একমাত্র উৎপন্ন দ্রব্যকে সস্তা করার জন্যই মেশিনারির ব্যবহার এইভাবে সীমাবদ্ধ : ঐ মেশিনারি নিয়োগের ফলে যে-পরিমাণ শ্রম স্থানচ্যুত হয়, এটি তৈরি করতে তার তুলনায় কম পরিমাণ শ্রম ব্যয় করতে হবে। ধনিকের ক্ষেত্রে, অবশ্য, মেশিনের ব্যবহার আরো সীমাবদ্ধ। শ্রমের জন্য মূল্য না নিয়ে, সে কেবল দিয়ে থাকে নিয়োজিত শ্রম শক্তির মূল্য; সুতরাং মেশিন ব্যবহারে তার সীমা নির্দিষ্ট হয় মেশিনটির মূল্য এবং তার দ্বারা স্থানচ্যুত শ্রমশক্তির মূল্য—এই দুয়ের পার্থক্যের দ্বারা। যেহেতু আবশ্যিক ও উদ্বৃত্ত শ্রমে দৈনিক কাজের ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন রকমের, এবং এমনকি একই দেশে ভিন্ন ভিন্ন শিল্প-শাখায় ভিন্ন ভিন্ন রকমের এবং যেহেতু শ্রমিকের সত্যকার মজুরি এক সময়ে তার শ্রমশক্তির নীচে নেমে যায়, অন্য সময়ে তার উপরে উঠে যায়, সেহেতু মেশিনারির নাম এবং মেশিনারি দ্বারা স্থানচ্যুত শ্রমশক্তির দামের মধ্যকার পার্থক্যে বড় রকমের হ্রাস-বৃদ্ধি হতে পারে, যদিও উক্ত মেশিনটি তৈরি করতে প্রয়োজনীয় শ্রমের পরিমাণ এবং তার দ্বারা স্থানচ্যুত মোট পরিমাণের মধ্যকার পার্থক্য স্থিরই থাকে।[১১] কিন্তু ধনিকের কাছে একমাত্র পূর্ববর্তী পার্থক্যটিই একটি পণ্য উৎপাদনের খরচ নির্ধারণ করে দেয় এবং প্রতিযোগিতার চাপের মাধ্যমে, তার কাজকে প্রভাবিত করে। এই কারণেই আজকাল মেশিনের আবিষ্কার হয় ইংল্যাণ্ডে, যার নিয়োগ হয় একমাত্র উত্তর আমেরিকায়; ঠিক যেমন ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে একমাত্র হল্যাণ্ডে ব্যবহৃত হবার জন্যই মেশিনের আবিষ্কার হত জার্মানিতে এবং ঠিক যেমন অষ্টাদশ শতকে অনেকগুলি ফরাসী আবিষ্কারই প্রয়োগ করা হত একমাত্র ইংল্যাণ্ডে। প্রবীণতর দেশগুলিতে বিভিন্ন শিল্প-শাখায় নিযুক্ত হয়ে মেশিনারি বাকি শিল্প শাখাগুলিতে এমন শ্রম-বাহুল্যের সৃষ্টি করে যে, সেগুলিতে মজুরি পড়ে যায় শ্রমশক্তির মূল্যেরও নীচে এবং ব্যাহত করে মেশিনারির প্রবর্তন; ধনিকের মুনাফা আসে নিয়োজিত শ্রমের হ্রাস-প্রাপ্তি থেকে নয়, আসে মজুরি-প্রদত্ত শ্রম থেকে; তার পক্ষে, মেশিনারির প্রচলন হয়ে ওঠে অনাবশ্যক, এমনকি, অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভবও। ইংল্যাণ্ডে কতকগুলি উল-ম্যানুফ্যাকচারে শিশুদের নিয়োগ সাম্প্রতিক কালে বেশ কমে গিয়েছে, এবং কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে। কেন? কারণ কারখানা-আইন দু-প্রন্ত শিশুর নিয়োগ আবশ্যক করে তুলেছে—এক প্ৰস্ত কাজ করবে ছয়-ঘণ্টা, অন্য প্রস্ত চার ঘণ্টা অথবা দুটি প্রান্তের প্রতিটিই পাঁচ ঘণ্টা। কিন্তু ফুলটাইমারদের তুলনায় “হাফ-টাইমার”-দের সস্তায় বেচে দিতে বাপ-মায়েরা অস্বীকার করে। এই কারণেই “হাফ-টাইমার”-দের বদলে মেশিনারির প্রবর্তন।[১২] নারী ও দশ বছরের কম বয়স্ক শিশুদের খনিতে নিয়োগ নিষিদ্ধ হবার আগে ধনিকেরা নগ্ন নারী ও বালিকাদের, অনেক সময়ে পুরুষদের সঙ্গে, কর্ম-নিয়োগকে তাদের নীতিবোধের পক্ষে, এবং, বিশেষ করে, হিসাব খাতার পক্ষে এত অনুকূল মনে করত যে, কেবল উল্লিখিত আইনটি পাশ হবার পরেই তারা মেশিনারির শরণ নিতে বাধ্য হয়। ইয়াঙ্কির একটি পাথর-ভাঙা মেশিন উদ্ভাবন করেছে। ইংরেজরা সেটা ব্যবহার করে না, কেননা যে “বেচারা”[১৩] এই কাজটা করে, সে তার শ্রমের এত সামান্য অংশের জন্য পয়সা পায় যে তার বদলে মেশিনারি লাগালে ধনিকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। [১৪] ইংল্যাণ্ডে এখনো মাঝে মাঝেই ঘোড়ার বদলে মেয়েদের ব্যবহার করা হয়, খাল দিয়ে নৌকা টেনে নেবার জন্য[১৫], কেননা ঘোড়া বা মেশিন উৎপাদন করতে যে শ্রমের দরকার হয়, তা একটি সুপরিজ্ঞাত রাশি, কিন্তু উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার মেয়েদের খোরপোষের জন্য যা দরকার হয় তা গণনার মধ্যেও আসে না। এই কারণেই, সবচেয়ে জঘন্য উদ্দেশ্যে মানুষের শ্রমশক্তিকে অপচয় করার এমন ন্যক্কারজনক পরিস্থিতি আমরা আর কোথাও দেখিনা, যেমন দেখি ইংল্যাণ্ড-মেশিনারির দেশ এই ইংল্যাণ্ডে।
————
১. সাধারণ ভাবে বলা যায়, বিজ্ঞানের জন্য ধনিককে কিছু খরচ করতে হয় না, কিন্তু তাই বলে বিজ্ঞানকে শোষণ করতে তার আদৌ বাধে না। অন্যের শ্রমের মত অন্যের বিজ্ঞানও সে দখল করে নেয়। বিজ্ঞানেরই হোক বা বৈষয়িক সম্পদেরই হোক-ধনতান্ত্রিক আত্মীকরণ এবং ব্যক্তি হিসাবে আত্মীকরণ কিন্তু দুটি সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। মিঃ উরে নিজেই তার প্রিয় মেশিনারি-নিয়োগকারী ম্যানুফ্যাকচারদের মধ্যে যান্ত্রিক বিজ্ঞান সম্পর্কে নিরেট অজ্ঞতার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আর ইংরেজ কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারারদের মধ্যে কেমিস্ট্রি সম্পর্কে আশ্চর্যজনক অজ্ঞতা সম্পর্কে লাইবিগ তো একটা কাহিনীই বলতে পারেন।
২. মেশিনারির এই ফলটির উপরে রিকার্ডো এখানে এত গুরুত্ব আরোপ করেন যে, মেশিনের দ্বারা উৎপন্ন দ্রব্যে যে-মূল্য অপিত হয়, সেটার প্রতি নজর দিতে তিনি প্রায়ই ভুলে যান এবং এই ভাবে মেশিনকে প্রাকৃতিক শক্তিগুলির মত একই স্থান দান করেন। প্রাকৃতিক শক্তিসমূহ এবং মেশিনারি আমাদের জন্য যে কাজ দেয়, অ্যাডাম স্মিথ কখনো তার মূল্য ছোট করে দেখাননি, কিন্তু তারা পণ্য-সামগ্রীতে যে মূল্য। সংযোজন করে, তার প্রকৃতি তিনি খুব সঙ্গত ভাবেই বিশেষিত করেন”যেহেতু তারা তাদের কাজ করে মুফতে, সেই হেতু তাদের প্রদত্ত সাহায্য বিনিময়ে মুল্যের সঙ্গে কিছুই যুক্ত করে না। রিকার্ডো, “প্রিন্সিপলস অব পলিটিক্যাল ইকনমি অ্যাণ্ড ট্যাক্সেশন” পৃঃ ৩৩৬, ৩৩৭। রিকার্ভোর এই মন্তব্য অবশ্যই সেই পর্যন্ত সঠিক, যে পর্যন্ত তা জে বি সে’র বিরুদ্ধে পরিচালিত, যিনি ভাবেন যে, মেশিন সেই মূল্য সৃজনের কাজ দেয়, “মুনাফার অংশবিশেষ।
