একটি মেশিনের ক্ষয়-ক্ষতি তার কাজের সময়ের সঙ্গে সঠিকভাবে আনুপাতিক নয়। আর যদি তা হত, তা হলে ৭ বছর ধরে দৈনিক ১৬ ঘণ্টা হিসাবে কাজ করে সেই একই কর্মকাল জুড়ে কাজ করত, যা সে করত ১৫ বছর ধরে দৈনিক মাত্র ৮ ঘণ্টা হিসাবে কাজ করে এবং প্রথম ক্ষেত্রে মোট উৎপন্ন দ্রব্যে সে যে মূল্য স্থানান্তরিত করত, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা থেকে বেশি করত না। কিন্তু প্রথম কোটিতে দ্বিতীয় ক্ষেত্রটির তুলনায় দ্বিগুণ তাড়াতাড়ি মেশিনটির মূল্য পুনরুৎপাদিত হত এবং প্রথম ক্ষেত্রে মালিক মেশিনটিকে এই ভাবে ব্যবহার করে ৭ বছরে আত্মসাৎ করত সেই পরিমাণ উদ্বৃত্ত মূল্য, যা সে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আত্মসাৎ করত ১৫ বছরে।
কোন একটি মেশিনের বস্তুগত ক্ষয়-ক্ষতি দুই প্রকারের। এক প্রকারের ক্ষয় ক্ষতি ঘটে ব্যবহারের ফলে, যেমন মুদ্রায় বেলায় ঘটে হাতে হাতে ঘোরার ফলে এবং অন্য প্রকারের ক্ষয়-ক্ষতি ঘটে অ-ব্যবহারের ফলে, যেমন একটি তলোয়ারকে যদি তার খাপে রেখে দেওয়া হয়, তাহলে তাতে মরচে ধরে যায়। দ্বিতীয় প্রকারের ক্ষয়-ক্ষতির কারণ প্রাকৃতিক শক্তিসমূহ। মেশিনের ব্যবহারের সঙ্গে কম বেশি প্রত্যক্ষভাবে আনুপাতিক কিন্তু দ্বিতীয়টি কিছু মাত্রায় বিপরীত ভাবে আনুপাতিক।[২৬]
কিন্তু বস্তুগত ক্ষয়-ক্ষতি ছাড়াও, একটি মেশিনের ঘটে থাকে, যাকে বলা যায়, নৈতিক অবমূল্যায়ন। সে হারায় তার বিনিময়মূল্য হয়, তার মত একই ধরনের মেশিন তার চেয়ে সস্তায় উৎপাদিত হবার ফলে, আর নয়তো, তার চেয়ে ভাল মেশিন তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আসার ফলে।[২৭] উভয় ক্ষেত্রেই, মেশিনটি যতই তারুণ্য ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর হোক না কেন, তার মূল্য আর তার মধ্যে সত্য সত্যই বাস্তবায়িত শ্রমের দ্বারা নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় তাকে বা উন্নততর মেশিনটিকে পুনরুৎপাদন করতে যে-শ্ৰম সময় আবশ্যক হয়, তার দ্বারা; সুতরাং, তা কম বা বেশি মূল্য হারিয়েছে। তার মোট মূল্য পুনরুৎপাদন করতে সময় যত কম লাগে, নৈতিক অবমূল্যায়নের বিপদও তত কম হয়; এবং কাজের দিনটি যত দীর্ঘ হয়, ঐ সময়টাও তত কম লাগে। যখন মেশিনারি প্রথম শিল্পে প্রবর্তিত হয়, তখন থেকে তাকে আরো সস্তায় পুনরুৎপাদনের পদ্ধতি একটার পরে একটা আঘাতের পর আঘাতের মত আসতে থাকে,[২৮] এবং উন্নতিও ঘটে একটার পরে একটা, যা কেবল তার ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গে ও প্রতাতেই পরিবর্তন ঘটায় না, গোটা কাঠামোটাতেই পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে। অতএব, মেশিনারির জীবনের শুরুর দিকেই কর্ম-দিককে দীর্ঘতর করা এই বিশেষ প্রেরণাটি সব চেয়ে তীব্র ভাবে আত্মপ্রকাশ করে।[২৯]
কর্মদিবসের দৈর্ঘ্য যদি নির্দিষ্ট থাকে, অন্যান্য সব কিছু যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে দ্বিগুণ সংখ্যক শ্রমিকের শোষণের জন্য প্রয়োজন হবে স্থির মূলধনের যে অংশটি মেশিনারি ও বাড়িঘরে বিনিয়োজিত হয়, কেবল সেই সঙ্গে সেই অংশেরও দ্বিগুণীকরণ, যা খাটানো হয় কাঁচামাল ও সহায়ক দ্রব্যসামগ্রীতে। অন্য দিকে, কর্ম-দিবসের দীর্ঘতা সাধনের ফলে মেশিনারি ও বাড়ি-ঘরের উপরে মূলধনের পরিমাণে পরিবর্তন না ঘটিয়ে, উৎপাদনের আয়তন বৃদ্ধি করা যায়।[৩০] সুতরাং, কেবল যে উদ্বৃত্ত-মূল্যের বৃদ্ধিপ্রাপ্তিই ঘটে, তাই নয়, তা পাবার জন্য যে-বিনিয়োগের প্রয়োজন তার হ্রাস প্রাপ্তিও ঘটে। এটা ঠিক যে, কর্ম-দিবস যত বার বাড়ানো যায়, ততবারই এটা ঘটে থাকে, কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আরো বেশি প্রকট, কেননা উপকরণে রূপান্তরিত মূলধন আরো বৃহত্তর মাত্রায় গুরুত্ব লাভ করে।[৩১] কারখানা ব্যবস্থার অগ্রগতির ফলে মূলধনের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ এমন একটি আকারে স্থাপিত হয়, যে-আকারে তার মূল্য একদিকে, ক্রমাগত আত্মপ্রকাশের সক্ষমতা লাভ করে এক অন্যদিকে, সে যখনই জীবন্ত শ্রমের সঙ্গে হারায় তার সংস্পর্শ তখনি হারায় ব্যবহার মূল্য ও বিনিময়মূল্য—উভয় মূল্যই। বিরাট তুলো-ব্যবসায়ী মিঃ অশয়ার্থ অধ্যাপক নাসাউ ডবল সিনিয়রকে বলেন, “যখন একজন শ্রমিক তার কোদালটি নামিয়ে রাখে, সে তখনকার মত আঠারো পেনি মূল্যের একটি মূলধনকে অকেজো করে দেয়। যখন আমাদের লোকজনদের কেউ একজন মিল ছেড়ে যায়, সে অকেজো করে দেয় এমন একটি মূলধন যাতে ব্যয় হয়েছে ১,০০,০০০ পাউণ্ড।”[৩২] একবার কল্পনা করুন! একটি মূলধন যাতে খরচ পড়েছে ১,০০,০০০ পাউণ্ড, তাকে এক মুহূর্তের জন্য অকেজো করে রাখা। সত্যিই এটা একটা দানবীয় ব্যাপার যে, আমাদের লোকজনদের কেউ একজনও কারখানা ছেড়ে যাবে ! অ্যাশওয়ার্থের কাছ থেকে আলোকপ্রাপ্ত হয়ে মিঃ সিনিয়র যে-জিনিসটি পরিষ্কার দেখতে পেলেন তা এই যে, মেশিনারির বর্ধিত ব্যবহার কর্মদিবসের নিরন্তর বর্ধমান দীর্ঘায়নকে করে তোল “বাঞ্ছনীয়”। [৩৩]
মেশিনারি উৎপাদন করে আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্য; কেবল, প্রত্যক্ষভাবে, শ্রম শক্তির মূল্যহ্রাস ঘটিয়েই, এবং, পরোক্ষভাবে, যেসব পণ্য তার পুনরুৎপাদনে অংশ নেয় তাদের সস্তা করেই যে সে এটা করে, তাই নয়, সেই সঙ্গে যখন সে বিক্ষিপ্তভাবে প্রথম শিল্পে প্রবর্তিত হয় তখন সে তা করে থাকে করে থাকে মেশিনারি-মালিকের দ্বারা নিযুক্ত শ্রমকে উচ্চতর মাত্রাসম্পন্ন ও অধিকতর ফলপ্রসূ শ্রমে রূপান্তরিত করে, উৎপন্ন দ্রব্যটির সামাজিক মূল্যকে তার ব্যক্তিগত মূল্যের উপরে উন্নীত করে, এবং, এইভাবে একদিনের শ্রমশক্তির মূল্যের পরিবর্তে এক দিনের উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্যের একটি ক্ষুদ্রতর অংশকে স্থলাভিষিক্ত করার কাজে মালিককে সক্ষম করে। এই অতিক্রান্তির কালে, যখন মেশিনারির ব্যবহার মোটামুটি একটি একচেটিয়া ব্যাপার, তখন স্বভাবতই মুনাফা হয় অসাধারণ এবং মালিকও চেষ্টা করে কর্ম-দিবসকে যথাসাধ্য দীর্ঘায়িত করে তার প্রথম প্রেমের অরুণাললাকিত প্রহরটির পরিপূর্ণ অযোগ গ্রহণ করতে। মুনাফার আয়ন তার অনো মুনাফার লোলুপতাকে আরো শাণিত করে তোলে।
