উৎপাদনকারী নিজে দ্রব্যের সঙ্গে অপরের দ্রব্য যখন বিনিময় করে, তখন সৰ্বপ্রথম একটিমাত্র প্রশ্ন তাকে কার্যতঃ পরিচালিত করে, সে প্রশ্নটি হলো-আমার কতটা জিনিসের বিনিময়ে অপরের কতটা জিনিস পাওয়া যাবে? বিনিময়ের এই অনুপাত যখন প্ৰচলিত প্ৰথাম্বারা কতকটা নির্দিষ্ট হয়ে যায়, তখন মনে হয় যেন দ্রব্যগুণ থেকেই এই অনুপাতের উৎপত্তি হয়েছে; যেমন এক টন লোহার বিনিময়ে যদি দুই আউন্স সোনা পাওয়া যায় তাহলে মনে হয় যেন এক টন লোহা এবং দুই আউন্স সোনার মূল্য স্বভাবতই সমান, ঠিক যেমন লোহা এবং সোনা ভিন্ন ভিন্ন পদার্থ হওয়া সত্ত্বেও এক টন লোহা এবং এক টন সোনার ওজন সমান। বিবিধ দ্রব্যের মূল্য যখন একবার ঠিক হয়ে যায়। তখন তাদের যোগাযোগ চলতে থাকে মূল্যের বিভিন্ন পরিমাণ রূপে, এই যোগাযোগের ভিতর দিয়েই নির্ধারিত হয়ে যায় যে দ্রব্য মাত্রেরই মূল্য আছে। মূল্যের পরিমাণ অনবরতই পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তন উৎপাদনকারীদের ইচ্ছা দূরদৃষ্টি এবং কার্যকলাপের উপর নির্ভর করে না। তাদের কাছে, তাদের নিজেদের এই সামাজিক ক্রিয়া দ্ৰব্য-সমূহের সামাজিক ক্রিয়াকাপে প্ৰতীয়মান হয়; দ্রব্যই ওদের পরিচালক, ওরা দ্রব্যের পরিচালক নয়; পণ্যের উৎপাদন পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হবার পরেই সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে এই বৈজ্ঞানিক ধারণা জন্মলাভ করে যে প্ৰত্যেকের ব্যক্তিগত কাজ ভিন্ন, কারো সঙ্গে কারোর কাজের দম্বন্ধ নেই, তবু, স্বতস্ফুর্তভাবে প্ৰত্যেকের কাজেই সামাজিক শ্রম-বিভাগের এক একটি শাখায় পরিণত হচ্ছে এবং সমাজের চাহিদা অনুসারে নিরন্তর নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে সবার কাজের পরিমাগত অনুপাত। কেন এমন হয়? কারণ, ঘটনাচক্ৰে এক দ্রব্যের সঙ্গে অন্য দ্রব্যের যে পরিবর্তনশীল বিনিময়-জনিত সম্বন্ধ তৈরী হয়, তার ভিতর দিয়ে অপ্ৰতিহত প্ৰাকৃতিক নিয়মের মতই দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে যে দ্রব্যের উৎপাদনে সামাজিক প্রয়োজীনয় শ্রম সময় কতটা। যখন কানের কাছে কোন বাড়ি ধ্বসে পড়ার শব্দ হয়, তখন মহাকর্ষের নিয়ম এমনি ভাবেই তার কাজ করে যায়।(৩) কাজেই শ্ৰম-সময়ের দ্বারা মূল্যের পরিমাণ নির্ধারণ এমন একটি গৃঢ়তত্ত্ব যা লুকিয়ে থাকে পণ্যের আপেক্ষিক মূল্যের বাহ উত্থান-পতনের ভিতর – এই গৃঢ়তন্থের আবিষ্কারের ফলে ঘটনাচক্ৰে বাহত যা ঘটে, তা দিয়ে মূল্যের পরিমাণ নির্ধারণ করা বন্ধ হয়, কিন্তু যে প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে মূল্য নির্ধারিত হয়। সেই প্রক্রিয়ার কোন হেরফের তাতে আদৌ হয় না।
সামাজিক জীবনের রূপ যে ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের রাস্তা ধরে অগ্রসর হয়, মানুষের চিন্তার ভিতর তা প্ৰতিফলিত হয় ঠিক তার বিপরীতভাবে, সুতরাং বিপরীত ভাবেই তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ হয়ে থাকে। হাতের কাছে যুগপরিবর্তনের যে ফলাফল পাওয়া যায়। তাই নিয়েই লোক সামাজিক রূপের বিশ্লেষণ আরম্ভ করে পিছন দিকে মুখ করে। যে চরিত্র দ্বারা শ্ৰমোৎপন্ন দ্রব্য পণ্যরূপে চিহ্নিত হয় এবং পণ্য বিনিময়ের প্রাথমিক শর্তস্বরূপ শ্ৰমজাত দ্রব্যকে যে চরিত্র লাভ করতেই হবে, লোকে তার অর্থ আবিষ্কার আরম্ভ করার আগেই তা সমাজের স্বাভাবিক এবং স্বতঃসিদ্ধ রূপ হিসেবে প্ৰতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তখন, তার অর্থ কি তাই খোজ করা হয়, তার ঐতিহাসিক চরিত্র কি লোকে তা খোজে না, কেননা, তার চোখে সেই চরিত্রটি হলো সনাতন সত্য। কাজেই, পণ্যের দাম বিশ্লেষণ করতে গিয়েই মূল্য নির্ধারণের তত্ত্ব পাওয়া গেছে এবং যখন অর্থ দিয়ে সমস্ত পণ্যের পরিচয় দেওয়া শুরু হয়েছে, তখন সেই সূত্র অনুসরণ করে জানা গেছে যে পণ্যের পরিচয় হচ্ছে মূল্য। অবশ্য, পণ্য-জগতের ঠিক এই সর্বশেষ অৰ্থরূপটিই ব্যক্তিগত শ্রমের সামাজিক চরিত্র এবং উৎপাদনকারীদের সামাজিক সম্পর্ক খুলে ধরার পরিাবর্তে, তাকে ঢেকে রাখে। যখন বলি যে জামা এবং জুতোর সঙ্গে ছিট কাপড়ের সম্পর্ক আছে, কারণ পণ্য মাত্রই নিবিশিষ্ট সর্বজনীন মনুষ্যশ্ৰম, তখন স্বতঃই মনে হয়। কথাটা একেবারে আজগুবি। কিন্তু যখন কারিগর জামা এবং জুতোর তুলনা করে ছিটা কাপড়ের সঙ্গে অথবা, ধরা যাক, সোনা এবং রূপোর সঙ্গে ছিট কাপড় অথবা সোনা রূপোকে সর্বজনীন সমঅৰ্থ হিসেবে ধরে নিয়ে,–তখন সে তো নিজ ব্যক্তিগত শ্রমের সঙ্গে সমবেত সামাজিক শ্রমের সম্বন্ধ নির্ণয় করে সেই নেশাগ্ৰস্ত লোকটিক্স মতই।
বুর্জোয়া অর্থনীতির বর্গগুলি সবই এই রকম। পণ্যের উৎপাদন ঐতিহাসিক ক্ৰমবিকাশ সুত্রে বিকশিত উৎপাদনের একটি বিশেষ ধরন, উৎপাদনের এই বিশিষ্ট ধরুন থেকে যে সমস্ত অবস্থা এবং সম্পর্ক আবির্ভূত হয়, সেগুলিই সামাজিক অনুমোদনসহ চিন্তার ভিতর দিয়ে তত্ত্বরূপ ধারণ করে, এই রকম নানা তত্ত্বই বুর্জেীয়া অর্থনীতির নানা বর্গ। পণ্যের সমগ্র কুহেলিকা, পণ্যত্ব প্ৰাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে শ্ৰমোৎপন্ন দ্রব্যকে ঘিরে রাখে। যত ইন্দ্ৰজাল-উৎপাদনের অন্য ধরনের সময় তার কিছুই থাকে না।
রাষ্ট্ৰীয় অর্থনীতিবিদদের কাছে রবিনসন ক্রুশোর অভিজ্ঞতা একটি প্রিয় বিষয়।(৪) তার দ্বীপে তার দিকে একবার তাকানো যাক। যদিও ক্রুশোর চাহিদা খুব কম, তবু তারও কিছু অভাব পূরণ করতে হয়, সেজন্য যন্ত্রপাতি ও আসবাব তৈরী, ছাগল পোষা, মাছ ধরা এবং শিকার প্রভৃতি নানা ধরনের কিছু কিছু কাজও তাকে করতে হয়। উপাসনা প্ৰভৃতি ধরছি না, কারণ সেগুলি তার আমোদ-প্ৰমোদের সূত্র এবং ঐ জাতীয় কাজগুলিকে সে অবসর সময়ের চিত্ত বিনোদন হিসেবেই দেখে। তার কাজের এই বৈচিত্ৰ্য সত্ত্বেও সে জানে যে তার শ্রমের ধরন যাই হোক না কেন, তার সমস্ত শ্রমই এক রবিনসন ক্রুশোর শ্রম, সুতরাং তা মনুষ্য শ্রমের বিভিন্ন রূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রয়োজনের তাগিদে বিভিন্ন কাজের মধ্যে সে তার সময়ের যথাযথ বণ্টন করতে বাধ্য হয়। সমস্ত কাজের মধ্যে কোন কাজের জন্য সে বেশি। সময় দেবে আর কোন কাজের জন্য কম সময় দেবে তা নির্ভর করে যে কাজের যা উদ্দেশ্য তা সফল কত্ববার জন্য কম কিংবা বেশি। কত বাধা অতিক্রম করতে হবে তার উপরে। আমাদের বন্ধু এই রবিনসন সত্বরই অভিজ্ঞতা থেকে শেখে, একটি ঘড়ি, একটি জমাখরচের খাতা, কলম এবং কালি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করে। খাটি ব্রিটনের মত কয়েকটি খাতা তৈরী করতে আরম্ভ করে। তার খরচায়। সে টুকে রাখে। তার হাতে কি কি ব্যবহারযোগ্য দ্রব্য আছে, ওসব তৈরি করতে তার কি কি কাজ করতে হবে, এবং সর্বশেষে কোন উৎপাদনে গড়ে কত সময় তার লাগে, এই সবের একটি তালিকা। রবিনসনের সঙ্গে তার সৃষ্ট এই সমস্ত সম্পদের যত সম্পর্ক আছে তা এত সরল এবং এত স্পষ্ট যে সেভ লি টেইলর সাহেবও তা অনায়াসে বুঝতে পারেন। অতএব, এই সম্পর্কের ভিতরই মূল্য নির্ধারণের জন্য যা কিছু অপরিহার্য তার হদিশ পাওয়া যায়।
