(গ) শ্রমের তীব্রতা-সাধন
মূলধনের কতলগত মেশিনারি কর্ম-দিবসের যে মাত্রাতিরিক্ত দীর্ঘতা-বিধান করে, তা সমাজের উপরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, কেননা তার ফলে সমাজের প্রাণশক্তির উৎসগুলি পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে পড়ে এবং তা থেকেই আসে স্বাভাবিক কর্ম-দিবস নির্মাণের জন্য আইন-প্রণয়ন। সেই থেকে, শ্রমের তীব্রতা-বর্ধনের যে ব্যাপারটির সঙ্গে আমরা ইতিপূর্বেই পরিচিত হয়েছি, তা সবিশেষ গুরুত্ব ধারণ করে। অনাপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্য সংক্রান্ত আমাদের বিশ্লেষণ আমরা করেছিলাম প্রধানতঃ শ্রমের কার্যকালের। দৈর্ঘ্য বা বিস্তৃতির প্রসঙ্গে। তখন আমরা শ্রমের তীব্রতাকে ধরে নিয়েছিলাম স্থির বলে। এখন আমরা আলোচনা করব দীর্ঘতর শ্রমের পরিবর্তে তীব্রতর শ্রমের স্থান গ্রহণের বিষয় এবং এই শ্রম-তীব্রতার মাত্রা সম্পর্কে।
এটা স্বতঃস্পষ্ট যে, মেশিনারির ব্যবহার যত বিস্তার লাভ করে এবং মেশিনারিতে অভ্যস্ত একটি বিশেষ শ্রেণীর শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা যত পুষ্টি লাভ করে, ততই তার স্বাভাবিক ফলশ্রুতি হিসাবে শ্রমের ক্ষিপ্রতা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। যেমন ইংল্যাণ্ডে, অর্ধ-শতাব্দীকাল ধরে, কর্মদিবসের দীর্ঘতাবৃদ্ধি এবং কারখানা শ্রমের তীব্রতাবৃদ্ধি হাতে হাত দিয়ে চলেছে। যাই হোক, পাঠক পরিস্কার দেখতে পাবেন যে, যেখানে শ্রম আক্ষেপে-বিক্ষেপে সম্পাদিত হয় না, অভিন্ন অপরিবর্তিত ধারাবাহিকতায় পুনরাবর্তিত হয় দিনের পর দিন, সেখানে এমন একটা পর্যায় অনিবার্য ভাবেই আসবে, যে-পর্যায়ে কর্মদিবসের বিস্তৃতি এবং তীব্রতা এমন ভাবে পরস্পর-ব্যতিরেকী হবে যে, কর্ম-দিবসের দীর্ঘতা-বিস্তার কেবল শ্রমের তীব্রতা-লাঘবের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং উচ্চ মাত্রার তীব্রতা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে কেবল কর্ম-দিবসের হ্রস্বতা-সাধনের সঙ্গে। যে মুহূর্তে শ্রমিক শ্রেণীর ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহের মুখে পার্লামেন্ট বাধ্য হল বাধ্যতামূলক ভাবে শ্রমের ঘণ্টা হ্রাস করতে এবং নিময়-মাফিক কারখানাগুলির উপরে একটি স্বাভাবিক কর্ম-দিবস চাপিয়ে দিতে, যে মুহূর্তে তার ফলে কর্ম-দিবসকে দীর্ঘতর করে বর্ধিত উদ্ব-মূল্য, উৎপাদনের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেল, সেই মুহূর্ত থেকে মূলধন তার সর্বশক্তি প্রয়োগে করল যথাশীঘ্র সম্ভব মেশিনারির আরো উন্নতি সাধন করে আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের প্রচেষ্টায়। সেই সঙ্গে আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্যের প্রকৃতিতে ঘটল এক পরিবক্স। সাধারণ ভাবে বলা যায়, আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের পদ্ধতি হচ্ছে শ্রমিকের উৎপাদিকা শক্তির বৃদ্ধিসাধন, যাতে করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একই পরিমাণ শ্রম ব্যয় করে সে আরো বেশি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। মোট উৎপন্ন দ্রব্যে শ্রম-সময় আগের মত একই মূল্য সঞ্চারিত করে থাকে, কিন্তু বিনিময় মূল্যের এই অপরিবতিত পরিমাণ বিস্তৃতি লাভ করে অধিকতর ব্যবহারশূল্যের উপরে। সুতরাং প্রত্যেকটি একক পণ্যের মূল্য পড়ে যায়। অন্যথা, অবশ্য, যখন শ্রমের ঘন্টা বাধ্যতামূলক ভাবে হ্রাস করা হয়, তখনি এটা ঘটে। উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ এবং উৎপাদনের উপায়-উপকরণের সাশ্রয়-শাধনে তা যে বিপুল গতিবেগ সঞ্চার করে, সেই বেগ শ্রমিকের উপরে চাপিয়ে দেয় একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শ্রমের বর্ধিত ব্যয়, শ্রমশক্তির বর্ধিত প্রেষণ (টেসন) এবং কর্মদিবসের রন্ধ্রগুলি বন্ধ করণ কিংবা এমন মাত্রায় শ্রমের ঘনত্বসাধন, যা সাধ্যায়ত্ত হতে পারে কেবল স্বীকৃত কর্মদিবসের সীমার মধ্যে। একটি বৃহত্তর পরিমাণ শ্রমের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই যে ঘনীভবন, তা তখন থেকে গণ্য হতে থাকে, সত্য সত্যই তা ঠিক যা, সেই হিসাবেই, অর্থাৎ বৃহত্তর পরিমাণ শ্রম হিসাবে। আরো কিছুটা বিস্তৃতি তথা স্থায়িত্বকাল ছাড়াও, শ্রম এখন অর্জন করে আরো কিছুটা তীব্রতা, আরো কিছুটা নিবিড়তা বা ঘনত্ব।[৩৮] দশ ঘণ্টার কর্মদিবসের একটি রন্ধ-বিরল ঘণ্টা একটি বানো ঘণ্টার কর্মদিবসের রন্ধবহুল ঘণ্টার তুলনায় অধিকতর শ্রম অর্থাৎ ব্যয়িত শ্রমশক্তি ধারণ করে। সুতরাং পূর্বোক্ত ১ ঘণ্টার উৎপন্ন দ্রব্য শেষোক্ত ১ ১/৫ ঘণ্টার উৎপন্ন দ্রব্যের সমান বা তা থেকে বেশি মূল্য ধারণ করে। শ্রমের বর্ধিত উৎপাদনক্ষমতার মাধ্যমে আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্যের বর্ধিত অবদান ছাড়াও, সেই একই পরিমাণ মূল্য এখন ধনিকের জন্য উৎপাদিত হয়, ধরুন, ৩ ১/৩ ঘণ্টার উদ্বৃত্ত-মূল্য ও ৬ ২/৩ আবশ্যিক মুল্যের দ্বারা, যা পূর্বে উৎপাদিত হত ৪ ঘণ্টার উত্তম ও ৮ ঘণ্টার আবশ্যিক শ্রমের দ্বারা।
এখন আমরা যে-প্রশ্নটিতে আসি, তা এই: শ্রমের তীব্রতা বৃদ্ধি কিভাবে সাধিত হয়।
কর্ম-দিবসকে হ্রস্ব করার প্রথম ফলটি উদ্ভূত হয় এই স্বতঃস্পষ্ট নিয়মটি থেকে যে, শ্রম-শক্তির নৈপুণ্য তার ব্যয়িত পরিমাণের সঙ্গে বিপরীত অনুপাতে সম্পর্কিত। অধিকন্তু, শ্রমিক যে বাস্তবিকই অধিকতর শ্রম শক্তি ব্যয় করে, তা নিশ্চয়ীকৃত হয় ধনিক কি পদ্ধতিতে তাকে পারিশ্রমিক দেয়, তার উপরে।[৩৯] কুম্ভকার-শিল্পের মত যে সব শিল্পে মেশিনারি সামান্যই অংশ গ্রহণ করে কিংবা একেবারেই করে না, সেখানে কারখানা আইনের প্রবর্তনের ফলে জাজ্বল্যমান ভাবে দেখা গিয়েছে যে, কর্ম-দিবসকে কেবল হ্রস্ব করলেই শ্রমের নিয়মিকতা, অভিন্নতা, শৃংখলা-নিষ্ঠা, ধারাবাহিকতা ও উদ্যমশীলতা আশ্চর্যজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়।[৪০] অবশ্য, এ ব্যাপারে সন্দেহ আছে যে, সঠিকভাবে যাকে কারখানা বলা যায়, যেখানে মেশিনারির অভিন্ন ও অনবচ্ছিন্ন গতির উপরে নির্ভরশীলতা ইতিমধ্যেই কঠোরতম নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠা করেছে, সেখানে এই ফল ঘটবে কিনা। সুতরাং ১৮৪৪ সালে যখন কাজের দিনকে ১২ ঘণ্টার নীচে নামিয়ে আনার তর্ক চলছিল, তখন মালিকেরা সমস্বরে ঘোষণা করেছিল যে, বিভিন্ন ধরে তাদের তদারককারীরা সযত্নে লক্ষ্য রাখে যাতে কর্মীরা কোন সময় না হারায়, শ্রমিকের দিক থেকে সতর্কতা মনোযোগ আর খুব সামান্যই বাড়ানো সম্ভব”, এবং, সেই কারণেই, মেশিনারির গতি ও অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, “একটি সুপরিচালিত কারখানায় শ্রমিকের বর্ধিত মনোযোগ থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফল লাভের প্রত্যাশা করা একটা অবাস্তব ব্যাপার[৪১] এই উক্তি অবশ্য পরীক্ষার ফলে ভুল বলে প্রতিপন্ন হল। ১৮৪৪ সালের ২০শে এপ্রিল তারিখে ও তার পর থেকে রবার্ট গার্ডনার প্রেক্টনে অবস্থিত তার দুটি বড় বড় কারখানায় কাজের সময় ১২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ১১ ঘন্টা করেন। প্রায় এক বছর এই ভাবে চলার ফল হিসাবে দেখা গেল যে, একই খরচে একই পরিমাণ উৎপাদন পাওয়া গিয়েছে এবং সমগ্রভাবে শ্রমিকেরা আগে ১২ ঘণ্টা করে কাজ করে যে মজুরি পেত, এখন সেই একই পরিমাণ মজুরি পাচ্ছে ১১ ঘন্টা করে কাজ করে।”[৪২] ‘স্পিনিং’ ও ‘কার্ডিং বিভাগ ছেড়ে আমি ‘উইভিং বিভাগে যাচ্ছি, কারণ ঐ দুটি বিভাগে মেশিনের গতি ২ শতাংশ করে বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু ‘উইভিং’-এর ঘরে, যেখানে নানান ধরনের সৌখীন সামগ্রী বোনা হয়, সেখানে কাজের অবস্থায় সামান্যতম পরিবর্তনও করা হয়নি। ফল এই : “১৮৪৪ সালের ৬ই জানুয়ারী থেকে ২০শে এপ্রিল পর্যন্ত, যখন ১২ঘন্টার দিন চালু হয়েছিল, তখন প্রত্যেক কর্মীর সপ্তাহপ্রতি গড় মজুরি হল ১০ শিলিং ১ ১/২ পেন্স। ১৮৪৪-এর ২০শে এপ্রিল থেকে ২৯শে জুন পর্যন্ত, যখন চালু হল ১১ ঘন্টার দিন, তখন সপ্তাহপ্রতি গড় মজুরি হল ১. শিলিং ৩ ১/২ পেন্স।”[৪৩] আমরা এখানে আগে ১২ ঘণ্টার যা উৎপাদন করেছি, ১১ ঘণ্টায় তা থেকে বেশি উৎপাদন করলাম এবং এটা সমগ্রভাবে সম্ভব হল শ্রমিকদের দ্বারা অধিকতর মনঃসংযোগ ও সময়-সাশ্রয়ের কল্যাণে। যদিও তারা পেল একই মজুরি এবং এক ঘণ্টার বাড়তি সময়, তবু ধনিক কিন্তু পেল একই পরিমাণ উৎপাদন এবং বাচালো এক ঘণ্টার কয়লা, গ্যাস ও অন্যান্য জিনিস। মেসার্স হয় অ্যাণ্ড জ্যাকসন’-এর মিলগুলিতে চালানো হয় একই পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পাওয়া একই সাফল্য।[৪৪]
