উক্ত আইন অনুসারে, একটি মুদ্রণ কাজে নিযুক্ত হবার আগে এই ধরনের কর্ম নিযুক্তির প্রথম দিনটির ঠিক পূর্ববর্তী ছয় মাসের মধ্যে প্রত্যেকটি শিশুকে অন্তত ৩০ দিন কিংবা অন্তত ১৫০ ঘণ্টা অবশ্যই পাঠশালায় হাজিরা দিতে হবে এবং সেই মুদ্রণ কারখানায় কাজে থাকা কালে পর পর প্রতি ছয় মাসে তাকে অনুরূপ ৩০ দিন বা ১৫০ ঘণ্টা করে পাঠশালায় হাজির থাকতে হবে…….. পাঠশালায় এই হাজিরা অবশ্যই হতে হবে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে। কোন একটি দিনে ২ ১/২ ঘণ্টার কম বা ৫ ঘণ্টার বেশি হাজিরা দিলে, তা ঐ ১৫০ ঘণ্টার মধ্যে গণ্য করা হবে না। সাধারণ অবস্থায় শিশুরা পাঠশালায় যায় সকালে ও বিকালে ৩০ দিনের জন্য, প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা করে এবং ৩০ দিন পার হলে আইন-নির্ধারিত ১৫০ ঘণ্টা উত্তীর্ণ হলে, তাদের ভাষায়, বইয়ের পাঠ শেষ হলে, তারা কারখানায় ফিরে যায়, যেখানে তারা আরো ছয় মাস কাজ চালিয়ে যায়, যখন আর এক দফা পাঠশালায় হাজিরার দিন এসে যায় এবং তারা আর একবার পাঠশালায় যায় এবং আর একবার বইয়ের পাঠ শেষ করে।……… অনেক ছেলের ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, পাঠশালায় হাজিরার নির্ধারিত ঘণ্টা-সংখ্যা সমাপ্ত করে যখন তারা কারখানায় ফিরে গিয়ে ছমাস কাজ করার পরে আবার পাঠশালায় যায়, তখন তারা প্রথম যেদিন ‘প্রিন্ট-বয়’ হিসাবে যোগ দিয়েছিল, সেদিন যে-অবস্থায় ছিল সেই অবস্থাতেই রয়েছে। দেখা যায় যে, প্রথম পাঠশালায় হাজিরা থেকে যতটুকুই বা তারা শিখেছিল, তার সবটুকুই তারা ইতিমধ্যে ভুলে গিয়েছে।
অন্যান্য মুদ্রণ-কারখানায় শিশুদের পাঠশালায় হাজিরা পুরোপুরি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটির কাজের প্রয়োজনের উপরে। প্রতি মাসে নির্ধারিত ঘণ্টার সংখ্যা পুষিয়ে দেওয়া হয়, বলা যায়, গোটা ছ-মাস জুড়েই এককালীন তিন ঘণ্টা থেকে পাঁচ ঘণ্টার দফাওয়ারি ভাবে। …… যেমন, একদিন হয়ত হাজিরা পড়ে সকাল ৮টা থেকে ১১টা, অন্যদিন আবার বেলা ১টা থেকে ৪টা; তার পরে হয়তো কয়েক দিন ধরে শিশুটির আর পাঠশালায় দেখাই তার মেলেনা; যখন অবোর দেখা মিল, তখন তার হাজিরা পড়ল বিকাল ৩টা থেকে ৬টা; হয়তো কখনো সে হাজিরা দিল পরপর ৩৪ দিন, এমনকি এক সপ্তাহ, তার পরে গরহাজির রইল আবার ৩ সপ্তাহ বা এক মাস। তারপরে আবার হাজির হল কোন বেয়াড়া দিনে বেয়াড়া সময়ে-যখন তার নিয়োগকর্তা তাকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে। এই ভাবে শিশুটিকে নিয়ে যেন ঘুষোঘুষি চলে কারখানা থেকে পাঠশালায় এবং পাঠশালা থেকে কারখানায় এবং এইভাবে চলে, যে-পর্যন্ত-না শেষ হয় ১৫০ ঘণ্টার কাহিনীটি।” [২২]
শ্রমিকের সারিতে নারী ও শিশুদের অতিরিক্ত সংখ্যায় ভর্তি করে নিয়ে মেশিনারি শেষ পর্যন্ত ভেঙে ফেলল পুরুষ কর্মীদের সেই প্রতিরোধ, তারা ম্যানুফ্যাকচারের আমলে খাড়া করে রেখেছিল মূলধনের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে।[২৩]
(খ) শ্রম-দিবসের দীর্ঘায়ন
মেশিনারি যদি হয় শ্রমের উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধি করার অর্থাৎ একটি পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাজের সময়ের হ্রস্বতা সাধনের সবচেয়ে বলিষ্ঠ উপায়, তা হলে মূলধনের হাতে তা পরিণত হয়, যেসব শিল্প সে প্রথম আক্রমণ করে সেই সব শিল্পে, মানব-প্রকৃতির দ্বারা আরোপিত সব সীমারেখার বাইরে শ্রম-দিবসকে দীর্ঘায়িত করার সবচেয়ে বলিষ্ঠ উপায়ে। এক দিকে তা সৃষ্টি করে এমন নোতুন সব অবস্থা যার দ্বারা মূলধন সক্ষম হয় শ্রম-দিবসকে দীর্ঘায়িত করার দিকে তার যে নিরন্তর প্রবণতা তাকে অবাধ সুযোগ দিতে, এবং অন্য দিকে, তা সৃষ্টি করে এমন সব প্রণোদনা যার দ্বারা অপরের শ্রম শোষণ করবার জন্য মূলধনের যে ক্ষুধা হয়। আরো তীব্র।
প্রথমতঃ মেশিনারির আকারে শ্রমের উপকরণসমূহ হয় স্বয়ংক্রিয়; শ্রমিককে ছাড়াই কাজকর্ম চলে এবং সব কিছু সচল থাকে। তখন থেকে সেগুলি পরিণত হয় একটি শিল্পগত ‘পার্পেটাম মোবাইল (perpetuum mobile )-এ, যা চিরকাল উৎপাদন করে চলবে, যদি না মেশিনারিটি তার মানবিক পার্শ্বচরদের দুর্বল দেহ ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি-জনিত কতকগুলি প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত না হয়। মূলধনের আকারে এবং যেহেতু তা মূলধন সেই কারণেই, অটোমেশন (স্বয়ংকরণ) খনিকের ব্যক্তিকে ভূষিত হয় বুদ্ধিবৃত্তি ও ইচ্ছাশক্তির দ্বারা; সুতরাং সেই বিয়কর অথচ নমনীয় প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকের তথা মানুষের দ্বারা উপস্থাপিত প্রতিরোধকে ন্যূনতম মাত্রায় পর্যবসিত করবার কামনায় তা হয়ে ওঠে উজ্জীবিত।[২৪] অধিকন্তু, মেশিনের কাজের বাহিক লঘুতা এবং কর্ম-নিযুক্ত নারী শিশুদের অপেক্ষাকৃত নমনীয় ও বশ্যতাপ্রবণ স্বভাব এই প্রতিরোধের শক্তিকে হ্রাস করে দেয়।[২৫]
আমরা আগেই দেখেছি, মেশিনারির উৎপাদনশীলতা সে যে-মূল্য উৎপন্ন-দ্রব্যে স্থানান্তরিত করে, তার সঙ্গে বিপরীত ভাবে আনুপাতিক। মেশিনের আয়ু যত দীর্ঘ হয়, ততই যত সংখ্যক উৎপন্ন দ্রব্যে মেশিনটি কর্তৃক সঞ্চারিত মূল্য বিস্তৃতি লাভ করে, তার সামূহিক পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং ততই সেই মূল্যের আরো কম কম অংশ প্রত্যেকটি একক উৎপন্ন-দ্রব্যে সংযুক্ত হয়। যাই হোক, একটি মেশিনের সক্রিয় আয়ুষ্কাল স্পষ্টতই নির্ভর করে শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্যের উপরে কিংবা প্রাত্যহিক শ্রম-প্রক্রিয়ার স্থায়িত্বকাল x সেই প্রক্রিয়াটি কতদিন ধরে সম্পাদিত হয়েছে তার সংখ্যার উপরে।
