প্রথমে, মেশিনারির ভিত্তিতে গজিয়ে-ওঠা কারখানাগুলিতে প্রত্যক্ষ ভাবে এবং, তার পরে, শিল্পের বাকি সব শাখায় অপ্রত্যক্ষভাবে, মেশিনারি যাদেরকে মূলধনের শোষণের শিকারে পরিণত করে, সেই শিশু ও তরুণ-তরুণীদের, সেই সঙ্গে নারীদেরও, শারীরিক অবনতির কথা আমরা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি। অতএব এখানে আমরা কেবল একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব-শ্রমিকদের শিশুদের মধ্যে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে মৃত্যুহারের বিপুলতার বিষয়টি নিয়ে। যে-সমস্ত রেজিষ্ট্রি-জেলায় ইংল্যাণ্ড, বিভক্ত সেই জেলাগুলির ঘষালটিতে এক বছরের কমবয়সী এমন প্রতি ১,০০,০০০ শিশুর মধ্যে এক বছরে গড়ে মারা যায় ৯০ ০ ০টি (একটি জেলায় মাত্র ৭, ০৪৭); ২৪টি জেলায় ১৩,০০০-এর বেশি কিন্তু ১১০০০-এর কম; ৩৯টি জেলায় ১১,০০০-এর বেশি কিন্তু ১২,০০০-এর কম; ৪৮টি জেলায় ১২০০০-এর বেশি কিন্তু ১৩০ ৬০-এর কম; ২২টি জেলায় ২০,০০০-এর বেশি; ২৫টি জেলায় ২১,০০০-এর বেশি; ১৭টিতে ২২০০০-এর বেশি; ১১টিতে ২৩,০০০-এর বেশি; হু, উলভারহ্যাম্পটন, অ্যাশটন-আণ্ডার-লাইন এক প্রেস্টনে ২৪,৩০০-এর বৈশি; নটিংহাম, স্টকপোর্ট এবং ব্রাডফোর্ডে ২৫,০০০-এর বেশি। উইসবিচে ২৬,৩০-এর বেশি এবং ম্যাঞ্চেস্টারে ২৬,১২৫।[৯] ১৮৬১ সালে একটি মেডিক্যাল সমীক্ষায় এই তথ্য প্রকাশ পেয়েছিল যে, স্থানীয় বিভিন্ন কারণ ছাড়া, এই উচ্চ মৃত্যু-হারের প্রধান কারণ হল বাড়ি থেকে দুরে মায়েদের চাকরি এবং তাদের অনুপস্থিতির ফলে অবহেলা ও অযত্ন; দৃষ্টান্ত হিসাবে অনেক কিছুর মধ্যে উল্লেখ করা যায়, অপ্রতুল পুষ্টি, অনুপযোগী খাদ্য ও ঘুমপাড়ানি মাদক সেবন; এছাড়াও মা ও শিশুর মধ্যে ঘটে এক অস্বাভাবিক বিচ্ছেদ এবং তার ফলে শিশুদের ইচ্ছাকৃত ভাবে উপোস করিয়ে রাখা, বিষ-খাওয়ান।[৯] সেই সব কৃষি-প্রধান, জেলা, “যেগুলিতে ন্যূনতম সংখ্যায় নারী কর্ম-নিযুক্ত, (শিশু) মৃত্যুর হার কিন্তু খুবই নিচু ”[১০] অবশ্য, ১৮০১ তদন্ত কমিশন একটি অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তে উপনীত হল; তা এই যে উত্তর সাগরের তীরে অবস্থিত কৃষিপ্রধান জেলাগুলিতে এক বছরের অনূর্ধ্ব-বয়স্ক শিশুদের মৃত্যুহার সর্বাপেক্ষা খারাপ কারখানা-জেলাগুলির মৃত্যু-হারের প্রায় সমান। সুতরাং ডাঃ জুলিয়ান হান্টারকে দায়িত্ব দেওয়া হল ব্যাপারটি সরেজমিনে তদন্ত করে দেখতে। “জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ষষ্ঠ প্রতিবেদন”[১১]-এর সঙ্গে তাঁর প্রতিবেদনটিও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ততদিন পর্যন্ত ধরে নেওয়া হত যে, নিচু ও জলা-জায়গায় ভরা জেলা গুলির বিশেষত্ব যে ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য নানাবিধ রোগ, সেগুলির প্রকোপেই প্রতি দশ জনে একটি শিশুর মৃত্যু হয়। কিন্তু তদন্তে যা প্রকাশ পেল, তা ঠিক বিপরীত; প্রকাশ পেল যে, যে-কারণটি ম্যালেরিয়াকে তাড়িয়ে দিল, সেই কারণটিই-শীতকালে জলাভূমি থেকে এবং গ্রীষ্মকালে তৃণবিরল চারণভূমি থেকে জমির সুফলা শস্য ক্ষেত্রে রূপান্তরণের ঘটনাটিই—আবার অস্বাভাবিক হারে শিশুমৃত্যুর সূচনা করল।[১২] চিকিৎসাবিজ্ঞানের যে-সত্তর জন ব্যক্তিকে নিয়ে ডাঃ হান্টার ঐ জেলায় অনুসন্ধান চালান, তাঁরা সকলেই এই বিষয়ে আশ্চর্যজনক ভাবে একমত।” বাস্তবিক পক্ষে কৃষি-পদ্ধতিতে বিল্পবের ফলে শিল্প-ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটেছিল। চুক্তি-নির্ধারিত একটি টাকার অংকের জন্য বিবাহিত নারীরা কাজ করে বালক-বালিকাদের সঙ্গে দল বেঁধে; ‘আণ্ডারটেকাররা (ঠিকাদার’) নামে এক ব্যক্তি, যে গোটা দলটির হয়ে চুক্তি করে, সে এই গোটা দলটিকে স্থাপন করে একজন জোত-মালিকের অধীনে। অনেক সময়ে এই ধরনের দলগুলিকে তাদের নিজেদের গ্রাম ছেড়ে যেতে হয় অনেক অনেক মাইল দূরে; পথে পথে তাদের দেখা যায় পরনে খাটো পেটিকোট, মানানসই কোট ও বুট এবং কখনো কখনো ট্রাউজার; তাদের দেখায় আশ্চর্য রকম সবলা ও স্বাস্থ্যবতী কিন্তু অত্যন্ত অসচ্চরিত্রতার দ্বারা কলংকিতা; তাদের হতভাগ্য সন্তানগুলি, যারা বাড়িতে আকুল ভাবে প্রতীক্ষা করছে, তাদের উপরে নিজেদের এই ব্যস্ত ও স্বাধীন জীবন কী মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে, সে বিষয়ে তাদের নেই কোনো ভ্রুক্ষেপ।[১৩] কারখানা-জেলাগুলির প্রত্যেকটি ঘটনার এখানে পুনঃপ্রাদুর্ভাব ঘটে –সেই অ-প্রচ্ছন্ন শিশুহত্যা, আফিমে অভ্যস্ত করা সমেত প্রত্যেকটি ঘটনা, তবে আরো বর্ধিত হারে।[১৪] প্রিভি কাউন্সিলের মেডিক্যাল অফিসার ও জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রতিবেদনসমূহের প্রধান সম্পাদক ডঃ সাইমন বলেন, “যে-গভীর আশংকার সঙ্গে আমি কোন শিল্পক্ষেত্রে বয়স্কা নারীদের বৃহৎসংখ্যায় কর্ম-নিয়োগকে দেখে থাকি, এই সমস্ত খারাপ ব্যাপারের জ্ঞান আমার সেই আশংকার কৈফিয়ৎ হিসাবে কাজ করতে পারে।[১৫] কারখানা-পরিদর্শক মি বেকার তাঁর সরকারি প্রতিবেদনে চিৎকার করে ওঠেন, “ইংল্যাণ্ডের কারখানা-জেলাগুলির পক্ষে বাস্তবিকই সেটা হবে একটা সুখের ব্যাপার, যখন পরিবার আছে এমন প্রত্যেকটি বিবাহিতা নারীর পক্ষে কোনো কাপড়ের কলে কাজ করা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হবে।[১৬]
ধনতান্ত্রিক শোষণ নারী ও শিশুদের যে নৈতিক অধঃপতন ঘটায় তার ছবি এফ এঙ্গেলস তার Lage dec Arbeitenden klasse Englands”-এ এমন সামগ্রিক ভাবে চিত্রিত করেছেন যে এখানে বিষয়টির উল্লেখ করাই হবে যথেষ্ট। কিন্তু অপরিণত মানব-সন্তানদের কেবল উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের যন্ত্রে রূপান্তরিত করে কৃত্রিম ভাবে সৃষ্টি করা হয় যে মানসিক উষ -মনের এমন একটা অবস্থা যা স্বাভাবিক অজ্ঞতার অবস্থা থেকে ভিন্ন, কেননা স্বাভাবিক অজ্ঞতা মনকে অনাবাদী ফেলে রাখে কিন্তু তার বিকাশ-ক্ষমতাকে তার স্বাভাবিক উর্বরতাকে ধ্বংস করে দেয়না—এই মানসিক উষরতা শেষ পর্যন্ত এমনকি ইংরেজ পার্লামেন্টকেও বাধ্য করল কারখানা আইনের পরিধিভুক্ত প্রত্যেকটি শিল্পে ১৪ বছরের চেয়ে কম বয়সী শিশুদের “উৎপাদনশীল কর্ম-নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি আবশ্যিক শর্ত হিসাবে আইন প্রণয়ন করতে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের মর্মবস্তুটি প্রকট হয়ে পড়ে কারখানা আইনের তথাকথিত শিক্ষাসংক্রান্ত ধারাগুলির হাস্যকর শব্দ-বিন্যাসে, প্রশাসনিক যন্ত্রের অনুপস্থিতিতে-মে অনুপস্থিতির দরুন বাধ্যবাধকতাটা হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ অলীক, এই শিক্ষা-সংক্রান্ত ধারাগুলির প্রতি স্বয়ং মালিকদের বিরোধিতায় এবং এগুলিকে এড়িয়ে যাবার জন্য তারা যেসব ছলাকলা অবলম্বন করে সেইসব ছলাকলায়। এই জন্য কেবল আইনসভাকেই দোষ দিতে হয় কেননা সে এমন একটা লোক-ঠকানো আইন পাশ করল, যাতে মনে হয় যেন কারখানায় সে শিশুরা কাজ করবে তাদের আবশ্যিক শিক্ষাদানের একটা ব্যবস্থা হল অথচ এমন কোন আইন করা হল না যার বলে ঐ ঘোষিত উদ্দেশ্য সাধনকে সুনিশ্চিত করা যায়। সপ্তাহের কয়েকটি দিন রোজ কয়েক (তিন ঘণ্টা করে শিশুরা পাঠশালা নামক একটি স্থানে চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে এবং নিয়োগা প্রতি সপ্তাহে একজন ব্যক্তির কাছ থেকে—চাদা-দাতারা যার নাম দিয়েছে শিক্ষক’ বা ‘শিক্ষিকাতার কাছ থেকে সেই মর্মে একটি স্বাক্ষরিত সাটিফিকেট পাবে।”[১৭] ১৮৪৪ সালে সংশোধিত কারখানা-আইন পাশ হবার আগে প্রায়শই এটা ঘটত যে শিক্ষক বা শিক্ষিকা ঐ সার্টিফিকেট স্বাক্ষর করেছে কেবল একটি ‘ল’ (x) চিহ্ন দিয়ে, কেননা সে নিজেই লিখতে পড়তে জানত না। একবার ‘পাঠশালা’ নামে অভিহিত একটি স্থান পরিদর্শন করে, যেখান থেকে পাঠশালায় উপনিত ধাকার সার্টিফিকেট দেওয়া হয় এমন একটি স্থান পরিদর্শন করে, আমি মাস্টারটির অজ্ঞতা দেখে এমন স্তম্ভিত হয়ে যাই যে, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, “মার্জনা করবেন, মহাশয়, আপনি কি পড়তে জানেন? সে উত্তর দিল,” “ঐ কিছুমিছু।” তার পরে যোগ করল, “যা হোক, আমি তো আমার ছাত্রদের চেয়ে আগে আছি।” ১৮৪৪ সালে যখন ঐ আইনের খসড়া প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন পাঠশালা নামে অভিহিত এই স্থানগুলি, যেগুলির কাছ থেকে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট আইন-অনুসারে তাদের মেনে নিতে হয়, সেগুলি যে কী কলঙ্কজনক অবস্থায় রয়েছে, পরিদর্শকেরা সে সম্পর্কে তাঁদের বক্তব্য জানাতে অক্ষমতা দেখাননি, কিন্তু তারা মাত্র এইটুকু করাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে ১৮৪৪ সালের আইন পাশ হবার পর থেকে শিক্ষককে নিজের হাতেই সার্টিফিকেটগুলি পূরণ করতে হবে এবং খ্রীস্টান নাম ও পদবী পুরোপুরি স্বাক্ষর করতে হবে।”[১৮] স্কটল্যাণ্ডের কারখানা-পরিদর্শক স্যার জন কিনকেইডও অনুরূপ অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, “যে পাঠশালাটি আমরা প্রথম পরিদর্শন করি, সেটি ছিল জনৈক শ্ৰীমতী অ্যান কিলিনের দায়িত্বে। তাকে তার নিজের নামের বানান জিজ্ঞাসা করতেই সে চটপট একটি ভুল বানান বলল, সে ‘কিলিন (Killin) বানান শুরু করল “C” অক্ষরটি দিয়ে, তার পরে সঙ্গে সঙ্গেই তা শুধরে নিয়ে বলল, “K”। কিন্তু সাটিফিকেট বইগুলিতে আমি লক্ষ্য করলাম, সে তার নামের বানান লিখেছে নানান ভাবে এবং তার হাতের লেখা দেখে আমার সন্দেহ রইলনা যে শিক্ষাদান সে একেবারেই অযোগ্য। সে নিজেও স্বীকার করল, সে রেজিস্টার রাখতে পারে না ………দ্বিতীয় পাঠশালাটিতে আমি দেখলাম ঘরটি ১৫ ফুট লম্বা এবং ১০ ফুট চওড়া এবং তাতে রয়েছে ৭৫টি শিশু; তারা কি যেন বিড়বিড় করছিল—একেবারেই অবোধ্য।[১৯] কিন্তু উল্লিখিত শোচনীয় স্থানগুলি থেকেই যে কেবল শিশুরা কিছু না শিখেই পাঠশালায় হাজিরার সার্টিফিকেট পায়—হ্যা, কিছু না শিখেই, কারণ যেখানে যোগ্য শিক্ষক বা শিক্ষিকা আছে, সেখানেও তিন বছর থেকে শুরু করে উপরের দিকে সব বয়সের ছেলে-মেয়েদের বেয়াড়া ভিড়ে তার চেষ্টা ফলপ্রসূ হতে পারে না; তার জীবিকার উপায়, যখন সবচেয়ে ভাল, তখনো শোচনীয়, কেননা তাকে নির্ভর করতে হয় যত বেশি সংখ্যক শিশুকে সে ঐ জায়গাটুকুতে ধরাতে পারে, তত সংখ্যক শিশুর কাছ থেকে প্রাপ্ত পেনির উপরে। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে আসবাবের খাতা, বইপত্র ও অন্যান্য শিক্ষা সামগ্রীর অভাব এবং একটি বদ্ধ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশহতভাগ্য শিশুগুলির উপরে যার প্রভাব খুব নৈরাশ্যজনক। আমি এমন বহু পাঠশালা দেখেছি যেখানে সারি সারি শিশু একেবারেই কিছু করেনা অথচ এই অবস্থাকেই সাটিফিকেট দেওয়া হয় পাঠশালায় হাজিরা বলে এবং পরিসংখ্যানগত বিবরণীতে এই শিশুদেরই দেখান হয় শিক্ষা পাচ্ছে বলে।”[২০] স্কটল্যাণ্ডে কারখানা-মালিকরা সর্বতোভাবে চেষ্টা করে যাতে যে-সব শিশুরা পাঠশালায় যেতে বাধিত হয়, তাদের বাদ দিয়েই কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। এটা প্রমাণ করতে বড় বেশি যুক্তির প্রয়োজন হয় না যে, যখন কারখানা-আইনের শিক্ষা-সংক্রান্ত ধারাগুলি মিল-মালিকরা এত অপছন্দ করে, তখন তারা বহুল পরিমাণে সচেষ্ট হয় ঐ শ্রেণীর শিশুদের কর্ম-নিয়োগ থেকে এবং উক্ত আইনে অভিপ্রেত সুবিধা থেকে সমভাবে বঞ্চিত করতে।”[২১] ভয়ানক কদর্য আকারে এটা আত্মপ্রকাশ করে মুদ্রণ কারখানায়, যেগুলি নিয়ন্ত্রিত হয় একটি বিশেষ আইনের দ্বারা।
