৭. ব্যাবেজ-এর হিসাব অনুযায়ী সুতোকাটুনি মই একক ভাবে তুলোর মূল্যে সংযোজিত করে শতকরা ১১৭ ভাগ। একই সময়ে (১৮৩২), মিহি সুতো কাটার শিল্পে মেশিনারি ও শ্রমের দ্বারা তুলোয় সংযোজিত মোট মূল্য ছিল শতকরা ৩৩ ভাগ। (“অন দি ইকনমি অব মেশিনারি, পৃ ১৬৫, ১৬৬)।
৮. মেশিনে মুদ্রণের ফলে রঙেরও সাশ্রয় ঘটে।
৯. ‘সোসাইটি অব আর্টস’-এর সমক্ষে ভারত সরকারের রিপোটার ও ওয়াটসন কর্তৃক পঠিত প্রতিবেদন, ১৭ই এপ্রিল, ১৮৬০।
১০. এই সকল নীরব প্রতিনিধিরা (মেশিনসমূহ) যত সংখ্যক শ্রমিককে স্থানচ্যুত করে তার চেয়ে কম স’খ্যক শ্রমিকের দ্বারা সর্বসময়ে প্রস্তুত হয়, এমনকি যখন তাদের অর্থ-মূল্য একই থাকে। (রিকার্ডো প্রিন্সিপ লস অফ পলিটিক্যাল ইকনমি, সি পৃঃ ৪০)
১১. সুতরাং একটি বুর্জোয়া সমাজে মেশিনারি নিয়োগের যে অবকাশ ঘটে, তা থেকে একটি কমিউনিস্ট সমাজে তার অবকাশ ঘটবে খুবই ভিন্ন প্রকারের।
১২. “শ্রমের নিয়োগকর্তারা অযথা ১৩ বছরের কম বয়সী দু প্রন্ত শিশুকে বহাল রাখবেন না। বস্তুতঃ পক্ষে এক শ্রেণীর ম্যানুফ্যাকচারার এখন কদাচিৎ ১৩ বছরের কম-বয়সী শিশুদের অর্থাৎ হাফ-টাইমারদের নিয়োগ করে। তারা নানান ধরনের উন্নত প্রকারের মেশিন প্রবর্তন করেছে, যার ফলে শিশু-নিয়োগ অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। (১৩ বছরের কম বয়সী) নমুনা হিসাবে আমি শিশুসংখ্যা-হ্রাসের একটি প্রক্রিয়ার কথা বলব, যে-প্রক্রিয়ায় একটি মাত্র মেশিন-পিসিং মেশিন’—চার থেকে ছ’জন হাফ-টাইমারের কাজ একজন তরুণ ( ১০ বছরের বেশি বয়সী) করতে পারে। ‘হাফ-টাইম’ ব্যবস্থা ‘পিসিং মেশিন’-এর উদ্ভাবনে “প্রেরণা যুগিয়েছে”। (রিপোর্টস অব ইন্সপেক্টরস অব ফ্যাক্টরিজ, ৩১ অক্টোবর ১৮৫৫)
১৩. “বেচারা” (“রেচ”) কথাটা ইংরেজ রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্বে কৃষি-মজুরকে বোঝতে ব্যবহৃত একটি স্বীকৃত শব্দ।
১৪. “শ্রম ( তিনি বোঝাতে চাইছেন মজুরি) না বাড়া পর্যন্ত মেশিনারি ঘন ঘন খাটানো যায় না।” ( রিকার্ডো, প্রিন্সিপল অব পলিটিক্যাল ইকনমি, পৃঃ ৪৭৯)।
১৫. “রিপোর্ট অব দি সোশ্যাল সাইন্স কংগ্রেস, এবি, ১৮৬৩” দ্রষ্টব্য।
.
তৃতীয় পরিচ্ছেদ — শ্রমিকের উপরে মেশিনারির প্রত্যক্ষ ফলাফল।
আমরা দেখেছি, আধুনিক শিল্পের সূচনা-বিন্দু হচ্ছে শ্রমের উপকরণে বিপ্লব, এবং এই বিপ্লব তার সর্বোচ্চ বিকশিত রূপ অর্জন করে একটি কারখানায় মেশিনারির সংগঠিত ব্যবস্থায়। কেমন করে মানবিক সামগ্রী এই বাস্তব সংগঠনটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়, সে সম্পর্কে অন্বেষণের পূর্বে আমরা বিবেচনা করব স্বয়ং শ্রমিকের উপরে এই বিপ্লবের কয়েকটি সাধারণ ফলাফল।
ক মূলধন কর্তৃক পরিপূরক শ্রমশক্তির ব্যবহার নারী ও শিশুদের কর্মে নিয়োগ।
যতদূর পর্যন্ত মেশিনারি পেশী-শক্তিকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলে, ততদূর পর্যন্ত তা ক্ষীণবল পেশী-শক্তিসম্পন্ন শ্রমিকদের এবং দৈহিক বিকাশের দিক থেকে অসম্পূর্ণ, এবং সেই কারণেই যাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আরো নমনীয়, তাদের কর্ম সংস্থানের একটি উপায় হয়ে ওঠে। সুতরাং মেশিনারি-ব্যবহারকারী ধনিকদের প্রথম নজর পড়ে নারী ও শিশুদের শ্রমের উপরে। শ্রম ও শ্রমিকদের সেই প্রবল বিকল্পটি সঙ্গে সঙ্গে রূপান্তরিত হয়ে গেল নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে শ্রমিক-পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যকে মূলধনের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বের অধীনে ভর্তি করে নিয়ে মজুরি-শ্রমিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি করার একটি উপায়ে। ধনিকের জন্য বাধ্যতামূলক কাজ কেবল শিশুদের খেলা-ধুলোর স্থানই দখল করে নিলনা, সেই সঙ্গে দখল করে নিল মোটামুটি মাত্রার মধ্যে পরিবার-প্রতিপালনের জন্য বাড়িতে স্বাধীন শ্রমের যে স্থান, সেই স্থানটিকেও।[১]
শ্রমশক্তির মূল্য নির্ধারিত হত কেবল একক বয়স্ক শ্রমিকটির ভরণপোষণের জন্য প্রয়োজনীহ শ্রম-সময়ের দ্বারাই নয়, নির্ধারিত হত তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম-সময়ের দ্বারাও। পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যকে শ্রমের বানরে ছুড়ে দিয়ে, মেশিনারি মানুষটির শ্রমশক্তির মূল্যকে ছড়িয়ে দেয় তার গোটা পরিবারের উপরে। এই ভাবে মেশিনারি তার শ্রমশক্তির অবমূল্যায়ন ঘটায়। হয়তে, পরিবারের কর্তাব্যক্তিটির শ্রমশক্তি ক্রয় করতে আগে যে খরচ পড়ত, তার তুলনায় চারজন কাজের লোকের একটি পরিবারের শ্রমশক্তি ক্রয় করতে খরচ হয় বেশি, কিন্তু, প্রতিদানে, চার দিনের শ্রম নেয় এক দিনের জায়গা এবং একজনের উদ্বৃত্ত মূলের উপরে চারজনের উদ্বৃত্ত-মূল্যের অতিরিক্ত অংশের অনুপাতে তাদের দামও পড়ে যায়। পরিবারটি যাতে বাঁচতে পারে, তার জন্য চারজন মানুষের কেবল শ্রম করলেই চলবেনা, ধনিকের জন্য উদ্বৃত্ত-শ্রমও ব্যয় করতে হবে। অতএব আমরা দেখতে পাচ্ছি, মূলধনের শোষণ-ক্ষমতার প্রধান বিষয় যে মানবিক সামগ্রী,[২] মেশিনারি তার বৃদ্ধি সাধনের সঙ্গে সঙ্গে, শোষণের মাত্রাও বৃদ্ধি করে।
শ্রমিক ও খনিকের মধ্যে যে চুক্তি আনুষ্ঠানিক ভাবে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্দিষ্ট করে দেয়, মেশিনারি সম্পূর্ণ ভাবে সেই চুক্তিটিতেও বৈপ্লবিক পৰিবর্তন ঘটিয়ে দেয়। পণ্য-বিনিময়কে আমাদের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করে, আমরা প্রথমে ধরে নিয়েছিলাম যে, ধনিক এবং শ্রমিক পরস্পরের মুখোমুখি হয় স্বাধীন ব্যক্তি হিসাবে, পণ্যের স্বাধীন মালিক হিসাবে; একজনের মালিকানায় আছে টাকা ও উৎপাদনের উপায়, অন্য জনের মালিকানায় শ্রমশক্তি। কিন্তু এখন ধনিক কিনে নেয় শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণ ছেলেমেয়েদের। পূর্বে শ্রমিক বিক্রি করত তার নিজের শ্রমশক্তি, যা সে দিত তথাকথিত স্বাধীন ব্যক্তি হিসাবে। এখন সে বেচে দেয় তার স্ত্রী ও সন্তান। সে পরিণত হয় এক দাস-ব্যবসায়ীতে।[৩] শিশু-শ্রমের জন্য চাহিদা প্রায়শই রূপগত ভাবে মিলে যায় নিগ্রো ক্রীতদাসদের জন্য অনুসন্ধানের সঙ্গে, যা চোখে পড়ে আমেরিকার পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের আকারে। জনৈক ইংরেজ কারখানা-পরিদর্শক বলেন, “আমার জিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যানুফ্যাকচারকারী শহরগুলির মধ্যে একটি শহরের স্থানীয় পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপনের প্রতি আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। নীচে বিজ্ঞাপনটির একটি প্রতিলিপি দেওয়া হয় : “কর্মখালি : চাই ১২ থেকে ২০ জন তরুণ ব্যক্তি; ১৩ বছর বয়স বলে চালিয়ে দেওয়া যায় তার চেয়ে তরুণ হলে চলবে না; মজুরি সপ্তাহে ৪ শিলিং; আবেদন কর ইত্যাদি ইত্যাদি[৪] “১৩ বছর বয়স বলে চালিয়ে দেয়া যায় এই অংশটির প্রাসঙ্গিকতা এই যে, কারখানা-আইন অনুযায়ী ১৩ বছরের কম বয়সের শিশুদের কেবল দিনে ছয় ঘণ্টা করে কাজ করানো চলে। সরকারি ভাবে নিযুক্ত একজন ডাক্তারকে তাদের বয়স সম্পর্কে সার্টিফিকেট দিতে হবে। সুতরাং ম্যানুফ্যাকচারকারীরা এমন সব শিশুদের চায় যাদের ১৩ বছর বয়স হয়েছে বলে মনে হয়। কারখানাগুলিতে ১৩ বছরের অনূর্ধ্ব-বয়স্ক শিশুদের সংখ্যা কমে যাওয়ার অনেক সময়ে দারুণ ভাবে কমে যাওয়ার ঘটনা যা আশ্চর্যজনক ভাবে প্রকাশ পেয়েছে ইংল্যাণ্ডের গত ২০ বছরের পরিসংখ্যানে-তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সার্টিফিকেট প্রদানকারী ডাক্তারদের কাজ, যারা ধনিকের শোষণ-লোলুপতাকে এবং মাতা-পিতার এই হীন কারবারি তাগিদকে তুষ্ট করতে গিয়ে শিশুদের বয়স বাড়িয়ে লিখেছিল—এই সাক্ষ্য দিয়েছেন কারখানা-পরিদর্শকেরা নিজেরাই। বেথনীল গ্রীন’ নামক কুখ্যাত জিলাটিতে প্রতি সোমবার ও মঙ্গলবার সকালে একটি খোলা বাজার বসে, যেখানে ৯ বছর বয়স থেকে শুরু করে সব বয়সের ছেলে ও মেয়ে শিশুরা সিল্ফ ম্যানুফ্যাকচার কারীদের কাছে নিজেদেরকে ভাড়া দিয়ে দেয়। সচরাচর শর্ত হয় এই সপ্তাহে ১ শিলিং ৮ পেন্স (যা পাবে বাবা-মা) এবং ২ পেন্স ও চা, যা পাব আমি। এই চুক্তি বলবৎ থাকবে মাত্র এক সপ্তাহ। বাজার যখন চালু থাকে, তখন সেখানকার দৃশ্য ও ভাষা খুবই কলংকজনক।”[৫] ইংল্যাণ্ডে এটাও দেখা যায়, নারী নিয়ে এসেছে “কর্মশালা থেকে শিশুদের এবং তাদের যে কাউকে বাইরে নিয়ে এসেছে সপ্তাহে ২ শিলিং ৬ পেন্সের জন্য”, [৬]আইন প্রণয়ন সত্ত্বেও গ্রেট ব্রিটেনে চিমনি-সাফাইয়ের জীবন্ত মেশিন হিসাবে (যদিও সে কাজ করার জন্য প্রচুর মেশিন রয়েছে, তবু) ২০০০ এরও বেশি ছেলেকে তাদের বাপ-মায়েরা বেচে দেয়।[৭] শ্রমশক্তির ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে আইনগত সম্পর্কে মেশিনারি যে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে, তার ফলে এই লেনদেনের ব্যাপারটা স্বাধীন ব্যক্তিদের মধ্যে একটি চুক্তি হিসাবে যে চেহারা তার ছিল, তা হারিয়ে ফেলে; এটাই আইনগত নীতির উপরে প্রতিষ্ঠিত ইংরেজ পার্লামেন্টের কাছে একটা কৈফিয়ৎ হয়ে দেখা দিল কারখানার ব্যাপারে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পক্ষে। যখনি আইন শিশুদের শ্রম ৬ ঘণ্টায় বেঁধে দেয় (আগে এই হস্তক্ষেপ ছিল না), তখনি ম্যানুফ্যাকচার কারীরা আবার নোতুন করে তাদের নালিশ জানায়। তারা অভিযোগ জানায় যে, এই আইনের আওতায় পড়ে, এমন সব শিল্প থেকে বাপ-মায়েরা দলে দলে তাদের ছেলে মেয়েদের তুলে নিয়ে যায়, যাতে করে যেখানে “শ্রমের স্বাধীনতা” এখনো বজায় আছে, অর্থাৎ যেখানে ১৩ বছরের কমবয়সী শিশুদের বেশি-বয়সী মানুষদের সমান কাজ করতে বাধ্য করা যায় এবং উচ্চতর দামের বিনিময়ে তাদের দায় থেকে রেহাই পাওয়া যায়, সেখানে বিক্রি করে দেবার জন্য। কিন্তু যেহেতু মূলধন নিজেই স্বভাবগত ভাবে এক সমতা-বিধায়ক, যেহেতু শ্রমের শোষণের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে সে শর্তাদির সমতা আদায় করে ছাড়ে, সেই হেতু একটি শিল্প-শাখায় শিশু-শ্রমের উপরে আইন-আরোপিত সীমাবদ্ধতা, অন্যান্য শিল্প-শাখাতেও অনুরূপ সীমাবদ্ধতা-আবরাপের হেতু হিসাবে কাজ
