একটি বিশেষ শিল্পে মেশিনারির ব্যবহার যখন আর ব্যাপকতা লাভ করে, তখন উৎপন্ন দ্রব্যটির সামাজিক মূল্য তার ব্যক্তিগত মূল্য নেমে যায় এবং সেই যে নিয়ম, যা বলে যে, মেশিনারি যে-শ্রমশক্তির স্থান নিয়েছে, সেই শ্রমশক্তি থেকে, মুনাফার উদ্ভব হয় না, মুনাফার উদ্ভব হয় সেই শ্রমশক্তি থেকে, বস্তুতই যা মেশিনারির সঙ্গে কাজ করার জন্যই নিযুক্ত হয়, সেই নিয়মটি কার্যকরী হয়। উদ্বৃত্ত-মূল্যের উদ্ভব ঘটে কেবল অস্থির মূলধন থেকেই, এবং আমরা দেখেছি যে, উদ্বৃত্ত-মূল্যের পরিমাণ নির্ভর করে দুটি উপাদানের উপরে, যথা, উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার এবং যুগপৎ নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা। কর্মদিবসের দৈর্ঘ্য যদি নির্দিষ্ট থাকে, তা হলে উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার নির্ধারিত হয় এক দিনে আবশ্যিক শ্রমের স্থায়িত্ব-কালএবং উদ্বত্ত-শ্রমের স্থায়িত্ব কালের দ্বারা। এদিকে, যুগপৎ নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা নির্ভর করে স্থির মূলধনের সঙ্গে অ স্থির মূলধনের আনুপাতিক হার দ্বারা। এখন, মের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে আবশ্যিক শ্রমের বিনিময়ে মেশিনারির ব্যবহার উত্তমকে যত বেশিই বৃদ্ধি করুক না কেন, এটা পরিষ্কার যে তা এই ফল লাভ করে কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন কর্তৃক কর্ম-নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যায় হ্রাস সাধন করেই। দৃষ্টান্ত হিসাবে, ২৪ জন শ্রমিকের কাছ থেকে যতটা উদ্বৃত্ত-মূল্য নিঙড়ে নেওয়া যায়, ২ জনের কাছ থেকে ততটা যায় না। যদি এই ২৪ জন লোকের প্রত্যেকে ১২ ঘণ্টায় কেবল ১ ঘণ্টা করে উত্তম দেয়, তা হলে ২৪ জন মানুষ সম্মিলিত ভাবে দেয় ২৪ ঘণ্টা উত্তম, যেখানে ২ জন লোকের মোট শ্রমই হল ২৪ ঘণ্টা। অতএব, উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনে মেশিনারির প্রয়োগ এমন একটি দ্বন্দ্ব সূচিত করে যা তার মধ্যে অন্তনিহিত, কেননা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন দ্বারা সৃষ্ট উদ্বৃত্ত-মূল্যের দুটি উপাদানের মধ্যে একটিকে, উদ্বৃত্ত-মূল্যের হারটিকে বাড়ানো যায় না যদি না, অন্যটিকে, শ্রমিকদের সংখ্যাটিকে কমানোনা হয়। যে মুহূর্তে একটি বিশেষ শিল্পে, মেশিনারির সাধারণ নিয়োগের দ্বারা, মেশিন উৎপাদিত পণ্যটির মূল্য একই ধরনের সমস্ত পণ্যের মূল্যকে নিয়ন্ত্রিত করে, সেই মুহূর্তেই এই দ্বন্দ্বটির[৩৪] বহিঃপ্রকাশ ঘটে; এবং এই দ্বন্দ্বটিই যা আবার তখন ধনিককে তার নিজের উপলব্ধির আগেই তাড়িত করে কর্মদিবসের মাত্রাতিরিক্ত দীর্ঘতা সাধনে, যাতে করে শোষিত শ্রমিকদের আপেক্ষিক সংখ্যায় যে হ্রাস ঘটেছে, সে তার তার ক্ষতিপূরণ করতে পারে কেবল আপেক্ষিক উত্তমেই নয়, সেই সঙ্গে অনাপেক্ষিক উত্তমের বৃদ্ধি সাধন করে।
তাহলে, একদিকে যখন মেশিনারির ধনতান্ত্রিক ব্যবহার কর্ম-দিবসে মাত্রাতিরিক্ত দীর্ঘতাসাধনের দিকে শক্তিশালী প্রেরণা যুগিয়ে থাকে এবং যেমন প্রমের পদ্ধতিসমূহে, তেমনি সামাজিক কর্ম-সংগঠনের চরিত্রেও এমন ভাবে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে যে, দীর্ঘতাসাধনের এই প্রবণতার পথে সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে; অন্য দিকে তখন তা—অংশতঃ শ্রমিক শ্রেণীর নোতুন নোতুন স্তর, যারা ছিল পূর্বে খনিকের কাছে অনধিগম্য, তাদেরকে তার কাছে উন্মুক্ত করে দিয়ে এবং অংশত, যে-শ্রমিকদের তা উচ্ছিন্ন করে দিয়েছে তাদেরকে মুক্তি দিয়ে সৃষ্টি করে এক উদ্ধত শ্রমিক জনসংখ্যা[৩৫], যে জনসংখ্যা বাধ্য হয় মূলধনের নির্দেশের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে। এই জন্যই আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে প্রত্যক্ষ হয় এই অসাধারণ ঘটনা-মেশিনারি ঝেটিয়ে বিদায় করে দেয় কর্ম-দিবসের দৈর্ঘ্যের উপরে প্রতিটি নৈতিক ও প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণ। এই জন্যই প্রত্যক্ষ হয় অর্থনৈতিক দিক থেকে এই আপাত-বিরোধী ঘটনা —শ্রম-সময়ের হ্রস্বতাসাধনের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী হাতিয়ারটিই পরিণত হয় শ্রমিক ও তার পরিবারের সমগ্র সময়ের প্রত্যেকটি মুহূর্ত ধনিকের আয়ত্তে আনবার অব্যর্থ উপায়, যাতে করে সে বাড়াতে পারে তার মূলধনের মূল্য। পুরাকালের মহত্তম চিন্তাবিদ আরিস্তোতল স্বপ্ন দেখেছিলেন, যদি প্রত্যেকটি ‘টুল’ নির্দেশমত অথবা, এমনকি, স্বেচ্ছামত তার উপযোগী কাজ করতে পারত, পারত, ঠিক যেমন দেদেলাস এর সৃষ্টিগুলি নিজেরাই চলাফেরা করত কংবা হেফিস্তোস-এর তেপায়াগুলি নিজে থেকেই যেত তাদের পবিত্র কর্মানুষ্ঠানে, যদি তাঁতীদের মাকুগুকি আপনা-আপনিই কাপড় বুনত, তা হলে মালিক-কারিগরের লাগত না কোনো শিক্ষানবিশ কিংবা প্রভুদের লাগত না কোনো ক্রীতদাস।[৩৬] এবং সিসেরোর আমলের একজন বড় কবি আন্তিপাস শস্য-পেষাইয়ের জন্য জল চক্রের উদ্ভাবনটি সমন্ত মেশিনারি প্রাথমিক রূপ, তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন ক্রীতদাসীদের মুক্তিদাতা বলে এবং স্বর্ণযুগের প্রত্যাবর্তক বলে।[৩৭] হায়রে! হিদেনের (বিধর্মীর) দল! ওঁরা অর্থতত্ত্ব বা খ্রীস্টতত্ত্বের কিই বুঝতে পারেননি যা প্রাজ্ঞ বাষ্টিয়াট এবং তারও আগে প্রাজ্ঞতর ম্যাককুলক আবিষ্কার করেছেন। যেমন তারা বুঝতে পারেননি যে মেশিনারি হচ্ছে কর্ম-দিবসকে দীর্ঘায়িত করার সবচেয়ে নিশ্চিত উপায়। ওঁরা বোধহয় একজনের ক্রীতদাসত্বকে মাফ করেছিলেন এই কারণে যে তার ফলে আরেকজনের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। কিন্তু যাতে করে কয়েকজন অমার্জিত অর্ধ-শিক্ষিত ভুইফোড় ব্যক্তি হয়ে ১৬তে পারে “বিশিষ্ট সুতো কলমালিক” “বৃহৎ সসেজ-প্রস্তুতকারক” ও “প্রভাবশালী জুতোর কালির কারবারি। সেজন্য জনসমষ্টির ক্রীতদাসত্ব প্রচার করার মত ফ্রস্টধর্মের শব্দঝংকার পদের ছিলনা।
