প্রথমত, শ্রমের সময়-হ্রাস এমিককে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অধিকতর শক্তি প্রয়োগে সক্ষম করে এবং এইভাবে শ্রমের ঘনত্ব-রিধানের বিষয়ীগত অবস্থা সৃষ্টি করে। যে-মুহূর্তে এই সময় হ্রাস বাধ্যতামূলক হয়ে যায়, সেই মুহূর্ত থেকে ধনিকের হাত মেশিনারি হয়ে ওঠে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আরো শ্রম নিঙড়ে নেবার জন্য নিয়মিতভাবে নিযুক্ত বিষয়গত উপায়। এটা কার্যকরী করা হয় দুভাবে : মেশিনারি গতি বৃদ্ধি করে এবং শ্রমিককে আরো মেশিনারি দিয়ে। আরো উন্নত ধরনের মেশিনারি নির্মাণের প্রয়োজন হয়—অংশত এই কারণে যে, তা ছাড়া শ্রমিকের উপরে অধিকতর চাপ সৃষ্টি করা যায় না এবং অংশত এই কারণে যে, শ্রম-সময়ের হ্রাস-সাধনের ফলে ধনিক বাধ্য হয় উৎপাদন-ব্যয়ের উপরে তীক্ষ্ণতম নজর রাখতে। স্টিম-ইঞ্জিনে উন্নতি সাধনের ফলে পিস্টন-বেগ বেড়ে গিয়েছে এবং সেই সঙ্গে সম্ভব হয়েছে আরো কম শক্তি ব্যয়ে, একই পরিমাণ বা আরো কম পরিমাণ কয়লা খরচ করে একই ইঞ্জিনের সাহায্যে আরো বেশি মেশিনারি চালনা করা। ট্রান্সমিটিং কারিগরির উন্নতি সাধনের ফলে সংঘর্ষণ কমে গিয়েছে এবং, যে-ব্যাপারটি পূর্বতন মেশিনারি ও আধুনিক মেশিনারির মধ্যে এত পার্থক্য সৃষ্টি করেছে-এই উন্নতিগুলি ‘শ্যাফটিং’-এর ব্যাস ও ওজনকে একটি নিরন্তর হ্রাসমান ন্যূনতম পরিমাপে পর্যবসিত করেছে। সর্বশেষে অপারেটিভ মেশিনগুলিতে উন্নতি সাধনের ফলে একদিকে যেমন সেগুলি আকারে আকারে ক্ষুদ্রতর হয়েছে, অন্যদিকে তেমন বেগে ও নৈপুণ্যে ক্ষিপ্রতর হয়েছে, যথা আধনিক পাওয়ারলুম; অথবা তাদের কাঠামো সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলির কর্ম-সম্পাদনী অঙ্গগুলিরও মাত্রা ও সংখ্যার সম্প্রসারণ ঘটেছে, যথা স্পিনিং মিউল; অথবা এই কর্মসম্পাদনী অঙ্গগুলিতে যৎসামান্য অদল-বদল ঘটানোয় এগুলির গতিবেগ বৃদ্ধি পেয়েছে—যেমন দশ বছর আগে স্বয়ংক্রিয় মিউল-এ স্পিণ্ডলগুলির গতি বৃদ্ধি পেয়েছিল এক-পঞ্চমাংশ হারে।
কাজের দিনকে ১২ ঘণ্টায় কমিয়ে আনার ঘটনা ইংল্যাণ্ডে ঘটেছিল ১৮৩২ সালে। ১৮৩৩ সালে এক কারখানা-মালিক বিবৃতি দেন, “ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগেকার তুলনায় … এখন কারখানাগুলিতে যে শ্রম করতে হয়, তা ঢের বেশি মেশিনারিতে এখন যে বিপুলভাবে বর্ধিত বেশ সঞ্চার করা হয় তাতে আবশ্যক হয় অনেক বেশি মনঃসংযোগ ও ও কর্মতৎপরতা।[৪৫] ১৮৪৪ সালে লর্ড অ্যাশলি, এখন লর্ড শ্যাফটসবেরি, কমন্স সভায় দলিলপত্রের সাক্ষ্যপ্রমাণসহ নিম্নলিখিত বিবৃতি দেন, “ম্যানুফ্যাকচারের বিবিধ প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত কর্মীরা যে-ম সম্পাদন করে, তার পরিমাণ এই ধরনের কর্মকাণ্ডের শুরুতে যে-শ্রম প্রয়োজন হত, তার তিন গুণ।
যে কাজ দাবি করত লক্ষ লক্ষ মানুষের দৈহিক শক্তি, সে কাজ যে মেশিনারি করে দিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু যারা তার আবহ গতিবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাদের শ্রম সে বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে দানবীর ভাবে।………. ১৮১৫ সালে, যখন কাজের ঘণ্টা ছিল দৈনিক ১২ ঘণ্টা, তখন ৪০ নম্বর সুতো কাটায় নিযুক্ত এক জোড়া ‘মিউলকে অনুসরণ করতে দরকার হত, ৮ মাইল হটবার শ্রম। ১৭৩২ সালে ঐ একই নম্বরের সুতা কাটতে নিযুক্ত এক জোড়া “মিউল’ যে দূরত্ব পার হত, তা অনুসরণ করতে লাগত ২০ মাইল, অনেক সময় তার চেয়েও বেশি। ১৮৩৫ সালে (প্রশ্ন : ১৮১৫ বা ১৮২৫?) সুতোকাটুনি প্রত্যেকটি মিউলের উপরে প্রত্যহ চাপাত ৮২০টি স্ট্রেচ’; সুতরাং গোটা দিনে মোট ১,৬৪টি ‘স্ট্রে; ১৮৩৫ সালে সুতোকাটুনি প্রত্যেকটি মিউলের উপরে চাপাত ২,২০ টি স্ট্রেচ’, মোট হতে ৪,৪০০টি। ১৮৪৪ সালে, ২,৪০০টি করে, মোট দাঁড়াত ৪,৮০০টি; এবং কোন কোন ক্ষেত্রে দরকার পড়ত আরো বেশি পরিমাণ শ্রম। আমার হাতে আরো একটি দলিল আছে যা আমাকে পাঠানো হয়েছে ১৮৪২ সালে, যাতে বলা হয়েছে যে শ্রম ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলেছে—বেড়ে চলেছে এই কারণে নয় যে, যে-দূরত্ব এখন অতিক্রম করতে হচ্ছে তা দীর্ঘতর, কিন্তু এই কারণে যে যখন আগের তুলনায় কর্মীর সংখ্যা কম, তখন উৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণ বহুলভাবে বেশি; তার উপরে আবার এখন সুতো কাটা হয় এক নিকৃষ্ট জাতের তুলে দিয়ে, যা নিয়ে কাজ করা আরো কঠিন। ‘কাডিং’ বিভাগেও শ্রম অনেক বেড়ে গিয়েছে। আগে দুজনে যে-কাজ করত, এখন তা করে একজনে। বয়ন বিভাগে নিযুক্ত হয় বিরাট সংখ্যক কর্মী, প্রধানতঃ নারী। সেখানেও সুতো কাটার মেশিনারিতে বর্ধিত গতিবেগ সঞ্চারের দরুণ গত কয়েক বছরে শ্রম বেড়ে গিয়েছে পুরো ১০ শতাংশ। ১৮৩৮ সালে যেখানে প্রতি সপ্তাহে কাটা হত ১৮,০০০ ফেটি সুতে’, সেখানে ১৮৪৩ সালে তার পরিমাণ দাঁড়াল ২১,০… ফেটি। ১৮১৯ সালে যেখানে পাওয়ারলুম বয়নে মিনিট-পিছু ‘পিক’-এর সংখ্যা ছিল ৬০, ১৮৪২ সালে তা দাড়াল ১৪০—যাতে দেখা যায় শ্রম কী বিপুলভাবে বেড়ে গিয়েছে।[৪৬]
শ্রমের এই যে আশ্চর্যজনক তীব্রতাবৃদ্ধি ১৮৪৪ সালের ১২ ঘণ্টা আইনের অধীনে যা আগেই সাধিত হয়ে গিয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয় যে তৎকালীন ইংরেজ কারখানা মালিকেরা যে উক্তি করেছিল তাতে কিছুটা যৌক্তিকতা ছিল। তারা বলেছিল, এই দিকে আর অগ্রগতি অসম্ভব; সুতরাং শ্রমের ঘণ্টায় প্রতিটি হ্রাস-সাধনের অর্থ হল হ্রাস-প্রাপ্ত উৎপাদন। তাদের যুক্তির আপাত সঠিকতা সবচেয়ে প্রকৃষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় তাদের সর্বক্ষণের সতর্ক সমীক্ষক, কারখানা-পরিদর্শক লিয়না হার-এর এই সমসাময়িক বিরতিটি থেকে।
