প্রসবের সঙ্গে তুলনামূলক ভাবে তার মূল্যের হ্রাস ঘটায়।
হস্তশিল্প বা ম্যানুফ্যাকচারের দ্বারা উৎপাদিত পণ্যসমূহের দাম এবং মেশিনারি দ্বারা উৎপাদিত সেই একই পণ্যসমূহের দাম যদি বিশ্লেষণ ও তুলনা করা যায়, তা হলে সাধারণত দেখা যায় যে, মেশিনারি-দ্বারা উৎপাদিত পণ্যদ্রব্যে শ্রমের উপকরণ জনিত মূল্য আপেক্ষিত ভাবে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু অপেক্ষিক ভাবে হ্রাস পায়। অন্য ভাবে বলা যায় যে, তার অনাপেক্ষিক পরিমাণ হ্রাস পায়, কিন্তু উৎপন্ন দ্রব্যসামগ্রীর, যথা এক পাউণ্ড সুতোর, মোট মূল্যের সঙ্গে আপেক্ষিক ভাবে তার সামগ্রীর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।[৫]
এটা স্পষ্ট যে, একটি মেশিন তৈরি করতে যে-পরিমাণ শ্রম ব্যয় হয়, ঐ মেশিনটি নিয়োগ করলে যদি সেই পরিমাণ এমই বাঁচে, তা হলে কেবল শ্রমের অবস্থান বিনিময়ই ঘটে; কাজে কাজেই, একটি পণ্য উৎপাদনে যে-মোট শ্রম দরকার হয়, তার হ্রাস ঘটেনা অথবা শ্রমের উৎপাদনশীলতারও বৃদ্ধি ঘটে না। যাই হোক, এটা পরিষ্কার যে, একটি মেশিন যে-পরিমাণ শ্রম লাগায় এবং যে-পরিমাণ শ্রম বাঁচায় —এই দুয়ের মধ্যেকার পার্থক্য, অর্থাৎ তার নিজের উৎপাদনশীলতা তার নিজের মূল্য এবং যে-উপকণের স্থান সে গ্রহণ করে তার মূল্য—এই দুয়ের পার্থক্যের উপরে নির্ভর করেনা। যে পর্যন্ত একটি মেশিনের উপরে ব্যয়িত শ্রম অর্থাৎ উৎপন্ন দ্রব্যের সঙ্গে সংঘোজিত মূল্যাংশ শ্রমিক তার টুলের সাহায্যে উৎপন্ন দ্রাব্য যে-মূল্য সংযোজিত করে, তার তুলনায় অল্পতর থাকে, সে পর্যন্ত সব সময়েই মেশিনারির অনুকূলে কিছু পরিমাণ বেঁচে-যাওয়া শ্রমের পার্থক্য থেকে যায়। সুতরাং কত পরিমাণ মানবিক শ্রমশক্তির স্থান একটি মেশিন গ্রহণ করে তার দ্বারাই মাপা হয় একটি মেশিনের উৎপাদনশীলতা। মিঃ বেনেস-এর হিসাব অনুসারে, প্রস্তুতিমূলক মেশিনারি সমেত[৬] একটি অশ্বশক্তিচালিত ৪৫টি মিউল-ম্পিগুলের জন্য লাগে ২৪ জন শ্রমিক; ফশ ঘণ্টা কাজ করে প্রত্যেকটি স্বয়ংক্রিয় মিউল-স্পিণ্ডল ১৩ আউন্স সুতো (খুলত্বে গড় সংখ্যা ফলত, ২৫ জন শ্রমিক সপ্তাহে উৎপাদন করে ৩৬৫৪ পাউণ্ড সুলতা। সুতরাং ঝরতি-পড়তি বাদ দিয়ে ৩৬৬ পাউণ্ড তুলো সুতোয় রূপান্তরিত হবার সময়ে কেবল ১৫০ ঘণ্টার শ্রম বা বোজ দশ ঘণ্টা হিসাবে ১৫ দিনের শ্রম আত্মসাৎ করে। কিন্তু এক ‘স্পিনিং হুইল দিয়ে একজন হাতে সুতোকটুনি ষাট ঘণ্টায় ১৩ আউন্স সুতো কাটলে, ঐ একই পরিমাণ তুলো আত্মসাৎ করবে ১০ ঘণ্টা বোজ হিসাবে ২,৮০০ দিনের শ্রম বা ২৭,০০০ ঘণ্টার শ্রম। [৭] যেখানে হাত দিয়ে ক্যালিকো ছাপানোর পুরনো পদ্ধতির, ব্লক-প্রিন্টিং পদ্ধতির স্থান নিয়েছে মেশিন-প্রিন্টিং, সেখানে একজন লোকের বা বালকের সাহায্যে একটি মাত্র মেশিন ছাপায় এক ঘণ্টার চার রঙের ততটা পরিমাণ ক্যালিকো, যতটা ছাপাতে আগে লাগত ২০০ জন মানুষ।[৮] ১৭৯৩ সালে এলি হুইটনি কটন জিন’ উদ্ভাবন করার পূর্বে এক পাউণ্ড তুলো থেকে তুলাবীজ আলাদা করতে লাগত একটি গল্প দিনের শ্রম। তার উদ্ভাবনের সাহায্যে একটি নিগ্রো-মজুরানি পরিষ্কার করতে পারত প্রতিদিন ১০০ পাউণ্ড করে; এবং তার পর থেকে ‘জিন’-এর আরো ঢের উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। এক পাউণ্ড তুলো-পশম আগে উৎপাদন করতে খরচ হত ৫ সেন্ট; ঐ মেশিন উদ্ভাবনের পরে তা অন্তর্ভূক্ত করে অধিকতর পরিমাণ মজুরি-বঞ্চিত শ্রম এবং স্বভাবতই বিক্রি হয় অধিকতর মুনাফায়, ১ সেন্টে। ভারতে লোকেরা পশম বীজ আলাদা করার জন্য একটি যন্ত্র ব্যবহার করে, নাম ‘চরকা’, যা অর্ধেক মেশিন;অর্ধেক টুল; এই চরকার সাহায্যে একজন পুরুষ ও একজন নারী দৈনিক ছাড়াতে পারে ২৮ পাউণ্ড পশম। কয়েক বছর আগে ডঃ ফরবেস কর্তৃক আবিষ্কৃত চরকার সাহায্যে একজন মানুষ ও একটি বালক এখন প্রত্যহ উৎপাদন করতে পারে ২৫০ পাউণ্ড করে। যদি সেটি চালাবার জন্য ষাড়, বাষ্প বা জল ব্যবহার করা হয়, তা হলে কেবল কয়েকটি বালক-বালিকার দরকার হয় যোগানদার হিসাবে। আগে ৭৫০ জন মানুষ দিনে গড়ে যে-পরিমাণ কাজ করত, এখন এই ধরনের ষণ্ডালিত ১৬টি মেশিন সেই কাজ করে।[৯]
যে কথা আগেই বলা হয়েছে, ১৫ শিলিং খরচে ৬৬ জন লোক যে কাজ করত, এখন তিন পেনি খরচে একটি বাষ্পচালিত লাঙল সেই একই কাজ করে। একটি ভ্রান্ত ধাধণা পরিষ্কার করার জন্য আমি আর এই দৃষ্টান্তটিতে ফিরে আসছি। ৩৬ জন লোক একঘণ্টায় যে মোট শ্রম ব্যয় করে, এই ১৫ শিলিং কোনমতেই সেই সমগ্র শ্রমের অর্থগত (টাকার অঙ্কে ) অভিব্যক্তি নয়। যদি আবশ্যিক শ্রমের সঙ্গে উদ্বৃত্ত শ্রমের অনুপাত হয় ১০০%, তবে এই ৬৬ জন লোক এক ঘণ্টায় উৎপাদন করবে ৩০ শিলিং পরিমাণ মূল্য, যদিও তাদের মজুরি হিসাবে প্রাপ্ত ১৫ শিলিং প্রতিনিধিত্ব করে মাত্র তাদের অর্থ ঘণ্টার শ্রমের। তা হলে ধরুন, একটি মেশিন ১৫০ জন লোকের স্থান গ্রহণ করে এবং তার মূল্য পড়ে এই ১৫ জন লোকের এক বছরে যা মজুরি তার সমান, ধরা যাক ৩০০ পাউণ্ড; মেশিনটি প্রবর্তনের পূর্বে ১৫০ জন লোক, সংশ্লিষ্ট সামগ্রীতে যে-পরিমাণ শ্রম সংযোজিত করত, এই ৩০০০ পাউণ্ড কিন্তু কোন মতেই তার সমগ্রটার অর্থগত অভিব্যক্তি নয়, কেবল সেই অংশের অর্থগত অভিব্যক্তি, যে অংশটি তারা ব্যয় করে নিজেদের জন্য এবং প্রকাশ পায় তাদের মজুরি হিসাবে। অপর পক্ষে, ঐ ৩০০০ পাউণ্ড, যা হল ঐ মেশিনটির অর্থমূল্য তা কিন্তু প্রতিনিধিত্ব করে তার উৎপাদনে ব্যয়িত শ্রমের সমগ্র“এই শ্রম কোন্ অনুপাতে শ্রমিকের জন্য মজুরি এবং ধনিকের জন্য উদ্ধত মূল্যের সংস্থান করে, তাতে কিছু এসে যায় না। অতএব যদিও যতটা শ্রমশক্তিকে একটি মেশিন স্থানচ্যুত করে তার বাবদে ব্যয় এবং মেশিনটির বাবদে ব্যয় সমান, তা হলেও যে-পরিমাণ জীবন্ত শ্রমের স্থান সে গ্রহণ করে তার তুলনায় তার মধ্যে বাস্তবায়িত শ্রম অনেক অনেক কম। [১০]
