যতটা পর্যন্ত শ্রম-বিভাজনের পুনরাবির্ভাব ঘটে, তা হল প্রধানত বিশেষাষিত মেশিনসমূহের মধ্যে শ্রমিকদের বিলিবণ্টন; মিকদের বিভিন্ন ভাগে—অবশ্য, গোষ্ট হিসাবে সংগঠিত নয়, এমন বিভিন্ন ভাগে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে বিলিবণ্টন, যে বিভাগগুলিতে প্রত্যেককেই কাজ করতে হয় পাশাপাশি সন্নিবিষ্ট একই রকমের অনেকগুলি মেশিনে; সুতরাং তাদের সহযোগ হল নিছক সরল সহযোগ। ম্যানুফ্যাকচার-ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হল শ্রমিকদের সংগঠিত গোষ্ঠী। এখানে তার মন গ্রহণ করে হেডমিস্ত্রি এবং তার কয়েকজন সহকারীর মধ্যে সংযোগ। মূল বিভাজন হল এক দিকে যারা মেশিনে কাজ করে, সেই সমস্ত শ্রমিক (যাদের মধ্যে এমন কয়েকজন থাকে যারা ইঞ্জিনটির তদারক করে) এবং অন্যদিকে এই সব শ্রমিকের পার্শ্বচর হিসাবে যারা কাজ করে, তারা—এই দুয়ের মধ্যেকার বিভাজন, এই শেষোক্তরা প্রায় সকলেই শিশু। এইসব পার্শ্বচরদের মধ্যে ধরা হয় কমবেশি সমস্ত যোগানদারদের, যারা মেশিনগুলিকে যোগায় যা দিয়ে সেগুলি কাজ করে সেই দ্রব্যসামগ্রী। এই দুটি প্রধান শ্রেণী ছাড়াও, আরো থাকে স্বল্প সংখ্যক ব্যক্তির একটি শ্রেণী, যাদের কাজ হল গোটা মেশিনারিটি তদারক করা এবং দরকামত মেরামত করা, যেমন ইঞ্জিনিয়ার, মেকানিক, অয়েনার ইত্যাদি। এর এক উৎকৃষ্টতর শ্রেণীর শ্রমিক, যাদের মধ্যে কয়েকজন বৈজ্ঞানিকভাবে শিক্ষিত, অন্যান্যরা একটি বিশেষ কাজে প্রশিক্ষিত; কারখানার কর্ম-শ্রেণী থেকে এৱা স্বতন্ত্র এবং আরে লয়ে অধুমাত্র সংযুক্ত।[৩] এই শ্রম-বিতন নিছক নামমাত্র বিভাজন।
কোন মেশিনে কাজ করতে হলে, এমিককে শেখাতে হবে তার শিশুকাল থেকে, যাতে করে সে অটোমেশনের অভিন্ন ও অবিরাম গতির সঙ্গে তার নিজের নড়াচড়াকে খাপ খাইয়ে নিতে শিখতে পারে। যখন সমগ্র ভাবে মেশিনারিটি হল যুগপৎ ও সাম্য পূর্ণ ভাবে কর্মরত নানাবিধ মেশিনের একটি সমন্বিত প্রণালী, তখন তার উপরে প্রতিষ্ঠিত যে সহযোগ, তাতে প্রয়োজন হয় বিভিন্ন ধরনের মেশিনের মধ্যে বিভিন্ন শ্রমিক গোষ্ঠীকে বণ্টন করে দেওয়া। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচার-প্রণালীতে যেমন একটি বিশেষ কাজে একজন শ্রমিককে নিরন্তর বেঁধে রেখে এই বণ্টনকে স্ফটিকায়িত করার কাৰক হয়, মেশিনারির প্রবর্তন সেই আবশ্যকতার অবসান ঘটায়।[৪] যেহেতু গোটা প্রণালীটির গতিবেগ মানুষ থেকে আসে না, আসে মেশিনারির থেকে, সেই হেতু কালে কোন রকমের ব্যাঘাত না ঘটিয়েই, ব্যক্তির অদলবদল ঘটানো যায়। এর সবচেয়ে জাজ্বল্যমান প্রমাণ হচ্ছে ‘দৌড় প্রখা’ (রিলে সিস্টেম )-১৮৪৮-৫০এর বিদ্রোহের কাল থেকে কারখানা মালিকেরা যে প্রথার প্রবর্তন করেছে। সর্বশেষে কচি বয়সের ছেলেমেয়েরা যেমন ক্ষিপ্রতার সঙ্গে মেশিনের কাজ শিখে ফেলে, তাতে একাভাবে মেশিনারির কাজের জন্য একটি বিশেষ শ্রেণীর কর্মীদের গড়ে তোলার আবশ্যকতা থাকে না।[৫] নিছক পার্শ্বচরদের কাজ সম্পর্কে বলা যায় যে কারখানায় কিছু পরিমানে ঐকাজের জন্য মানুষের বদলে মেশিন বসানো যায়,[৬] এবং তার চর সরলতার তা এই একঘেয়ে কাজের ভারাক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত নিয়মিত পরিবর্তনের ব্যবস্থা করতে পারে।
যদিও তখন, সাধারণ ভাবে বলতে গেলে, মেশিনারি পুরনো অম-বিভাজন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছে, তবু তা কারখানায় টিকে থাকে ম্যানুফ্যাকচার যুগের উত্তগত চিরাচরিত প্রথা হিসাবে এবং পরবর্তীকালে মূলধনের দ্বারা ধারাবাহিক ভাবে পুনঃগঠিত ও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় আরো কদর্য আকারে-এ-শক্তিকে শোষণের হাতিয়ার হিসাৰে। একই টুলকে আজীন সেবা করার বিশেষত্বটি এখন রূপান্তরিত হয় একই অতির মেশিনকে সেবা করার আজীবন বিশেষত্বে। শিশুকাল হতেই শ্রমিককে একটি প্রত্যংশ মেশিনের অংশে রূপান্তরিত করার উদ্দেশ্যে মেশিনারিকে লাগানো হয় ভুল কাজে।[৭] এইভাবে কেবল যে তার পুনরুৎপাদনের খরচই উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায় তাই নয়, সেই সনে একই সমন্ধে সমগ্রভাবে কারখানার উপরে অর্থাৎ এনিকের উপরে তার অসহায় নির্ভরশীলতাও সম্পূর্ণতা লাভ করে। যেমন সর্বত্র, তেমন এখানেও, আমরা একদিকে উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়ার কারণে বুদ্ধিপ্রাপ্ত উৎপাদনক্ষমতা এবং অঙ্গ দিকে সেই প্রক্রিয়াটির ধনতান্ত্রিক শোষণের কারণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত উৎপাদনক্ষমতার মধ্যে আমরা অবশ্যই পার্থক্য করব। হস্তশিল্পে ও ম্যানুফ্যাকচারে এমিক টুল ব্যবহার করে, কারখানায় মেশিন ব্যবহার করে থাকে। সেখানে শ্রম-উপকরণের গতিবেগ উৎসারিত হয় শ্রমিক থেকে, এখানে শ্রমিককেই অনুসরণ করতে হয় মেশিনের গতিকে। ম্যানুফ্যাকচারে শ্রমিকেরা একটি জীবন্ত সংগঠনের বিভিন্ন অংশ। কারখানায় আমরা পাই শ্রমিক থেকে স্বতন্ত্র এক প্রাণহীন সংগঠনকে, শ্রমিক যার কেবল দীবন্ত উপাঙ্গমাত্র। “অন্তহীন একঘেয়েমি ও খাটুনির এই যে শোচনীয় রুটিন যার ভিতর দিয়ে একই যান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্পাদন করতে হয় বারংবার, তা যেন। সিসিফাসের পরিশ্রম। প্রস্তরপিণ্ডের মত অমের বোবা ক্লান্ত শ্রমিকের উপরে ফিরে ফিরে এসে পড়ে।[৮] সেই সঙ্গে কারখানার কার আয়ুতন্ত্রকে সম্পূর্ণ ভাবে নিঃশেষিত করে দেয়; তা পেশীর বহুমুখী ফুরণের অবসান ঘটায় এবং দেহ ও মনের উভয়েরই কাজকর্মের স্বাধীনতার প্রত্যেকটি পরমাণু বাজেয়াপ্ত করে দেয়।[৯] শ্রমকে হালকা করার মানেও গিয়ে দাড়ায় এক ধরনের অত্যাচার, কেননা মেশিন শ্রমিককে কাল থেকে মুক্তি দেয় না, কিন্তু তার কাজকে বঞ্চিত করে সর্বপ্রকার আকর্ষণ থেকে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন, যা কেবল একটি শ্রম-প্রক্রিয়াই নয়, সেই সঙ্গে উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদকেরও একটি প্রক্রিয়া—সেই ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের প্রত্যেকটি ধরনের মধ্যেই একটি জিনিস অভিন্ন; তা এই যে এখানে শ্রমিক মোপকরণকে খাটায় না, শ্রমোপকরণই শ্রমিককে খাটায়।. কি কেবল কারখানা-ব্যবস্থাতেই সর্বপ্রথম এই একান-বিপর্যয় একটি প্রকৌশলগত ও প্রত্যক্ষ-গোচর বাস্তব আকার লাভ করে। অটোমেশনে রূপান্তরিত হয়ে এমেৱ উপকরণ প্রক্রিয়া চলাকালে শ্রমিকের মুখোমুখি হয় মূলধনের আকারে, মৃত মের আকারে যা জীবন্ত শ্রমশক্তির উপরে আধিপত্য করে এবং তাকে নিঙড়ে শুষ্ক করে দেয়। দৈহিক শক্তি থেকে উৎপাদনের মানসিক শক্তিসমূহেৱ বিচ্ছে এবং শ্রমের উপরে মূলধনের পরাক্রম হিসাবে ঐ শক্তিসমুহের রূপান্তরণ চুড়ান্ত ভাবে সম্পন্ন হয় মেশিনারির বনিয়াদের উপরে প্রতিষ্ঠিত আধুনিক শিল্পের দ্বারা, যা আমরা আগেই দেখিয়েছি। কারখানা ব্যবস্থার মধ্যে মুক্তি পেয়েছে যে বিজ্ঞান, প্রচণ্ড শারীরিক বল ও পুঞ্জীভূত শ্রম, তার সামনে প্রত্যেকটি তুচ্ছ ব্যক্তিগত কারখানা-কর্মীর বিশেষ দক্ষতা একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রাশি হিসাবে অন্তহিত হয়ে যায় এবং উক্ত ব্যবস্থাটির মনে একযোগে “মনিব”-এর শক্তিতে পরিণত হয়। সুতরাং এই মনিব, যার মাথায় মেশিনারিটি এবং তার উপরে তার একচেটিয়া অধিকার অবিচ্ছেদ্য ভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছে, সে যখনি তার “হাতগুলি”-র সরে বিরোধে আসে, তখনি তাচ্ছিল্যভরে তাদেরকে বলে, কারখানা কর্মীদের এটা সর্বসময়ে স্মরণে রাখতে হবে যে, সত্য সত্যই তাদের দক্ষ-শ্রম হচ্ছে নিকৃষ্ট জাতের; এবং এমন আর কিছু নেই যা আরো সহজে আয়ত্ত করা যায়; কিংবা তার যা গুণমান তাতে আরো বেশি পারিশ্রমিক দেওয়া যায়; কিংবা যা সামান্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সবচেয়ে কম কুশলী কমী আবো তাড়াতাড়ি আরো প্রচুর ভাবে অর্জন করতে পারে।……… কমার শ্রম ও দক্ষতা তত দু’মাসের প্রশিক্ষণেই শেখা যায় এবং একজন মামুলি শ্রমিক তা শিখে নিতে পারে; তার শ্রমের তুলনায় মনিবের মেশিনারি উৎপাদনকার্যে গ্রহণ করে সত্য সত্যই টের বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।[১০] শ্রম-উপকরণসমূহের একটানা অভিন্ন গতিবেগের কাছে শ্রমিকের প্রযুক্তিগত বশ্যতা এবং কর্মনিযুক্ত জনসমষ্টির অদ্ভুত গঠন, যার মধ্যে আছে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব বয়সের ব্যক্তি—এই উভয়ে মিলে সৃষ্টি করে এক ব্যারাকসুলভ শৃংখলা, যা কারখানায় বিস্তার লাভ করে একটি পূর্ণায়ত প্রণালীতে এবং যা পরিপূর্ণ ভাবে বিকশিত করে পুর্বোক্ত তদারকির কাজটিকে এবং তা কর্ম-নিযুক্ত জনসমষ্টিকে ভাগ করে দেয় দুটি ভাগে-কর্মী ও তদারককারীতে, শিল্প সেনাবাহিনীর সৈন্য ও সার্জেন্ট। স্বয়ংক্রিয় কারখানায় প্রধান সমস্যা দেখা দেয় এলোমলো কাজের অভ্যাসগুলি পরিত্যাগে শ্রমিকদের শিক্ষিত করে তুলতে এবং জটিল অটোমেশনের অপরিবর্মীয় নিয়মিকতার সঙ্গে তাদের একাত্ম করে তুলতে। কারখানাগত প্ৰম-প্রণালীর প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সফল শৃঙ্খলা-বিধিত প্রণয়ন ও প্রয়োগই হচ্ছে আাইটের হার্কিউলিয়াস-লত উদ্যমশীলতায় মহৎ সাফল্য। এমন কি আজও পর্যন্ত, যখন সমগ্র ব্যবস্থাটি নিখুত ভাবে সংগঠিত এবং শ্রম যথাসম্ভব লঘুত, তখনো সাবালকত্ব-অতিক্রান্ত ব্যক্তিদের উপযুক্ত কারখানা-কমীতে রূপান্তরিত করা অসম্ভব বলে প্রতিভাত হয়।[১১] অন্যান্য ক্ষেত্রে বুর্জোয়া শ্রেণী যে দায়িত্ব-বিভাজনকে এত সমর্থন জানায়, প্রতিনিধিত্বমুলক ব্যবস্থার প্রতি আরো বেশি সমর্থন জানায়, সেই দায়িত্ব-বিভাজন ও প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থাকে দূরে সরিয়ে রেখে মূলধন এখানে কাজ করে একজন বেসরকারি বিধায়ক হিসাবে এবং তার স্বেচ্ছা অনুসারে প্রণয়ন করে এমন কারখানা-বিধি যাতে সে বিধিবদ্ধ করে তার স্বৈরতন্ত্র; বৃহদায়তন সহযোগে এবং শ্রম-উপকরণসমূহের বিশেষ করে, মেশিনারির, যৌথ ব্যবহারে যে-সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দেয়, এই শৃংখলা-বিধি তার একটি ব্যরূপ। দাস চালকদের চাবুকের জায়গা নেয় তদারককারির পেনাল্টি-বুক” সাজার খাতা”। সমস্ত সাজা বা শাস্তিই পর্যবসিত হয় জরিমানায় বা মজুরি-কাটায় এবং কারখানার বিধান-দাতা লাইকারগাস এমন ভাবে সব কিছুর ব্যবস্থা করে যে তার আইন মানলে তার যে লাভ হয়, ভাঙলে লাভ হয় তার চেয়ে বেশি।[১২]
