পূর্ববর্তী বিশ্লেষণ থেকেই বোঝা গেছে যে এই পণ্য-পৌত্তলিকতা উদ্ভূত হয়েছে পণ্যোৎপাদক শ্রমের বিশিষ্ট সামাজিক চরিত্র থেকে।
সাধারণতঃ, ব্যবহারযোগ্য দ্রব্য পণ্যত্ব প্রাপ্ত হয় শুধু এই জন্য যে, সে দ্রব্য উৎপন্ন করতে যে শ্ৰম লেগেছে তা বিভিন্ন ব্যক্তির অথবা বিভিন্ন ব্যক্তিগোষ্ঠীর শ্রম; এবং তারা এজন্য কাজ করেছে স্বতন্ত্রভাবে। এইসমস্ত ব্যক্তিগত শ্ৰমের যোগফল হলো সমাজের সমগ্ৰ শ্ৰম। যেহেতু উৎপাদনকারীরা পরস্পরের সঙ্গে ততক্ষণ কোন সামাজিক যোগাযোগ স্থাপন করে না, যতক্ষণ না তাদের উৎপন্ন দ্রব্যের মধ্যে বিনিময় ঘটে, সেহেতু প্ৰত্যেকটি উৎপাদনকারীর নিজস্ব যে সামাজিক চরিত্র আছে, তারও অভিব্যক্তি বিনিময়ের মধ্যে ছাড়া হয় না। অন্যভাবে বললে বিনিময়ের ভেতর দিয়ে প্ৰত্যক্ষভাবে নানা দ্রব্যের এবং পরোক্ষভাবে বিভিন্ন উৎপাদনকারীর মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে সেই সম্পর্ক থেকেই একজনের শ্ৰম সমাজের সমগ্ৰ শ্ৰমের একাংশ হ’য়ে দাঁড়ায়। কাজেই উৎপাদকের নিকট একজনের শ্রমের সঙ্গে অপর সকলের শ্রম কর্মরত শ্রমিকদের ভিতরকার প্রত্যক্ষ সামাজিক সম্পর্ক বলে গণ্য হয় না, গণ্য হয় বস্তুতঃ তারা যা ঠিক তা-ই বলে, অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব বস্তুগত সম্পর্ক এবং বিভিন্ন বস্তুর সামাজিক সম্পর্ক বলে। ব্যবহারযোগ্য দ্রব্য হিসেবে শ্রমজাত পদার্থ ভিন্ন এবং বহুবিধ, কিন্তু শুধুমাত্র বিনিময়ের ভেতর দিয়েই তা একেবারে অন্যরকম হয়ে যায়, অর্থাৎ মূল্যরূপে সমগুণসম্পন্ন সামাজিক সত্তা লাভ করে। ব্যবহারযোগ্য দ্রব্য এবং মূল্য-এই দুইভাগে শ্ৰমজাত পদার্থের এই যে বিভাগ, এর গুরুত্ব কার্যতঃ ধরা পড়ে তখনি, যখন বিনিময়প্ৰথা এতদূর প্রসারিত হয়েছে যে ব্যবহারযোগ্য। দ্রব্য উৎপন্ন করা হয় বিনিময়ের জন্য, সুতরাং তা মূল্য হিসেবে পরিগণিত হয়। বিনিময়ের আগেই, উৎপাদনের সময়েই। এই সময় থেকে ব্যক্তির শ্রম সমাজগত ভাবে দ্বিবিধ চরিত্র লাভ করে। একদিকে শ্রম হবে একটা নির্দিষ্ট প্রকারের ব্যবহারযোগ্য শ্ৰম, তা দ্বারা সমাজের কোন নির্দিষ্ট অভাব দূরীভূত হবে, এবং এইভাবে তা পরিগণিত হবে সমাজের সকলের সমবেত শ্রমের অংশ রূপে, স্বতঃস্ফৰ্তভাবে সমাজে যে শ্রমবিভাগ গড়ে উঠেছে তারই মধ্যে একটি শাখাস্বরূপ। অন্যদিকে, কর্মরত ব্যক্তির যে বিচিত্ৰ চাহিদা আছে। এই শ্রম দ্বারা তার পরিপূর্ণ শুধু ততটাই সম্ভব, যতটা শ্রমিকদের ব্যবহারযোগ্য ব্যক্তিগত শ্রম নিয়ে একের সঙ্গে অপরের বিনিময় সমাজে বেশ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সুতরাং যখন প্ৰত্যেকটি শ্রমিকের ব্যবহারযোগ্য ব্যক্তিগত শ্রম অন্য সকলের শ্রমের সঙ্গে গুণগত অভিন্নতা লাভ করেছে। বিভিন্ন ধরনের শ্রমকে সমগুণসম্পন্ন করা যায় শুধুমাত্র তাদেরকে তাদের ভিন্ন ভিন্ন গুণ থেকে অমূর্তায়িত করে তাদের সমগুণত্বটুকু নিষ্কাষিত করে, অর্থাৎ তাদের সাধারণ ‘হর’-এ তাদেরকে পরিণত করে; সেই সাধারণ ‘হর’ হলো মানুষের শ্রমশক্তির ব্যয় অথবা অমূর্তায়িত মনুষ্য শ্ৰম। ব্যক্তিগত শ্রমের এই দ্বৈত চরিত্র মানুষের মনে যখন প্ৰতিফলিত হয় তখন বিশেষ বিশেষ রূপ দেখা দেয়, কার্যতঃ বিনিময়ের ক্ষেত্রেই এই সমস্ত রূপের উদ্ভব ঘটে। এইভাবে, তার নিজ শ্ৰম যে আসলে সামাজিক শ্ৰম এই সত্যটি একটি শর্তরূপে হাজির হয়, শর্তটি এই যে দ্রব্যটি কেবল ব্যবহারযোগ্য হলেই হলো না, তা অপরের ব্যবহারযোগ্য হওয়া চাই। অন্যান্য নানারকম শ্রমের সঙ্গে তার নিজস্ব শ্রমের অভিন্নতা, অর্থাৎ তার সামাজিক চরিত্র এই রূপ ধারণ করছে। যে বিভিন্ন ধরনের শ্রমের ফলে উৎপন্ন নানাবিধ দ্রব্যের একটি সমগুণ আছে, তাদের মূল্যই হলো সেই সমগুণ।
সুতরাং, আমরা যখন শ্রমোৎপন্ন দ্রব্য নিয়ে মূল্য-সম্পর্ক রচনা করি, তখন ত। এই জন্য করি না সে সমগুণসম্পন্ন মনুষ্যশ্ৰমের আধার বলে আমরা তাকে চিনতে পেরেছি, বরং ঠিক তার বিপরীত কারণে তা করি। যখনি আমরা বিভিন্ন প্রকার দ্রব্যের মধ্যে বিনিময় করি, তখনি ঐ সমস্ত দ্রব্যের উৎপাদক একরকম শ্রমের সঙ্গে অন্যরকম শ্রম সমান করে দেখাই। এ বিষয়ে আমরা সচেতন নই, কিন্তু তবু তা করি।(২) কাজেই মূল্য তার গলায় পরিচয়-পত্র ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় না। বরং মূল্যই প্রতিটি দ্রব্যকে এক একটি সামাজিক ভাষা-চিত্রে পরিণত করে। পরবর্তীকালে আমরা আমাদের নিজস্ব সামাজিক দ্রব্যের গৃঢ় রহস্য আবিষ্কার করবার জন্য সেই ভাষা-চিত্রের পাঠোদ্ধার করতে চেষ্টা করি; কেননা, ভাষা যেমন একটি সামাজিক ক্রিয়াফল, একটি ব্যবহারযোগ্য পদার্থকে মূল্য হিসেবে অভিহিত করাও তেমনি একটি সামাজিক ক্রিয়াফল। যে শ্ৰমদ্বারা দ্রব্যের উৎপাদন হয়, দ্রব্য যে সেই মনুষ্যশ্ৰমেরই বস্তুরূপ, এই আবিষ্কার মানবজাতির ইতিহাসে বাস্তবিকই এক নব যুগের সূচনা; কিন্তু শ্রমের সামাজিক চরিত্র যে কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে বাহা জগতে বস্তুচরিত্ররূপে দেখা দেয়, সেই কুয়াশার ঘোর তাতে কাটে না। আমরা এখন আলোচনা করছি উৎপাদনের একটি বিশেষ রূপ নিয়ে, অর্থাৎ পণ্যের উৎপাদন সম্বন্ধে। এই ধরনের উৎপাদনে প্ৰত্যেকের শ্রমই ব্যক্তিগত এবং এক ব্যক্তির শ্রম থেকে অন্য ব্যক্তির শ্রম স্বতন্ত্রভাবে ব্যয়িত হয়। কিন্তু সকলের শ্রমেরই একটি সাধারণ গুণ আছে অর্থাৎ, প্ৰত্যেকের শ্রমই মানুষের শ্ৰম। ব্যক্তিগত শ্রমের এই গুণটিই হলো তার বিশিষ্ট সামাজিক চরিত্র। শ্রমজাত দ্রব্যের এই সামাজিক চরিত্রই পণ্যের ভিতর মূল্যরূপে প্ৰতিভাত। এই তথ্যটি অর্থাৎ সকলের শ্রমের এই সাধারণ গুণটি, উৎপাদনকারীর মনে সত্য এবং শাশ্বত। আবিষ্কারটি নূতন যুগের সূচনা হওয়া সত্ত্বেও সত্যটি তার কাছে সনাতন ঠিক যেমন, নানারকম গ্যাস দিয়ে বায়ু গঠিত-এ সত্য বিজ্ঞান কর্তৃক আবিস্কৃত হবার পরও বায়ুমণ্ডলের কোন পরিবর্তন ঘটে না।
