১০ পাঃ চা= ২ আউন্স স্বর্ণ
৪০ পাঃ কফি= ২ আউন্স স্বর্ণ
১ কোয়ার্টার শস্য= ২ আউন্স স্বর্ণ
১/২ টন লৌহ= ২ আউন্স স্বর্ণ
ও পণ্য ক= ২ আউন্স স্বর্ণ
ক থেকে খ-এ এবং খ থেকে গ-এ পরিবর্তনটি হলো মৌলিক। কিন্তু গ-এর সঙ্গে খ-এর একমাত্র পার্থক্য এই যে সমঅৰ্থ রূপের স্থানে ছিটের বদলে স্বর্ণ বসানো হয়েছে তা ছাড়া আর কোন পার্থক্য নেই। সমীকরণে যেমন ছিল ছিট, সেই রকম ঘ সমীকরণে স্বর্ণ ধারণ করেছে সর্বজনীন সমঅৰ্থ রূপ। এ ক্ষেত্রে অগ্ৰগতি হলো এইটুকু যে সামাজিক প্রথা অনুসারে চূড়ান্তভাবে একটি পদার্থ, অর্থাৎ স্বর্ণ, এখন সর্বত্র সরাসরি বিনিময়যোগ্য অর্থাৎ সর্বজনীন সমআর্ঘ রূপের স্থান প্রতিষ্ঠিত।
অন্যান্য পণ্যের সম্পর্কে স্বর্ণ এখন অর্থ কারণ স্বৰ্ণও আগে ছিল অন্যান্য পণ্যের মতোই সাধারণ একটি পণ্য। অন্যান্য পণ্যের মতোই এই পণ্যটিও খণ্ড খণ্ড বিচ্ছিন্ন বিনিময়ে একটি পণ্যের অথবা সাধারণ ভাবে সমস্ত পণ্যের সমঅৰ্থ রূপ ধারণে সক্ষম। ছিল। ক্রমশঃ বিবিধ সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই পণ্যটি সর্বজনীন সমঅর্থের রূপ গ্ৰহণ করেছে। যখনি এই পণ্যটি অন্যান্য সমস্ত পণ্যের সাধারণ মূল্যরূপ ধারণ করলো, তখনি তা হয়ে দাঁড়ালো অর্থ পণ্য আর শুধু তখনি দেখা দিল গ-এর সঙ্গে খ-এর সুস্পষ্ট পার্থক্য এবং মূল্যের সাধারণ রূপটি পরিবর্তিত হয়ে অর্থক্লপে আবির্ভূত হলো।
স্বর্ণ অর্থে পরিণত হবার পর ছিটের মতো কোন একটি পণ্যের আপেক্ষিক মূল্য যদি প্রাথমিক রূপে স্বর্ণের মাধ্যমে প্ৰকাশ করা হয়, তাহলে সেটি হল উক্ত পণ্যের দাম। সুতরাং ছিটের দাম হলো–
২০ গজ ছিট = ২ আউন্স স্বর্ণ অথবা ঐ দুই আউন্স সোনা দিয়ে যদি দুটি মোহর তৈরী করা হয়, তা হলে
২০ গজ ছিট = ২ মোহর
অৰ্থরূপ সম্বন্ধে কোন স্পষ্ট ধারণা করতে হলে সর্বজনীন সমঅৰ্ঘ রূপটি অর্থাৎ মূল্যের সাধারণ রূপম্বরূপ গ সমীকরণটি ভালো করে বুঝতে হবে। মূল্যের সম্প্রসারিত রূপ, তথা খ সমীকরণ থেকে কষে এটাকে বের করা হয়েছে; তার আবার মূল উপাদান হচ্ছে কি সমীকরণটি ২০ গজ ছিট = ১ কোট অথবা ও পরিমাণ ক পণ্য ঔ পরিমাণ খ পণ্য রূপই হচ্ছে অর্থ-রূপের বীজ।
১.৪ পণ্যপৌত্তলিকতা এবং তার রহস্য
প্রথম অধ্যায়। চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
প্রথম দৃষ্টিতে পণ্যকে মনে হয় যেন একটি তুচ্ছ বস্তু এবং সহজেই বোধগম্য। কিন্তু বিশ্লেষণের ফলে দেখা গেলো যে তা বহু আধ্যাত্মিক ও আধিবিদ্যাক সুক্ষ্ম তত্ত্বে পরিবৃত একটি অদ্ভুত ব্যাপার। ব্যবহার-মূল্য হিসেবে তার ভিতর রহস্যময় কিছুই নেই, সেই ব্যবহার-মূল্য অভাব পূরণের ক্ষমতা স্বরূপই বিবেচিত হোক অথবা তা মনুষ্যশ্রম থেকে উৎপন্ন বস্তু স্বরূপই বিবেচিত হোক। একথা দিনের আলোর মতই পরিষ্কার যে মানুষ তার শ্ৰীমদ্বারা প্ৰকৃতিদত্ত সামগ্ৰীকে পরিবতিত করে তাকে মানুষের পক্ষে ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। উদাহরণ স্বরূপ, কাঠের রূপ, কাঠের রূপ বদলে টেবিল তৈরী হয়। তথাপি ঐ পরিবর্তন সত্ত্বেও টেবিল আটপৌরে কাঠই থেকে যায়। কিন্তু যে মুহুর্তে তা পণ্যরূপে এক পা এগোয়, অমনি তা পরিণত হয় একটি তুরীয় ব্যাপারে। তখন তা কেবল জমির ওপর পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ায় না, অন্যান্য পণ্যের সম্পর্কে তা মাথায় ভর দিয়ে দাঁড়ায়। তখন তার নিজের কাষ্ঠ মস্তিষ্ক থেকে নির্গত হয় এমন সমস্ত কিস্তৃত ধারণা যা ‘টেবিল ওলটানো’র চেয়েও অনেক বেশি অদ্ভুত।
সুতরাং পণ্যের রহস্যময় চরিত্রের সূত্র তার ব্যবহার-মূল্য নয়। মূল্য যে সব উপাদান দিয়ে নির্ধারিত হয়, তাদের প্রকৃতি থেকেও এই রহস্যের উদ্ভব নয়। কারণ প্রথমতঃ, ব্যবহারযোগ্য শ্ৰম তথা উৎপাদনক্ষম কর্ম যতই বিবিধ রকমের হোক না কেন, শারীরবৃত্তের ঘটনা এই যে শ্রম হচ্ছে মানুষের জৈবদেহের-মস্তিক, স্নায়ু, পেশী-প্ৰভৃতির কার্যকলাপ। দ্বিতীয়তঃ, শ্রমের পরিমাণগত নির্ধারণ যার ওপর নির্ভর করে হয়। অর্থাৎ যতক্ষণ ধরে শ্রম ব্যয় করা হয়েছে সেই পরিমাণ সময় তথা শ্রমের পরিমাণ, তা হিসেব করতে গেলে দেখা যাবে যে তার গুণমান এবং পরিমাণের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। সমাজের সমস্ত অবস্থাতেই মানুষ এ বিষয়ে আগ্রহশীল যে জীবনধারণের সামগ্ৰী উৎপন্ন করতে কতটা শ্ৰম-সময় লাগলো, যদিও সমস্ত যুগে এ আগ্রহ সমান নয়।(১) সর্বশেষে, মানুষ যখন থেকে কোন-না-কোন প্রকারে পারস্পরিক সহযোগিতায় কাজ করা শুরু করেছে, তখন থেকেই তাদের শ্ৰম ধারণ করেছে একটি সামাজিক চরিত্র।
তা হলে, শ্ৰমজাত সামগ্ৰী পণ্যে পরিণত হবার সঙ্গে সঙ্গে তার রহস্যময় চরিত্রটি কোখেকে আবির্ভূত হয়? স্পষ্টতঃই, এই রূপ থেকেই তার আবির্ভাব। শ্রমদ্বারা উৎপন্ন নানারকম জিনিস সমমূল্যরূপ ধরে বলেই বিভিন্ন প্ৰকার শ্রমেরও পরিমাণ সমান হতে পারে; শ্ৰম-সময় দ্বারা শ্রমশক্তি ব্যয়ের যে পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়, তা হয়ে দাঁড়ায় শ্রমোৎপন্ন সামগ্ৰীর মূল্যের পরিমাণ; এবং শেষ পর্যন্ত, শ্রমিকদের পারস্পরিক যে সম্পৰ্কসমূহ থেকে শ্রম সামাজিক চরিত্র লাভ করে, তাকে শ্রমোৎপন্ন বিভিন্ন দ্রব্য-সামগ্ৰীীর পারস্পরিক সম্পর্ক বলে মনে হয়।
সুতরাং, পণ্য একটি রহস্যময় বস্তু, শুধু এই কারণেই যে তার মধ্যে মানুষের শ্রমের সামাজিক চরিত্রটি তাদের কাছেই দেখা দেয় তাদের শ্রমোৎপন্ন জিনিসটির উপরে মুদ্রিত একটি বিষয়গত চরিত্র হিসেবে, উৎপাদনকারীদের নিজেদেরই শ্রমোৎপন্ন সর্বমোট ফল তাদেরই কাছে উপস্থাপিত হয় একটি সামাজিক সম্পর্ক হিসেবে-যেন তা তাদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক নয়, বরং তাদের শ্রমোৎপন্ন দ্রব্যাদির মধ্যকারী পারস্পরিক সম্পর্ক। এই জন্যই শ্রমোৎপন্ন সামগ্ৰী হয়ে দাঁড়ায় পণ্য, অর্থাৎ এমন একটি জিনিস, যার গুণগুলি একই সঙ্গে ইন্দ্ৰিয়গ্ৰাহও বটে। এই রকমভাবেই যখন কোন বস্তু থেকে আলো এসে আমাদের চোখের উপর পড়ে, তখন তাকে আমরা আমাদের নিজ নিজ চোখের ভিতরকার স্বায়ুর কম্পন ব’লে অনুভব করি না, তখন তাকে দেখি চোখের বাইৱেকার একটা বস্তুর আকারে। কিন্তু আমরা কোন কিছু দেখি তখনি, যখন প্ৰকৃতপক্ষে আলোর যাত্রা ঘটে এক বস্তু থেকে অপর বস্তুতে, বাহ বস্তু থেকে চক্ষুতে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন পদার্থের মধ্যে পদার্থগত সম্বন্ধই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু পণ্যের বেলায় দেখছি অন্যরকম ব্যাপার। এক্ষেত্রে, যাকে বলে মূল্য-সম্পর্ক অর্থাৎ নানাপ্রকার পণ্যের ভিতর যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং যে সম্পর্কের ভিতর বিবিধ শ্রমলব্ধ দ্রব্য পণ্যের চরিত্র লাভ করে সে সম্পর্কের সঙ্গে ঐ সমস্ত জিনিসের পদার্থগত গুণাবলীর এবং তজনিত বস্তুগত সম্পর্কের কোন যোগ নাই। ওখানে যে সম্পর্কটা স্পষ্টতই মানুষের সঙ্গে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক সেটাকে তারা ভুল চোখে দেখে এক বস্তুর সঙ্গে অপর বস্তুর সম্পর্ক হিসেবে। কাজেই উপমার জন্য বাধ্য হয়ে কুহেলিকাময় ধর্ষজগতের শরণাপন্ন হচ্ছি। সে জগতে মানুষের মগজ থেকে গজানো ভাব সতন্ত্র জীবন্ত সত্তার মূর্তি ধারণ করে এবং মনে হয় যেন সেই মূর্তিগুলিই পরস্পরের মধ্যেও মনুষ্যজাতির সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এই রকমটিই ঘটে পণ্য জগতে মানুষের হাতে গড় জিনিসের বেলায়। আমি একেই বলি পণ্য-পৌত্তলিকতা, মানুষের শ্ৰমদ্বারা উৎপন্ন দ্রব্য যখনই পণ্যে পরিণত হয়েছে, তখনই তা এই রহস্যদ্বারা আবৃত হয়েছে, কাজেই এ রহস্য পণ্যোৎপাদনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।
