১৬৩০-এর নাগাদ, লণ্ডনের অদূরে একজন ওলন্দাজ কর্তৃক স্থাপিত, একটি বায়ুতাড়িত করাতকল জনতার বাড়াবাড়ির ফলে বন্ধ করে দিতে হয়। এমনকি আঠারো শতকের সুচনাকাল পর্যন্ত জল-তাড়িত করাতকলগুলি খুবই কষ্টে জনতার বিরাধিতা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল, কেননা সেই বিরোধিতার পেছনে ছিল পার্লামেন্টের সমর্থন। ১৭৫৮ সালে এভারেট সর্বপ্রথম জলশক্তি-তাড়িত পশম-কাটা কল স্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গেই ১,৩,০০০ কর্মচ্যুত লোক তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পশম পাট, করে যারা জীবিকা নির্বাহ করত এমন ৫০,০০০ মানুষ আর্কাইট-এর ক্রিবলিং মিল ও কার্ডিং ইঞ্জিনের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের কাছে আবেদন জানায়। প্রধানতঃ পাওয়ারলুম প্রচলনের কারণে এই শতাব্দীর প্রথম ১৫ বছরে মেশিনারি থবংসের যে বিরাট অভিযান চলে, লুভাইট আন্দোলন নামে যা পরিচিত, সেই এনিই সিডমাউথ, ক্যালরিখ-এর মত জ্যাকোবিন-বিরোধী সরকারগুলির পক্ষে সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ও পীড়নমূলক আইন প্রণয়নের অজুহাত হয়ে উঠল। মেশিনারি এবং মূলধন কর্তৃক তার নিয়োগ—এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে, এবং উৎপাদনের বস্তুগত উপায় উপকরণের বিরুদ্ধে নয়, যে-পদ্ধতিতে সেগুলি ব্যবহৃত হয়, তার বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণ পরিচালনা করতে, শ্রমিক জনগণের অনেক সময় ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়েছিল।[১]
ম্যানুফ্যাকচার-ব্যবস্থায় মজুরি নিয়ে লড়াই ম্যানুফ্যাকচার-ব্যবস্থা না থাকলে হয়না এবং কোনো অর্থে ই তা ঐ ব্যবস্থার অস্তিত্বের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় না। নোতুন নোতুন ম্যানুফ্যাকচার স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শ্রমিক-জনগণের কাছ থেকে আসেনা, আসে গিড় ও প্রাধিকার-ভোগী শহরগুলির কাছ থেকে। সুতরাং ম্যানুফ্যাকচার-আমলের লেখকগণ শ্রম-বিভাজনের আলোচনা করেছিলেন প্রধানতঃ শ্রমিকদের ঘাটতি পূরণের একটি উপায় হিসাবেই, যারা কাজে আছে তাদের স্থানচ্যুত করার উপায় হিসাবে নয়। এই পার্থক্যটি স্বতস্পষ্ট। যদি একথা বলা হয় যে, আজ ইংল্যাণ্ডে মিউলের সাহায্যে ৫,৩৩,০০০ লোক যত সুতো কাটে, পুরনো চরকা দিয়ে তত সুতা কাটতে লাগত ১০ কোটি লোক, তার মানে এই নয় যে, মিউলগুলি ঐ কোটি কোটি লোকের স্থান নিয়েছে, যাদের কোন কালে কোনো অস্তিত্বই ছিলনা। তার মানে দাঁড়ায় এই যে, সুতো কাটার মেশিনের জায়গা নিতে হলে লাগবে কয়েক কোটি লোক। অপর পক্ষে যদি বলা হয় যে, ইংল্যাণ্ডে পাওয়ারলুম ৮,০০,০০০ তন্তুবায়কে পথে ছুড়ে দিয়েছিল, তা হলে আমরা বর্তমান মেশিনারির কথা বলছিনা যার পরিবর্তে নিয়োগ করতে হবে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ; বলছি এমন এক শ্ৰমিকসংখ্যার কথা, যারা সত্য সত্যই বিদ্যমান ছিল এবং যারা সত্য সত্যই পাওয়ার লুমের দ্বারা স্থানচ্যুত বা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ম্যানুফ্যাকচার-আমলে, শ্রম বিভাজনের যারা পরিবর্তিত হলেও, হস্তশিল্পের অমই তখনো ছিল ভিত্তিস্বরূপ। মধ্যযুগ থেকে উত্তরাগত অপেক্ষাকৃত সংখ্যক শহরে কমাদের পক্ষে সম্ভব ছিলনা নোতুন নোতুন ঔপনিবেশিক বাজারগুলির চাহিদা মেটানো। এবং তাই নিয়মিত ম্যানুফ্যাকচার গ্রামীণ জনগণের সামনে খুলে দিল নোতুন নোতুন উৎপাদন-ক্ষেত্র সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসানের ফলে যারা ভূমি থেকে তাড়িত হয়েছিল। সুতরাং সেই সময়ে কর্মশালাগুলিতে শ্রম-বিভাগ ও সহযোগকে দেখা হত প্রধানতঃ এই ইতিবাচক দিক থেকে যে তারা শ্রমিক-জনগণকে করে তোলে আনো উৎপাদনশীল[২]। যেখানে যেখানে এইসব পদ্ধতি কৃষি-কর্মে, প্রযুক্ত হয়েছিল, এমন বহুসংখ্যক দেশে, আধুনিক শিল্পের অনেক আগে সহযোগ এবং কয়েক জনের হাতে শ্রম-উপকরণের কেন্দ্রীভবন উৎপাদন পদ্ধতিতে, এবং সেই কারণেই, অস্তিত্বের অবস্থায় ও গ্রামীণ জনসংখ্যার কর্মসংস্থানের উপায়ে ঘটিয়ে দিয়েছিল বিরাট, আকস্মিক ও সবল বিপ্লব। কিন্তু এই লড়াই মূলধন এবং মজুরিশ্রমের মধ্যে ঘটবার আগে ঘটে বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র ভূমি-মালিকদের মধ্যে; অপর পক্ষে, যখন শ্রমিকেরা স্থানচ্যুত হয় শ্রম-উপকরণের দ্বারা, ভেড়-ঘোড় ইত্যাদির দ্বারা, খন, শিল্প-বিপ্লবের ভূমিকা হিসাবে প্রথমেই বলপ্রয়োগের আশ্রয় নেয়া হয়। প্রথমে শ্রমিকদের বিতাড়িত করা হয় জমি থেকে, তার পরে আসে ভেড়ার পাল। বৃহদায়তনে কৃষিকর্ম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্ৰ-প্ৰতির হয় প্রথম পদক্ষেপ হল বৃহদায়তনে জমি-দখল, যেমন ঘটেছিল ইংল্যাণ্ডে।[৩] সূতত্ত্বা কৃষিকর্মের এই বিপর্যয়সাধন প্রথমে আসে রাজনৈতিক বিপ্লবের চেহারায়।
শ্রমের উপকৱণ যখনি ধারণ করে মেশিনের রূপ, তখন সে হয়ে ওঠে বং শ্রমিকেরই প্রতিযোগী।[৪] তখন থেকে মেশিনারির সাহায্যে মূলধনের আত্ম-সম্প্রসারণ এ যাদের জীবিকা মেশিনারি ধ্বংস করে দিয়েছে, সেই শ্রমিক জনসংখ্যা হয় প্রত্যক্ষ গৰে আনুপাতিক। সমগ্ৰ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিই এই যে, শ্রমিক তার শ্রম শক্তিকে বিক্রয় করে পণ্য হিসাবে। একটি বিশেষ ‘টুল’ ব্যবহার দক্ষ করে তুলে শ্রম বিভাগ এই শ্রমশক্তিকে বিশেষায়িত করে তোলে। যখন থেকে এই টুলটির ব্যবহার একটি মেশিনের কাজ হয়ে ওঠে, তখন থেকেই শ্রমিকের শ্রমশক্তির ব্যবহার-মূল্যের সঙ্গে তার বিনিময়মূল্যও অন্তর্হিত হয়ে যায়; কাগজের নোট যেমন আইন প্রণয়নের ফলে অচল হয়ে যায়, তেমনি শ্রমিকও হয়ে যায় অবিক্রয়যোগ্য। শ্ৰমিক-শ্রেণীর যে-অংশ এই ভাবে মেশিনারির দ্বারা বাহুল্যে পর্যবসিত হয়, অর্থাৎ মূলধনের আত্ম প্রসারণের জন্য আর আশু আবশ্যক হয়না সেই অংশ, হয়, মেশিনারির সঙ্গে পুরনো হস্তশিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারের অসম দ্বন্দ্বে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, আর, নয়তো, আরো অনায়াসে অধিগম্য শিল্প-শাখাগুলিকে প্লাবিত করে দেয়, শ্রমেরবাজারকে ভাসিয়ে দেয় এবং শ্রম-শক্তির দামকে তার মূল্যের নীচে ডুবিয়ে দেয়। শ্রমজীবী জনগণের মনে বিরাট সাল্কা হিসাবে প্রথমতঃ এই ধারণা সৃষ্টি করা হয় যে, তাদের দুর্দশা কেবল সাময়িক ( অস্থায়ী অসুবিধা ) দ্বিতীয়ত, মেশিনারি একটি উৎপাদন ক্ষেত্রের সমগ্র বিস্তৃতি জুড়ে তার কর্তৃত্ব বিস্তার করে কেবল ধাপে ধাপে যার ফলে তার ধ্বংসাত্মক ফলের ব্যাপকতা ও তীব্রতা কমে যায়। প্রথম সান্ত্বনাটি দ্বিতীয়টিকে অক্রিয় করে দেয়। যখন মেশিনারি একটি শিল্পের উপরে ধাপে ধাপে তার কর্তৃত্ব ৰিস্তার করে, তখন তা কর্মীদের মধ্যে যারা তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে-তাদের মধ্যে স্থায়ী দুর্দশা সৃষ্টি করে। যখন এই অতিক্রান্তি হয় দ্রুতগতি, তখন তার প্রতিক্রি। হয় তীক্ষ্ণ এবং তা ভোগ করে বিপুল জনসমষ্টি। ইংল্যাণ্ডের হস্তচালিত তাঁতের ক্রমিক অবলুপ্তির তুলনায় অধিকতর করুন কোনো কাহিনী ইতিহাসে পায়া যায় না। কয়েক দশক ধরে চলেছিল এই অবলুপ্তির প্রক্রিয়া এবং চুড়ান্ত ভাবে সমাপ্ত হয়েছিল ১৮৩৮ সালে। তাদের মধ্যে অনেকের মৃত্যু ঘটেছিল অনশনে, অনেকে সপরিবারে দীর্ঘকাল কষ্টেসৃষ্টে বেঁচে ছিল দৈনিক ২৫ পেনির উপরে।[৫] অন্য দিকে, ইল্যাণ্ডের তুলা-কল ভারতে সৃষ্টি করল সাংঘাতিক ফুল। ১৮৩৪-৩৫ সালে ভারতের বড়লাট বিপোর্ট করেন, “বাণিজ্যের ইতিহাসে এই দুর্দশায় কোনো তুলনা নেই। সুতি-বন্ত্রের তন্তুবায়দের হাতে ভারতের সমতল সাদা হয়ে যাচ্ছে। সন্দেহ নেই যে, এই “অনিত্য” সংসার থেকে তাদের বের করে দেবার জন্য মেশিনারি তাদের “অস্থায়ী অসুবিধা” ছাড়া বেশি কিছু করেনি। বাকিদের জন্য, যেহেতু মেশিনারি ক্রমাগত নোতুন নোতুন উৎপাদন-ক্ষেত্রে তার কর্তৃত্ব বিস্তার করছে, সেহেতু তার অস্থায়ী ফলটা বস্তুত পক্ষে চিরস্থায়ী। সুতরাং শ্রমিকের সঙ্গে সম্পর্কে পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্রভাবে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতি শ্রম-উপকরণকে ও উৎপন্ন দ্রব্যকে যে স্বতন্ত্রতা ও বিচ্ছিন্নতা দান করে তার চরিত্র মেশিনারির মাধ্যমে বিকশিত হয় নী বৈরিতায়।[৬] অতএব, মেশিনারির আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই শ্রমিক সর্বপ্রথম শ্রম-উপকরণের বিরুদ্ধে পাশবিক ভাবে বিদ্রোহ করে।
