১৮৬১ থেকে ১৮৬৮-র মধ্যে ৩৩৮টি তুলল কারখানার অবলুপ্তি ঘটল; অন্য ভাবে বলা যায়, অল্পতর সংখ্যক বনিকের হাতে আরো বৃহৎ আয়তনে অধিকতর উৎপাদক মেশিনারি কেন্দ্রীভূত হল। পাওয়ারলুমের সংখ্যা ২০,৬৬৩টি কমে গেল, কিন্তু সেই সঙ্গে যেহেতু তাদের উৎপন্ন বেড়ে গেল, সেইহেতু এই উন্নততর সুম নিশ্চয় পুরনো লুমের তুলনায় বেশি পরিমাণ উৎপাদন করেছিল। সর্বশেষে, টাবুর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল ১৬,১২,৪১টি, অথচ কর্মীর সংখ্যা কমে গিয়েছিল ৫৩,৫৫ জন। তুলো-সংকট-কর্তৃক শ্রমজীবী মানুষদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া অস্থায়ী অসুবিধা” মেশিনারি ক্ষত ও ক্রমাগত অগ্রগতির ফলে তীব্রতর হল, অস্থায়ী থেকে চিরস্থায়ী হল।
কিন্তু মেশিনারি কেবল শ্রমিকের এমন একটি প্রতিযোগী হিসাবেই কাজ করে না যে তাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়, সেই সঙ্গে তাকে সব সময়েই বাহুল্যে পরিণত হবার আশংকায় ঝুলিয়ে রাখে। মেশিনারি এমন একটি শক্তি, যা তার পক্ষে ক্ষতিকারক এক এই কারণেই মূলধন সোস্টারে তার গুণকীর্তন করে এবং তাকে ব্যবহার করে। মূলধনের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শ্রমিক-শ্রেণী মাঝে মাঝে যে বিদ্রোহ করে-যাকে বলা হয় ধর্মঘট, তা দমন করার পক্ষে মেশিনারি হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।[১৫] গ্যাসকেল-এর মতে, শুরু থেকেই ঠিম-ইঞ্জিন ছিল মনুষ্য-শক্তির বৈরী-এমন এক বৈরী যা ধনিককে সক্ষম করেছিল শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান দাবিদাওয়াকে পায়ের তলায় মাড়িয়ে দিতে, যারা নবজাত কারখানা ব্যবস্থার সামনে সৃষ্টি করেছিল এক সংকটের আশংকা।[১৬] ১৮৩ সাল থেকে একমাত্র শ্রমিক-শ্রেণীর বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যেই ধনিকের হাতে অস্ত্র তুলে দেবার জন্য যে-সমস্ত উদ্ভাবন সংঘটিত হয়েছিল, তা নিয়ে রীতিমত একটা ইতিহাস বচনা করা সম্ভব। এই সমস্ত উদ্ভাবনের শীর্ষে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় মিউল, কেননা তা খুলে দিয়েছিল স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় এক নোতুন যুগ।[১৭]
১৮৫১ সালে বহুবিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘটগুলির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মেশিনারিতে যেসমস্ত উৎকর্ষ সাধন করেন এবং সেগুলিকে প্রবর্তন করেন, সে সম্পর্কে ট্রেড ইউনিয়ন কমিশনের সামনে ‘মি-হামার’-এর উদ্ভাবক ন্যাসমিথ যে সাক্ষ্য দেন, তা এই : আমাদের আধুনিক যান্ত্রিক উন্নয়নগুলির অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হল স্বয়ংক্রিয় টুল-মেশিনারির প্রবর্তন। এখন যা একজন মেকানিক-কর্মীকে করতে হয়, এবং যা প্রত্যেক বালকই করতে পারে, তা এই যে, নিজে কোনো কাজ না করে কেবল মেশিনের মনোরম শ্রম তত্ত্বাবধান করা। যারা তাদের দক্ষতার উপরে দাড়িয়েছিল, সেই মিকদের গোটা শ্ৰেণীটাকেই উচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। অতীতে আমি প্রত্যেক মেকানিক-পিছু চারজন করে বালক নিযুক্ত করতাম। এই নোতুন যান্ত্রিক সংযোজনগুলির কল্যাণে, আমি বয়স্ক লোকদের সংখ্যা ১,৫০০ থেকে কমিয়ে ৭৫ করেছি। তার ফলে আমাদেৱ মুনাফা প্রভূত পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ক্যালিকো ছাপাবার কাজে ব্যবহৃত একটি মেশিন প্রসলে উয়ে বলেন, শেষ পর্যন্ত খনিকেরা এই অসহ্ন বন্ধন থেকে মুক্তির (অর্থাৎ, তাদের ভাষায়, শ্রমিকদের সঙ্গে চুক্তির দুর্বহ শর্তগুলি থেকে অব্যাহতির) সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানের অবদানের মাধ্যমে; এবং অচিরে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেন তাদের বিধিসম্মত কর্তৃত্বের আসনে-অধস্তন সদস্যদের উপরে কর্তাব্যক্তির যে কর্তৃত্ব, সেই আসনে। কাঠিমে সুতো পাকাবার জন্ত একটি আবিক্রিয়ার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তার পরে সেই সমবেত বিক্ষোভকারীরা, যারা নিজেদের কল্পনা করে নিয়েছিল পুরনো শ্রম-বিভাগের প্রতিরক্ষাগণ্ডীর পশ্চাতে – দুর্ভেদ্যভাবে সংরক্ষিত বলে, তারা দেখতে পেল নোতুন যান্ত্রিক রণকৌশলের মুখে তাদের সেই প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা অকার্যকারী হয়ে পড়েছে এবং তারা বাধিত হল স্বেচ্ছায় আত্ম সমর্পণ করতে।” স্বয়ংক্রিয় মিউলের উদ্ভাবন সম্পর্কে তিনি বলেন, এমন একটি সৃষ্টি বা শ্রমজীবী শ্রেণীগুলির মধ্যে শৃংখলা ফিরিয়ে আনবার জন্য পূর্ব-নির্দিষ্ট।”এই উদ্ভাবন সেই মহান তত্ত্বটিকেই সপ্রমাণ করে, যা ঘোষণা করে, যখন মূলধন বিজ্ঞানকে তার সেবায় নিয়োজিত করে, তখন শ্রমের অবাধ্য হাত বিনয়ী হতে শিক্ষা পায়।[১৮] যদিও উল্লিখিত গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ৩০ বছর আগে, এমন এক সময়ে যখন কারখানা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছিল তুলনামূলকভাবে খুব সামান্যই, তবু তা আজও কেবল তার অনাবৃত উন্নাসিকতাকেই নয়, সেই সঙ্গে বনিকমস্তিষ্কের নিরেট বগুলি তুলে ধরার নিবুদ্ধিতাতেও প্রকাশ করে কারখানা-ব্যবস্থার মর্মব। যেমন, মূলধন তার বেন ভোগী বিজ্ঞানের সহায়তায় সব সময়েই অবাধ্য শ্রমের হাতকে বিনয়ী করে তোলে। উল্লিখিত এই তত্ত্বটি উপস্থিত করার পরে, তিনি তার ক্রোধ প্রকাশ করেন এই কারণে যে, একে ( ফিজিওমেকানিক্যাল বিজ্ঞানকে) অভিযুক্ত করা হয়েছে শ্রমিককে হয়রান করার কাজে ধনিকের কাছে নিজেকে বিক্রি করার জন্য। মেশিনারির দ্রুত অগ্রগমন শ্রমিকদের স্বার্থে কত সুবিধাজনক, সে সম্পর্কে এক দীর্ঘ বাণী প্রচারের পরে তিনি তাদের হুশিয়ারি দিয়ে বলেন যে নিজেদের একগুয়েমি ও ধর্মঘটের দ্বারা তারাই মেশিনের অগ্রগমন ত্বরান্বিত করছে। তিনি বলেন, এই ধরনের প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া স্বল্পদর্শী ‘ব্যক্তিকে প্রকাশ কৱে আত্ম-নিপীড়কের ঘণাহ চরিত্রে। কয়েক পৃষ্ঠা আগেই তিনি কিন্তু বিপরীত কথা বলেছেন, কারখানা-কর্মীদের মধ্যে যেসব ভ্রান্ত ধারণা চালু আছে, তার ফলে প্রচণ্ড সংঘর্ষ ও ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়; তা যদি না হত, তা হলে কারখানা-ব্যবস্থা আরো দ্রুত বেগে এবং সংশ্লিষ্ট সকলের পক্ষে আরো কল্যাণকভাবে বিকশিত করা যেত। তার পরে তিনি আবার চেঁচিয়ে ওঠেন, “গ্রেট ব্রিটেনের তুলা-প্রধান জেলা গুলির সামাজিক অবস্থার পক্ষে এটা সৌভাগ্য যে, মেশিনারির উন্নতি ঘটেছে ক্রমাণ্বয়ে। ‘শোনা যায়, বয়স্ক শ্রমিকদের একাংশকে স্থানচ্যুত করে এবং এইভাবে চাহিদার তুলনায় তাদের সংখ্যার অতি-প্রাচুর্য ঘটিয়ে মেশিনারির উন্নতি তাদের উপার্জনের হার কমিয়ে দেয়। কিন্তু তা নিশ্চিতভাবেই শিশুশ্রমের চাহিদা বৃদ্ধি করে এবং শিশু-শ্রমিকদের মজুরির হারও বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে আবার, এই সান্ত্বনা-বণ্টনকারী ব্যক্তিটিই কিন্তু মজুরির নিচু হার শিশুদের মাতা-পিতাকে বিরত করে তাদেরকে অতি অল্প বয়সে কারখানায় পাঠানো থেকে—এই যুক্তিতে মজুরির নিচু হারকে সমর্থন করেন। তাঁর গোটা বইটাই হচ্ছে বিধি-নিষেধহীন কর্ম-দিবসের সপক্ষে কৈফিয়ৎ; পার্লামেন্ট যে ১৩ বছরের শিশুদের ১২ ঘণ্টার কর্মদিবসের দ্বারা নিঃশেষিত করে দেবার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, তাতে তার মনে পড়ে যায় মধ্য যুগের অন্ধকার দিনগুলির কথা। তাতে অবশ্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদজ্ঞাপনের জন্য কারখানা-শ্রমিকদের আহ্বান জানাতে তার পক্ষে কোনো বাধার সৃষ্টি হয় না, কেননা মেশিনারির মাধ্যমে তিনিই তাদের দিয়েছেন তাদের অবিনশ্বর স্বার্থসমূহ সম্পর্কে চিন্তা করবার অবকাশ।[১৯]
