শ্রমের উপকরণ এমিককে দাবিয়ে রাখে। পুরাগত হস্তশিল্প বা ম্যানুফ্যাকচারের সহে নব-প্রবর্তিত মেশিন যখন প্রতিযোগিতা করে, তখন শ্রম-উপকরণ এবং শ্রমিকের মধ্যে এই প্রত্যক্ষ বৈরিতা সবচেয়ে প্রবলভাবে প্রকট হয়ে ওঠে। কিন্তু এমন কি আধুনিক শিল্পেও মেশিন্মরির ক্রমাগত উৎকর্ষ এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার বিকাশেরও ফল হয় অনুরূপ। “মেশিনারির উৎকর্ষসাধনের উদ্দেশ্য হয় দৈহিক শ্রমের লাঘব করা এবং কোন কিছু উৎপাদনে মনুষ্য-যন্ত্রের পরিবর্তে লৌহ-যন্ত্রের মাধ্যমে কোন প্রক্রিয়া সম্পাদন করা অথবা কোন সংযোগের সংস্থান করা।”[৭] “এতাবৎকাল যা ছিল হস্তচালিত, সেই মেশিনারির সঙ্গে শক্তির উপযোজন প্রায় একটি প্রাত্যহিক ঘটনা: মেশিনারিতে ছোট-খাট উন্নয়ন যার উদ্দেশ্য থাকে শক্তির সাশ্রয়সাধন, উন্নততর কাজের উৎপাদন, একই সময়ের মধ্যে অধিকতর কাজ সম্পাদন কিংবা একটি শিত বা নারী বা লোকের স্থান পূরণ, তেমন উন্নয়ন চলতেই থাকে এবং যদি কখনো কখনো বাহ্যতঃ তা খুব গুরুত্বপূর্ণ না-ও হয়, কার্যত বেশ কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ ফলপ্রসূ।”[৮] যখনি কোন প্রক্রিয়ার দরকার হয় হাতের বিশেষ ধরনের কুশলতা ও অবিচলতা, তখনি যথাসম্ভব শীঘ্র তা তুলে নেওয়া হয় কৌশলী শ্রমিকের কাছ থেকে, কেননা তার নানা রকমের অনিয়মিকতা ঘটতে পারে; সেই প্রক্রিয়াটি তখন তুলে দেওয়া হয় একটি বিশেষ ধরনের যন্ত্রের দায়িত্ব, যা এমন ভাবে স্বয়ং-নিয়ামক যে একটি শিশু পর্যন্ত তার তদারকি করতে পারে।[৯] স্বয়ংক্রিয় পরিকল্পনায় কুশলী শ্ৰম ক্রমবর্ধমান হারে স্থানচ্যুত হয়।[১০] একটি নির্দিষ্ট ফল উৎপাদন করা হয় কেবল আগেকার মত একই পরিমাণ বয়স্ক শ্রম নিয়োগের আবশ্যকতাকে অতিক্রম করার জন্যই নয়, সেই সলে এক ধরনের মনুষ-শ্রমের পরিবর্তে অন্য ধরনের মের, বয়স্ক মের পরিবর্তে শি শ্রমের, পুরুষ-শ্রমের পরিবর্তে নারী শ্রমের, অধিকতর কুশলী এষের পরিবর্তে অল্পতর কুশলী শ্রমের নানাবিধ নিয়োগের জন্যও মজুরির হারে নানাবিধ ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়।[১১] সাধারণ মিউলের জায়গায় স্বয়ংক্রিয় মিউলের প্রবর্তনের ফল দাড়িয়ে ছিল অধিকাংশ পুরুষ সুতাকল শ্রমিককে ছাঁটাই করে দিয়ে, কিশোর ও শিশু শ্রমকে বহাল রাখা।[১২] হাতে-কলমে কাজের পুঞ্জীভূত অভিজ্ঞতার দরুন, হাতের কাছে উপস্থিত যান্ত্রিক উপায়ের দরুন এবং নিরন্তর কারিগরি উৎকর্ষ-বৃব্ধির দরুন কারখানা ব্যবস্থার আত্ম-বিস্তারের ক্ষমতা যে কত অসাধারণ, তা আমাদের কাছে প্রতিপন্ন হয়েছিল কর্ম-দিবস হ্রাসের চাপের অধীনে ঐ ব্যবস্থা যে বিরাট বিরাট পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার দ্বারা। কিন্তু ইংল্যাণ্ডের তুলা শিল্পের চূড়ান্ত বছরে, ১৮৬০ সালে, কে স্বপ্ন দেখেছিল যে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের প্রেরণায় পরবর্তী তিন বছরে মেশিনারিতে এমন জোর-কদম অগ্রগতি ঘটবে এবং তার ফলে এমিক জনসংখ্যার এমন কর্মচ্যুতি ঘটবে? কারখানা-পরিদর্শকদের বিপোর্ট থেকে দু-একটি দৃষ্টান্ত দেওয়াই এ ব্যাপারে যথেষ্ট। ম্যাঞ্চেস্টারের এক কল-মালিক বলেন, আগে আমাদের ছিল ৭৫টি কার্ডি ইঞ্জিন, এখন সেই জায়গায় আছে ১২টি, কিন্তু কাজ করছে সেই একই পরিমাণ।……আমরা ১৪ জন কম লোক নিয়ে কাজ করছি। এতে মজুরি বাবদ প্রতি সপ্তাহে আমাদের বেঁচে যাচ্ছে ১০ পাউণ্ড। ব্যবহৃত তুলোর পরিমাণে ঝরতি-পড়তি খাতে আমাদের বেঁচে যাচ্ছে প্রায় ১০ শতাংশ। ম্যাঞ্চেস্টারে সূ সুতাকলে, আমাকে জানানো হয় যে, গতিবেগ বৃদ্ধি করে এবং কয়েকটি স্বয়ংক্রি প্রক্রিয়া প্রবর্তন করে সংখ্যা হ্রাস ঘটানো গিয়েছে। এক বিভাগে এক-চতুর্থাংশ এবং আরেক বিভাগে অর্ধেকেরও বেশি এবং দ্বিতীয় বার ‘পাট করার বদলে আঁচড়াবার কল (কুম্বিং মেশিন) চালু করার ফলে কার্ডিং’ ঘরে আগের তুলনায় কর্মীসংখ্যা বিশেষ ভাবে হ্রাস করা গিয়েছে। আরেকটি সুতাকলে শ্রমের সাশ্রয় ঘটেছে শতকরা ১০ ভাগ। মঞ্চেস্টারের সুতাকল-মালিক মেসার্স গিলমৌর বলে আমাদের হিসাবে, আমাদের ব্লোয়িং রুম’ বিভাগে নোতুন মেশিনারি নিয়ে মজুরি ও কর্মীসংখ্যায় সাশ্রয় ঘটেছে পুরো এক-তৃতীয়াংশ।……জ্যাক ফ্রেম ও ড্রয়িং ফ্রেম রুমে ব্যয়-খাতে সায় এক-তৃতীয়াংশ এবং কর্মীবাবদেও তাই। ‘স্পিনিং রুম’-এ ব্যয় খাতে সাশ্রয় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। কিন্তু এটাই সব নয়; যখন আমাদের সুতো ম্যানুফ্যাকচারকারীদের হাতে যায়, তখন মেশিনারি প্রবর্তনের কল্যাণে তার উৎকর্ষ এত বেশি হবার দরুন তারা আরো বেশি পরিমাণে কাপড় উৎপাদন করবে এবং পুরনো মেশিনারিতে উৎপন্ন সুতো থেকে তৈরি কাপড়ের তুলনায় সস্তায় তারা করবে।[১৩] ঐ একই রিপোর্টে মিঃ রেডগ্রেভ আরো মন্তব্য করেন, উৎপাদন-বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কর্মী-সংখ্যার হ্রাস, বাস্তবিক পক্ষে, সব সময়েই ঘটছে। পশম মিলগুলিতে কিছু দিন আগে এই কর্মী-ছাঁটাই শুরু হয়েছে এবং এখনো তা চলহে; তার কয়েক দিন পরে রকলে-এর নিকটবর্তী এক ইস্কুলের মাস্টার আমাকে বলেন, বালিকা বিদ্যালয়ে ছাত্রী-সংখ্যা দারুণ ভাবে কমে যাবার কারণ কেবল দুর্দশা নয়, তার আরো কারণ হচ্ছে পশম-মিলগুলিতে মেশিনারিতে অদল-বদল, যার ফলে ৭ জন অল্পসময়ের ছাত্রী (শর্ট-টাইমার) কমে গিয়েছে।[১৪]
