এখন যেহেতু উৎপন্নের পরিমাণ প্রধানতঃ নিয়ন্ত্রিত হয় মেশিনারির গতিবেগের দ্বারা, সেই হেতু মিলমালিকের স্বার্থ হবে নিম্নলিখিত শর্তসাপেক্ষ মেশিনারিকে যথাসাধ্য উচ্চতম গতিবেগে চালনা করা; শর্তগুলি এই মেশিনারিটি দ্রুত অবনতি থেকে তাকে রক্ষা করা, উৎপন্ন দ্রব্যটির গুণমান অক্ষুন্ন রাখা, এবং যে পরিমাণ দৈহিক চাপ সয়ে সে একটানা কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম তার চেয়ে বেশি চাপ যাতে শ্রমিকের উপরে না পড়ে গতিবেগকে সেই মাত্রায় রাখা। সুতরাং যে-সমস্ত সবচেয়ে গুপর্ণ সমস্যা কারখানা-মালিককে সমাধান করতে হয়, তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, উল্লিখিত শর্তগুলিকে রক্ষা করে কত উচ্চতম গতিবেগে সে মেশিনারি চালাতে পারে। এমন প্রায়ই ঘটে সে যে দেখতে পায় যে, সে মাত্রাতিরিক্ত গতিবেগে চালিয়ে ফেলেছে। দেখতে পায় যে, ভাঙচুর ও নিম্নমানের কাজ বর্ধিত গতিবেগের প্রত্যাশিত ফলকে নাকচ করে দেয় এবং যখন একজন তৎপর ও বুদ্ধিমান মালিক নিরাপদ উচ্চতম মাত্রা আবিষ্কার করে, তখন তার পক্ষে ১২ ঘণ্টায় যে পরিমাণ উৎপাদন করা সম্ভব হত, ১১ ঘণ্টায় সেই পরিমাণ উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। আমি আরো ধরে নিয়েছিলাম যে, কত একক দ্রব্য উৎপাদন করেছে, সেই ভিত্তিতে যখন কর্মীকে তার মজুরি দেওয়া হয়, তখন সে যে-সর্বোচ্চ হারে একটানা খেটে যেতে পারে, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে যথাসাধ্য খাটুনি খাটে।”[৪৭] অতএব, হনরি এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, কাজের ঘণ্টা যদি ১২ ঘণ্টার নীচে নামানো হয়, তা হলে উৎপাদনের পরিমাণও কমে যেতে বাধ্য।[৪৮] দশ বছর পরে তিনি নিজেই তার ১৮৪৫ সালের মতটি উদ্ধৃত করেন এটা প্রমাণ করতে যে, ঐ বছর তিনি মেশিনারির স্থিতিস্থাপকতাকে এবং মানুষের এ শক্তির স্থিতিস্থাপকতাকে-কর্ম দিবসের বাধ্যতামূলক হ্রস্বীকরণের দ্বারা যাদের উভয়কেই যুগপৎ বিস্তৃত করা হয় চরম মাত্রায়—সেই উভয়কেই তিনি কত ছোট করে দেখে ছিলেন।
এখন আমরা ১৮৪৭ সালে ইংল্যাণ্ডে তুলল, পশম, রেশম ও শণ শিল্পে দশ ঘণ্টা আইন প্রবর্তনের পরে যে-সময় এল, সেই সময়ের আলোচনায় যাচ্ছি।
“স্পিণ্ডলের গতিবেগ বেড়েছে প্রতি মিনিটে খুশল-এর উপরে ৫০০ ও মিউলের উপরে ১০০০ আবর্তন; তারে মানে যে থুশল-স্পিণ্ডলের বেগ ছিল ১৮৩৯ সালে প্রতি মিনিটে ৪,৫০০ বার, তা এখন (১৮৬২ সালে) হয়েছে প্রতি মিনিটে ৫০০০ এবং যে মিউলে ছিল ৫০০০ তা এখন হয়েছে ৬০০০, প্রথম ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বৃদ্ধির পরিমাণ এক-দশমাংশ এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এক, পঞ্চমাংশ।[৪৯] ম্যানচেষ্টারের নিকটবর্তী প্যাট্রিক্রফটের খ্যাতনামা ইঞ্জিনিয়ার জেমস ন্যাসমিথ ১৮৫২ সালে লিয়নার্দ হর্নারের কাছে এক পত্রে ১৮৪৮ থেকে ১৮৫৭ সালের মধ্যে স্টিম ইঞ্জিনে যেসব উন্নতি ঘটেছে সেগুলি ব্যাখ্যা করেন। ১৯২৮ সালের অনুরূপ ইঞ্জিন গুলির শক্তি অনুসারে সব সময়েই সরকারি বিবরণে স্টিম ইঞ্জিনগুলির অশ্বশক্তির যে হিসা দেয়া হয়, তা কেবল নামীয়, এবং তা কেবল তাদের আসল শক্তির সূচক হিসাবেই কাজ করতে পারে[৫০] এই মন্তব্যের পরে ন্যাসমিথ বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে, টিম ইঞ্জিন মেশিনারির একই ওজন থেকে আমরা এখন লাভ করছি গড়ে ত আরো ৫০ শতাংশ কর্তব্য বা কাজ, এ অনেক ক্ষেত্রে অনুরূপ মি-ইনি, যেগুলি প্রতি মিনিটে ২২০ ফুটের সীমাবদ্ধ গতিবেগে উৎপাদন করত ৫০ অশ্বশক্তি, সেগুলি এখন উৎপাদন করছে ১… অতি বেশি।…….১০০ অশ্বশক্তির ক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক টিম ইঞ্জিন আগেকার তুলনায় বৃহত্তর বেগে কাজ করতে সক্ষম; তার নিয়ে নির্মাণকার্যে উৎকর্য, বয়লারের নির্মাণকারে ও ক্ষমতায় উৎকর্য ইত্যাদি থেকেই এই অতিরিক্ত বেগের উদ্ভব।…দিও অপশক্তির অনুপাতে আগেকার সময়ের মত সেই একই সংখ্যক কর্মী নিযুক্ত হয়, মেশিনারি অনুপাতে কিন্তু নিযুক্ত হয় অল্পতর কর্মী।[৫১] ১৮৫০ সালে, যুক্তরাজ্যের কারখানাগুলি নিযুক্ত করত ১,৩৪,২১৭ নামীয় শক্তি ২৫,৬৩৮,৭১৬টি শিশুকে এবং ১,০০টি আঁতকে গতি দান করতে। ১৮৫৬ সালে স্পিণ্ড ল ও তঁতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩,৩৫,৩৫৮০ এবং ৩,৬৯, ২০৫টি এবং যদি ধরে নেওয়া যায় যে প্রয়োজনীয় অশ্বশক্তির গে ১৮৫০ সালে যে পরিমাণ ছিল সেই বেগের অনুরূপ হতে হবে, তা হলে দরকার হবে, ১৭৫,০০০ অশ্বের শক্তি, কিন্তু ১৮৫৬ সালের বিবরণে প্রদত্ত আসল শক্তির পরিমাণ ছিল ১৬১,৪৩৫-১৮৫০ সালের বিবরণের ভিত্তিতে হিসাব করলে ১৮৫৬ সালে যতটা অশ্বশক্তি লাগা উচিত, তা থেকে ১০,০০০ অশ্ব কম।[৫২] (১৮৫৬ সালের) বিবরণীতে যে ব্য দাখিল করা হয়েছে, তাতে বেরিয়ে আসে যে কারখানা ব্যবহার যত সম্প্রসারণ ঘটছে; যদিও আগেকার সময়ে অপশক্তির অনুপাতে যত সংখ্যক কর্মী নিযুক্ত করা হত, এখনো তত সংখ্যক কর্মীই নিযুক্ত করা হচ্ছে, তবু মেশিনারি অনুপাতে নিযুক্ত করা হচ্ছে আতর সংখ্যক শক্তির সাশ্রয় জটিল ও অন্যান্য উপায়ে টিম ইঞ্জিনকে সক্ষম করে তোলা হচ্ছে বর্ধিত পরিমাণ ওজনে মেশিনারি চালনা করতে এবং মেশিনারিতে ম্যানুফ্যাকচারের পদ্ধতিতে উন্নতি ঘটিয়ে মেশিনারির গতিবেগ বাড়িয়ে ও আরো বহুবিধ উপায়ে অধিকতর পরিমাণ কাজ করিয়ে নেওয়া যায়।[৫৩]
“সব রকমের মেশিনে প্রভূত উৎকর্ষ সাধনের ফলে তাদের উৎপাদনশক্তি বিপুল ভাবে বর্ধিত হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে কাজের ঘণ্টা কমানোর দরুনই …….এই সব উৎকর্ষ সাধনের তাড়না সৃষ্টি হয়েছে। মেশিনের এই উৎকর্ষের সঙ্গে শ্রমিকের উপরে আরো তীব্র চাপ মিলে এই ফল ঘটেছে যে, আগে দীর্ঘতর কাজের দিনে যতটা উৎপন্ন হত, তখন দুম্বতর কাজের দিনেও (দু-ঘণ্টা বা এক যষ্ঠমাংশ ২তর) অন্তত ততটা উৎপন্ন হচ্ছে।[৫৪]
