১৩. বিপজ্জনক মেশিনারির বিরুদ্ধে কারখানা-আইনগুলি যে-নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে, তার একটা কল্যাণকর ফল ফলেছে। কিন্তু ২০ বছর আগে যেগুলি ছিল না, এখন বিপদের নানাবিধ নোতুন উৎস দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, একটি মেশিনারির বর্ধিত গতিবেগ। চাকা, বোলার, টাকু এবং মাকু এখন চালিত হয় বর্ধিত ও বর্ধমান গতিবেগ; ছিড়ে যাওয়া সুতো তুলে নেবার জন্য আঙুলগুলিকে হতে হয় আরো ক্ষিপ্র, আরো দক্ষ; যদি কোনো রকমে দ্বিধা বা অসতর্কতা ঘটে যায়, তা হলে সেগুলি চলে যাবে।’বহু সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটে শ্রমিকদের তাড়াতাড়ি কাজ সেয়ে ফেলার ব্যগ্রতায়। মনে রাখতে হবে যে, মালিকের সবচেয়ে বড় স্বার্থই হল মেশিনকে গতিশীল রাখা অর্থাৎ সুতো ও জিনিসপত্র তৈরি করে যাওয়া। প্রত্যেকটি মিনিটের ছেদ মানে কেবল শক্তিরই অপচয় নয়, উৎপাদনেরও ক্ষতি; এবং এটা শ্রমিকদের কম বড় স্বার্থ নয়—দের মজুরি দেওয়া হয় উৎপন্ন দ্রব্যের ওজন বা সংখ্যা হিসাবে, তাদের পক্ষে-যে, মেশিন সচল থাক। কাজে কাজেই যদিও মেশিন চালু থাকা কালে, তা পরিষ্কার করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ, তবু কার্যক্ষেত্রে মেশিন চালু থাকা কালেই তা পরিষ্কার করা রেওয়াজে দাড়িয়ে গিয়েছে। যেহেতু পরিস্কার করার জন্যে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না, শ্রমিকেরা চায় যত তাড়াতাড়ি পারা যায় এই কাজটা সেরে ফেলা। এই কারণেই শুক্রবার ও শনিবার অন্যান্য বারের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটে। শুক্রবার আগের চার দিনের তুলনায় দুর্ঘটনা ঘটে ১২ শতাংশ বেশি এবং শনিবার আগের পাঁচ দিনের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। কিংবা যদি শনিবারগুলির কাজের ঘন্টা হিসাবে ধরা হয়—অন্যান্য দিনের ১ ঘণ্টার তুলনায় শনিবারের ৭ ঘণ্টা-তাহলে বাকি পাঁচদিনের গড়ের তুলনায় শনিবারগুলিতে বাড়তি থাকে ৬৫ শতাংশ।” (“রিপোর্টস অব ইন্সপেক্টর অব ফ্যাক্টরি ৩১ অক্টোবর, ১৮৬৬, ৯, ১৫, ১৬, ১৭)।
১৪. তৃতীয় খণ্ডে প্রথম বিভাগে আমি ইংরেজ ম্যানুফ্যাকচারারদের একটি সাকি অভিযানের বিবরণ দেব; কারখানা-আইনের যে-সমস্ত ধারায় বিপনক মেশিনারির বিরুদ্ধে “হাতগুলির নিরাপত্তামূলক সংস্থান আছে। এই অভিমান সেই সমস্ত ধারার বিরুদ্ধে। আপাততঃ লেজার্ড হর্ণারের সরকারি রিপোর্ট থেকে একটি উদ্ধৃতি দেওয়াই যথেষ্ট : “কিছু মিল-মালিকের মুখে আমি শুনেছি কয়েকটি দুর্ঘটনা সম্পর্কে এমন লম্বু ভাবে কথা বলতে যে তা অমার্জনীয়, যেমন, একটা আঙুল হারান একটা তুচ্ছ ব্যাথরি। একজন শ্রমিকের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ আঙুলের উপরে এত নির্ভরশীল, যে তার কোনো ক্ষয়-ক্ষতি তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন এই ধরনের বিবেচনাহীন কথা আমি শুনেছি, আমি প্রশ্ন কৱেছি, মনে করুন, আপনার আনো একজন খমিক চাই, এবং দুজন আপনার কাছে আবেদন করল; দুজনই বাকি সব বিষয়ে সমান সম্পন্ন, কিন্তু একজনের একটি বৃদ্ধা বা তর্জনী নেই; আপনি কাকে নিযুক্ত করবেন? উত্তর সম্পর্কে আমি কখনো দ্বিধা দেখিনি। (“রিপোর্টস ক্যাক্টরি, ৩১ অটোবর, ১৮৫৫”)। এই মালিকেরা চালাক লোক এবং তারা যে গোলা মালিকদের বিদ্রোহের ব্যাপারে উৎসাহী, তা অকারণ নয়।
১৫ যেসব কারখানা সবচেয়ে দীর্ঘকাল ধরে কারখানা-আইনসমূহ এবং তাদের বাতাৰুক সময়সীমার আওতায় রয়েছে, সেগুলিতে অনেক পুরানো অনাচারের অবসান ঘটেছে। মেশিনারির উন্নয়নই কিছু পরিমাণে দাবি করে উন্নত ধরনের বানি নির্মাণ এক তা হয় শ্রমিকদের পক্ষে সুবিধাজনক। (কারখানা পরিদর্শকের বিপ: ৩১শে অক্টোবর, ১৮৬৩, পৃঃ ১৩৯ ব্রষ্টব্য।)।
.
পঞ্চম পরিচ্ছেদ — শ্রমিক এবং মেশিনের মধ্যে বিরোধ
যখন থেকে মূলধনের জন্ম, তখন থেকেই চলেছে ধনিক এবং মজুরি-শ্রমিকের মধ্যে বিৰে। এই বিরোধ চলেছে গোটা ম্যানুফ্যাকচার-আমল জুড়ে। কিন্তু কেবল মেশিনারি প্রবর্তনের কাল থেকেই শ্রমিক লড়াই করছে স্বয়ং শ্রম-উপকরণটিই বিরুদ্ধে-মূলধনের বস্তুগত মূর্তরূপ হিসাবে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির মত ভিত্তি হিসাবে উৎপাদনউপায়ের এই বিশেষ রূপটির বিরুদ্ধেই তার বিদ্রোহ।
সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রায় সমগ্র ইউরোপ প্রত্যক্ষ করেছে এমিক-জনগণের অনেক বিদ্রোহ-‘রিবন ও ‘ট্রমিং বোনার মেশিন ‘রিন-লুম’-এর বিরুদ্ধে, জার্মানিতে যে-মেশিনকে বলা হয় ব্যামিউল, গুরমিউল’ ও ‘মিউলেনস্টল’। এই মেশিন উদ্ভাবিত হয়েছিল জার্মানিতে। ১৫৭৯ সালে লেখা কিন্তু ১৬৩৬ সালে ভেনিসে প্রকাশিত একটি গ্রন্থে আব্বে ল্যানসেলোর বলেন, “প্রায় ৫০ বছর আগে ভ্যানজিগের অ্যানি স্যুলার শহরে একটি অতি সুকৌশল মেশিন দেখেছিলেন, যেটি একসঙ্গে চার থেকে ছটি করে ‘পিস বোনে। কিন্তু মেয়র আশংকা করলেন যে এর ফলে বহুসংখ্যক শ্রমিককে রাস্তায় বাড়াতে হতে পারে। তাই তিনি সংগোপনে মেশিনটির উদ্ভাবকে মৃত্যু ঘটালেন—হয় গলা টিপে, নয়তো, জলে ডুবিয়ে। লেইডেনে এই মেশিনটি ১৬২৯-এর আগে পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়নি; এবং সেখানে শেষ পর্যন্ত রিবন-য়নকারীদের দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে পুরসভা মেশিনটি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হন। লেইতেনে এই মেনিটি প্রবর্তন প্রসঙ্গে বক্সহর্ণ (ইনস্ট, পল, ১৬৬৩) বলেন, “In hac urbe, ante hos viginti circiter annos instrumentum quidam invenerunt textorium, quo solus plus panni et facilius conficere poterat, quan plures aequali tempore. Hinc turbae ortae et querulae textorum, tandemque usus bujus instrumenti a magistratu prohibitus est.” ১৬৩২, ১৬৩৯ ইত্যাদি সালে এই ‘লুম-টির কম-বেশি নিষেধাত্মক বিভিন্ন আইন জারির পরে হল্যাণ্ডের স্টেটস জেনারেল শেষ পর্যন্ত ১৫ই ডিসেম্বর ১৬৬১ সালের বিধান-বলে শর্তসাপে ভাবে এই মেশিন ব্যবহারের অনুমতি দান করেন। ১৯৭৬ সালে যখন এই মেশিনটির প্রবর্তনের ফলে ইংল্যাণ্ডে শ্রমিকদের মধ্যে বিক্ষোভ চলছিল, তখন কোলোনেও এটি নিষিদ্ধ বলে মোৰিত হয়। ১৮৮৫ সালে ১৯শে ফেব্রুয়ারি সম্রাটের এক হুকুমনামা সমগ্র জার্মানিতে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেয়। হামবুর্গে সিনেট-এর আদেশে এটিকে সর্বসমক্ষে দাহ করা হয়। ১৭১৯ সালে ১ই ফেব্রুয়ারি সম্রাট ঠ চাল। ১৬৮৫ সালের হুকুমনামাটি আবার জারি করেন, এবং ১৭৬৫ সালের আগে নির ইলেক্টোরেটে এটিকে প্রকাশ্যে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই মেশিন, ইউরোপের ভিৎ পর্যন্ত কাপিয়ে দিয়েছিল এবং এটিই হল মিউল ও পাওয়ারলুমের এই অষ্টাদশ শতকের শিয়-বিপ্লবের-পুর্বসুরী। এই মেশিনটির সাহায্যে একটি অনভিজ্ঞ বালকও পারত কেবলমাত্র একটি রডকে আগে-পিছে চালনা করে একটি গোটা তাকে তার সবকটি মাকু (শাটল) সমেত চালু করতে; এবং এর উন্নত সংস্করণটির সাহায্যে একই সঙ্গে ৪০ থেকে ৫০টি ‘পিস’ বোনা যেত।
