শ্রম-শক্তির তীব্রতর শোষণের সঙ্গে সঙ্গে কারখানা মালিকদের ঐশ্বর্য কী বিপুল ভাবে বেড়েছে, একটি মাত্র ঘটনা তুলে ধরাই তা প্রমাণ করার পক্ষে যথেষ্ট। ১৮৩৮ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত, ইংল্যাণ্ডের তুলল ও অন্যান্য কারখানায় গড় আনুপাতিক বুর্কি ঘটেছিল ৩২ শতাংশ, যেখানে ১৮৫ থেকে ১৮৫৬ পর্যন্ত এই বৃদ্ধি ঘটে ৮৬ শতাংশ।
কিন্তু দশ ঘণ্টার কাজের দিনের প্রভাবের অধীনে ১৮৪৮ থেকে ১৮৫৬ পর্যন্ত ৮ বছরে ইংল্যাণ্ডের শিল্পে যত বিরাট অগ্রগতিই ঘটুক না কেন, ১৮৫৬ থেকে ১৮৬২ পর্যন্ত পরবর্তী ৬ বছরের অগ্রগতি তাকে অনেক ছাপিয়ে যায়। দৃষ্টান্ত হিসাবে রেশম কারখানাগুলির কথা ধরা যাক; ১৮৫৬ সালে স্পিণ্ডল-এর সংখ্যা ছিল ১৩,৯৩,৭৯৯; ১৮৬২ সালে তা বেড়ে দাঁড়াল ১৩,৮৮,৫৪৪; ১৮৫৬ সালে তাঁতের সংখ্যা ছিল ৯,২৬৬, ১৮৬২ সালে তা বেড়ে দাড়াল ১০,৭০৯। কিন্তু কর্মীর সংখ্যা ১৮৫৬ সালে যেখানে ছিল ৫৬,১৩১, ১৮৬২ সালে সেখানে নেমে দাড়াল ৫২,৪২৯। সুতরাং; যেখানে স্পিণ্ডল বৃদ্ধি পেল ২৬৯ শতাংশ, তত বৃদ্ধি পেল ১৫৬ শতাংশ, সেখানে কর্মী সংখ্যা হ্রাস পেল ৭ শতাংশ। ১৮৫০ সালে পশম মিলগুলিতে কাজে ছিল ৮৭.৮৩. স্পিণ্ডল, ১৮৫৬ সালে ১৩,২৪,৫৪৯ (বৃদ্ধি ১২ শতাংশ) এবং ১৮৬২ সালে ১২,৮৯,১৭২ (হ্রাস ২৭ শতাংশ)। কিন্তু ১৮৫৬ সালের সংখ্যায় যেগুলি স্থান পেয়েছে, অথচ ১৮৬২ সালের সংখ্যায় পায়নি, সেই ডাবলিং স্পিলগুলিকে আমরা যদি বাদ দেই, তা হলে আমরা দেখতে পাব যে ১৮৫৬ সালের পরে স্পিণ্ডল-এর সংখ্যা প্রায় স্থিরই ছিল। অপর পক্ষে, ১৮৫০ সালের পরে স্পিণ্ডল ও তাদের সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। পশম মিলগুলিতে পাওয়ারলুমের সংখ্যা ১৮৫০ সালে ছিল ৩২,৬১৭; ১৮৫৬ সালে ৩৮,৯৫৬; ১৮৬২ সালে ৪৩, ৪৮। কর্মীর সংখ্যা ছিল ১৮৫০-এ ৭৯,৭৩৭; ১৮৫৬-তে ৮৭,৭৯৪; ১৮৬২-তে ৬,৬৩; অবখ, এই সংখ্যাগুলির মধ্যে ধরা আছে ১৪ বছরের অমূর্ব-বয়সী শিশুদের সংখ্যা, যা ১৮৫০এ ছিল ১,৯৫৬; ১৮৫৬-তে ১১,২২৮; ১৮৬২-তে ১৩,১৭৮। অতএব দেখা যাচ্ছে যে ১৮৫৬ সালের তুলনায় ১৮৬২ সালে তাঁতের সংখ্যা দারুণ ভাবে বৃদ্ধি পেলেও, নিযুক্ত কাজের লোকের মোট সংখ্যা হ্রাস পেয়েছিল, এবং শোষিত শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল।[৫৫]
১৮৬৩ সালের ২৭শে এপ্রিল মিঃ ফেরাও কমন্স সভায় বলেন, এখানে আমি যাদের মুখপাত্র সেই ল্যাংকাশায়ার ও চেশায়ার-এর ১৬টি জেলার প্রতিনিধিরা আমাকে জানিয়েছেন যে মেশিনারির উৎকর্ষ সাধনের দরুন কল-কারখানায় কাজ ক্রমাগতই বেড়ে চলেছে। পূর্বে যেমন একজন ব্যক্তি দুজন সহায়কের সাহায্যে দুটি তাতকে চালু রাখত, এখন একজন ব্যক্তি কোনো সহায়ক ছাড়াই চালু রাখে তিনটি তত; এমনকি একজন ব্যক্তি চারটি তাঁত চালু রাখছে এমন দৃশ্যও বিরল নয়। উল্লিখিত তথ্যগুলি থেকে বোঝা যায় যে ১২ ঘণ্টার কাজকে এমন ঠেলে দেয়া হয় ১০ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে। সুতরাং এটা এখন সুস্পষ্ট, গত ১০ বছরে একজন কারখানা-কর্মীর কাজ কত বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।”[৫৬]
সুতরাং, যদিও কারখানা-পরিদর্শকেরা অবিরাম ভাবে ও যৌক্তিকতা সহকারেই ১৮৪৪ ও ১৮৫০ সালের কারখানা-আইন দুটির সুফলসমুহের সুপারিশ করে থাকেন, তবু তারা স্বীকার করেন যে কাজের ঘণ্টার হ্রাস সাধনের দরুন এমন মাত্রায় শ্রমের তীব্রতা বৃদ্ধি করা হয়েছে যে, তা শ্রমিকের স্বাস্থ্যের পক্ষে এক তার কর্মক্ষমতার পক্ষে ক্ষতিকারক। অধিকাংশ তুলল, পশম ও রেশম কারখানাগুলিতে মেশিনারির গতিবেগ গত কয়েক বছরে এত বিপুল ভাবে বর্ধিত করা হয়েছে যে সেগুলির প্রতি সখেজনক ভাবে মনোনিবেশ করতে হলে যে-উত্তেজনাকর অবস্থার মধ্যে নিয়ে কাজ করতে হয়, আমার মনে হয় ভাঃ খ্রীনহাউ তার সাম্প্রতিক রিপোর্টে যোসের ব্যাধি-জনিত অতিরিক্ত প্রাণহানির কথা বলেছেন, এটা তার অন্যতম কারণ।[৫৭] এ বিষয়ে সামান্যতম সংশয় নেই যে, যে-মুহূর্তে কাজের দিনের দীর্ঘতা-সাধন চিরতরে নিষিদ্ধ হয়ে গেল, সেই মুহূর্ত থেকে মূলধনের মধ্যে এমন একটা প্রবণতার সৃষ্টি হয়। তাকে তাড়িত করছে শ্রমের তীব্রতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ক্ষতি পূরণের ব্যবস্থা করতে এবং মেশিনারির প্রত্যেকটি উন্নয়নকে এমন একটি উপায়ে রূপান্তরিত করতে থাকে শ্রমিককে উজাড় করে নেওয়া যায়। এই প্রবণতা অচিরেই এমন একটা পরিস্থিলি দিকে নিয়ে যাবে যাতে কাজের ঘণ্টার আবার হ্রাস-সাধন অনিবার্য হয়ে উঠবে। অপর পক্ষে, ১০ ঘণ্টার কাজের দিনের প্রভাবে ১৮৪৮ সাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের শিল্পে এতটা অগ্রগতি ঘটেছে যা ১২ ঘণ্টার কাজের দিনের যুগে ১৮ থেকে ১৮৪৭-এর অগ্রগতি কারখানা-ব্যবস্থা প্রবর্তনের পরে প্রথম অর্ধশতাব্দী অগ্রগতিকে—যখন কাজের দিনের কোনো সীমাবদ্ধতা ছিলনা, তখনকার অগ্রগতিকে যতটা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। [৫৮]
————
১. আমেরিকার গৃহযুদ্ধ-জনিত তুলো-সংকটের সময় ইংরেজ সরকার ডঃ এভোয়ার্ড স্মিথকে পাঠায় ল্যাংকাশায়ার, চেশায়ার এবং অন্যান্য জায়গায়তুলো-শ্রমিকদের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত অবস্থা সম্পর্কে রিপোর্ট করার জন্য। তিনি রিপোর্ট করেন, স্বাস্থ্য-বিষয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, কারখানার আবহাওয়া থেকে শ্রমিকদের নির্বাসন ঘটানো ছাড়াও, সংকটের ফলে কয়েকটা সুবিধা ঘটে। “গডফ্রের কর্ডিয়াল” নামক বিষ না খাইয়ে, শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াবার যথেষ্ট অবসর মায়েরা এখন পায়। রান্নাবান্ন। শেখার সময়ও এখন তাদের আছে। দুর্ভাগ্যক্রমে এই বিদ্যাটা তারা এমন সময়েই শিখল, যখন তাদের রান্না করার মত কিছু নেই। কিন্তু এ থেকে আমরা বুঝতে পারি কি ভাবে মূলধন তার আত্ম-প্রসারের স্বার্থে পরিবারের সাংসারিক প্রয়োজনের শ্রমকে জবর-দখল করে নিয়েছে। এই সংকটকে শ্রমিকদের কন্যার ব্যবহার করেছিল সেলাইয়ের ইস্কুলে সেলাই শেখার কাজে। একটি আমেরিকান বিপ্লব এবং একটি বিশ্বজনীন সংকট যাতে করে শ্রমিক মেয়েরা, যারা গোটা দুনিয়ার জন্য সুতো কাটে, তারা শিখতে পারে কেমন করে সেলাই করতে হয়।
