারি কেবল ৫০ জন মানুষকে মুক্তিই দেয় না এবং এইভাবে তাদেরকে অন্যান্যের হাতে ছেড়েই দেয় না, সেই সঙ্গে সে তাদের গ্রাস থেকে তুলে নেয় এবং মুক্ত করে দেয় ১,৫০০ পাউণ্ড অল্যের জীবনধারণের দ্রব্যসামগ্রী। অতএব, মেশিনারি শ্রমিকদের বিচ্ছিন্ন করে দেয় তাদের জীন-ধারণের উপায় থেকে—এই সরল ঘটনাটি, যদিও তা কোন নোতুন ঘটনা নয়, যা বোঝায়, অর্থনৈতিক পরিভাষায় তা দাড়ায় এই যে, মেশিনারি শ্রমিকের জন্য জীবনধারণের উপায়সমূহকে মুক্ত করে দেয় অথবা তার কর্মসংস্থানের জন্য সেই উপায়সমূহকে মূলধনে রূপান্তরিত করে। তা হলে দেখতে পাচ্ছেন, প্রকাশ-ভজিটাই সবকিছু। “Nominibus mollire licet mala”
এই তত্ত্বের নিহিতার্থ এই যে, ১,৫০০ পাউণ্ড মূল্যের জীবনধারণের উপায় ছিল মূলধন, যা কৰ্মচ্যুত ৫০ জন মানুষের শ্রমের দ্বারা সম্প্রসারিত হচ্ছিল। অতএব, যে মুহূর্ত থেকে এই মানুষগুলি তাদের উপরে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ছুটি ভোগ করতে শুরু করে, সেই মুহূর্ত থেকেই এই মূলধন নিয়োগের বাইরে পড়ে যায় এবং যে-পর্যন্ত না তা কোনো নোতুন বিনিয়োগ খুজে পায়, যেখানে আবার তা এই ৫০ জন মানুষের বারাই উৎপাদনশীল ভাবে পরিভুক্ত হচ্ছে, সে পর্যন্ত তার বিরাম থাকে না। সুতরাং আজ হোক, কাল হোক, মূলধন এবং শ্রম পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হবেই। সুতরাং মেশিনারি দ্বারা কর্মচ্যুত শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশা এই জগতের ধন-সম্পদের মতই-অনিত্য।
কর্মচ্যুত শ্রমিকদের পরিপ্রেক্ষিতে ঐ ১,৫০০ পাউণ্ড মূল্যের জীবনধারণের উপায়গুলি কখনো মূলধন ছিলনা। যা মূলধন হিসাবে তাদের মুখোমুখি হল, তা হল পরবর্তী কালে মেশিনারিতে নিয়োজিত ঐ ১,৫০০ পাউণ্ডে। আরো একট নিবিড় ভাবে দেখলে দেখা যাবে যে, ঐ ১,৫০০ পাউণ্ড প্রতিনিধিত্ব করত ১৫০ জন কর্মচ্যুত শ্রমিক এক বছরে যে কার্পেট উৎপাদন করত, তারই একটা অংশ, যে অংশটি তারা তাদের নিয়োগকর্তার কাছ থেকে জিনিসপত্রের অঙ্কে না পেয়ে পেত নগদ টাকায় তাদের মজুরি হিসাবে। টাকার অঙ্কে কার্পেটের বিনিময়ে তারা কিনত ১৫০ পাউণ্ড মূল্যের জীবনধারণের উপায়। সুতরাং এই উপায়সমূহ তাদের কাছে মুলধন ছিল না, ছিল পণ্য এবং এই পণ্যগুলির ক্ষেত্রে তারা মজুরিশ্রমিক ছিলনা, ছিল ক্রেতা। তারা যে মেশিনারি থেকে, ক্রয়ের উপায় থেকে মুক্ত হয়েছিল, এই ঘটনা তাদেরকে পরিবর্তিত করেছিল ক্রেতা থেকে অক্ৰেতায়। এই কারণেই ঐ পণ্য গুলির চাহিদাও হ্রাস পেয়েছিল-“voila tout”। যদি এই হ্রাসপ্রাপ্তি জনিত ক্ষতি অন্য কোন মহল থেকে চাহিদা-বৃদ্ধির দ্বারা পূরণ না হয়, তা হলে পণ্যগুলির বাসায় ফর পড়ে যায়। যদি এই পরিস্থিতি কিছুকাল পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং দীর্ঘায়িত হয়, তা হলে আসে এই পণ্যসামগ্রী উৎপাদনে নিযুক্ত শ্রমিকদের কর্মচ্যুতি। জীবন ধরণের আবশ্যিক উপায়-উপকরণ উৎপাদনে পূর্বে যেমূলধন নিয়োজিত হত, এখন তার কিছু অংশ অন্য আকারে পুনরুৎপাদিত হতে হবে। যখন দাম পড়ে যায় এবং মূলধনের স্থানচ্যুতি ঘটছে, তখন জীবনধারণের উপায়-উপকরণের উৎপাদনে নিযুক্ত শ্রমিকেরা আবার তাদের বেলায় তাদের মজুরির একটা অংশ থেকে বঞ্চিত হয়। অতএব, যখন মেশিনারি শ্রমিককে তার জীবনধারণের উপায় থেকে মুক্ত করে, তখন তা সেই সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য এই উপায়গুলিকে মূলধনে রূপান্তরিত করে এই বক্তব্য প্রমাণ করার পরিবর্তে আমাদের কৈফিয়ৎদাতারা তাদের চাহিদা ও যোগানের পূর্বপ্রস্তুত নিয়মটির সাহায্যে বরং উল্টো এটাই প্রমাণ করেন যে, উৎপাদনের যে-শাখায় মেশিনারি প্রবর্তিত হয়, কেবল সেই শাখাতেই নয়, যে-সব শাখাতে হয় না, সেইসব শাখাতেও তা শ্রমিকদের পথে ছুড়ে দেয়।
আসল যে ঘটনা যা অর্থতাত্ত্বিকদের আশাবাদের প্রেরণায় হাস্যকর ভাবে উপস্থাপিত হয়, তা এই: যখন শ্রমিকেরা মেশিনারির দ্বারা কর্মশালা থেকে বিতাড়িত হয়, তখন তারা নিক্ষিপ্ত হয় শ্রমের বাজারে; এবং সেখানে বনিকের ইচ্ছামত ব্যবহারের জন্য যে-শ্রমিকেরা ভিড় করে আছে, তারা সেই ভিড়কে আরো ফীত করে। এই বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ে দেখা যাবে যে, মেশিনারির এই ফল, যা আমরা আগেই দেখেছি, দেখানো হয় এমিক-শ্রেণীর পক্ষে ক্ষতিপুরণ স্বরূপ, অথচ তা বরং উলটো। একটা ভয়াবহ অভিশাপ। আপাততঃ আমি কেবল এই কথাই বলব : শিল্পের কোন এক শাখা থেকে উৎখাত শ্রমিকেরা নিঃসন্দেহে অন্য কোন শাখায় কাজ খোয়। করতে পারে। যদি তারা তা পায় এবং এইভাবে তাদের নিজেদের এবং জীবন ধারণের উপায়সমূহের মধ্যেকার বন্ধন নোতুন করে স্থাপন করতে পারে, তা হলে সেটা অসম্ভব হয় কেবল এক নোতুন ও অতিরিক্ত মূলধনের মধ্যস্থতায়, যে মূলধন বিনিয়োগের সন্ধান করছিল কোন ক্রমেই সেই মূলধনের মধ্যস্থতায় নয়, যে তাদের পূর্বে নিয়োগ করেছিল এবং পরে মেশিনারিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। এবং যদি তারা কাজ পেয়েও থাকে, তা হলেও কী হতভাগ্য তাদের চেহারা! যেহেতু তারা শ্রম বিভাগের দ্বারা পঙ্গু, সেহেতু এই বেচারা শয়তানগুলোর মূল্য তাদের পুরনো কাজের বাইরে এত নগণ্য, যে তারা কয়েকটি অপকৃষ্ট ধরনের শিল্প ছাড়া—যেগুলি ইতিপুর্বেই স্বল্প মজুরির শ্রমিকদের দ্বারা জনাকীর্ণ’—সেগুলি ছাড়া, অন্য কোথাও প্রবেশাধিকার পায় না।[৩] অধিকন্তু, প্রত্যেক শিল্প প্রতি বছর আকর্ষণ করে একটি করে নোতুন শ্রম-শ্রোত, যা থেকে পূরণ করে নিতে হয় শূন্য স্থানগুলি এবং সংগ্রহ করে নিতে হয় সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ। যে মুহূর্তে মেশিনারি একটি নির্দিষ্ট শিল্প শাখায় নিযুক্ত শ্রমিকদের মুক্ত করে দেয়, সেই মুহূর্তে এই প্রতীম্মান কর্মপ্রার্থী মানুষগুলি ছড়িয়ে পড়ে কর্মসংস্থানের নোতুন নোতুন প্রবাহে এবং অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায় অন্যান্য শাখায়; ইতোমধ্যে, এই অতিক্রমণের কালে যে-শ্রমিকেরা গোড়ায় বলি হয়েছিল, তাদের অধিকাংশই উপোস করে থাকতে থাকতে শেষ হয়ে যায়।
