শ্রমের নানাবিধ উপকরণ যখন মেশিনারির আকার প্রাপ্ত হয়, তখন আবশ্যক হয় মনুষ্য-শক্তির পরিবর্তে প্রাকৃতিক শক্তির প্রবর্তন হয় হাতুড়ে কায়দার বদলে বিজ্ঞানের সচের প্রয়োগ। ম্যানুফ্যাকচারে সামাজিক শ্রম-প্রক্রিয়ার সংগঠন নেহাই বিষয়ীগত; সেটা হচ্ছে প্ৰত্যংশ শ্রমিকদের সংযোজন; অন্য দিকে, মেশিনারিব্যবস্থায় আধুনিক শিল্প এমন একটি উৎপাদনী সংগঠনের অধিকারী, যা যথার্থ ভাবেই বিষয়গত—যেন সংগঠনটিতে শ্রমিক উৎপাদনের এক পূর্বাগত বাস্তব অবস্থার উপাঙ্গ মাত্র। সরল সহযোগে, এবং, এমনকি, শ্রম-বিভাজনের উপরে প্রতিষ্ঠিত সহযোগেও, বিচ্ছিন্ন কারিগরের উপরে যৌথ কারিগরের দমনকার্য আত্মপ্রকাশ করে কমবেশি দৈবাৎ। কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া, সেগুলির উল্লেখ পরে করা হবে, শ্রম-প্রক্রিয়ার সহযোগমূলক চরিত্র হচ্ছে একটি কারিগরি প্রয়োজন-স্বয়ং শ্রম-উপকরণের তাগিদেই যার প্রচলন।
————
১. মিল-এর বলা উচিত ছিল, “অন্যের শ্রমের দ্বারা পরিপোষিত নয়, এমন কোন মানুষের দৈনিক শ্রমের লাঘব ঘটিয়েছে কিনা” কেননা মেশিনারি যে বিত্তমান অলস ব্যক্তিদের সংখ্যা অনেক বাড়িয়েছে, তাতে সংশয় নেই।
২. দৃষ্টান্ত হিসাবে হাটুনের কোর্স অব ম্যাথমেটিকস” দ্রষ্টব্য।
৩. এই দিক থেকে একটি ‘টুল’ আর একটি মেশিন’-এর মধ্যে আমরা একটা স্পষ্ট পার্থক্য করতে পারি। কোদাল, হাতুড়ি ইত্যাদি যা কিছুর চালক-শক্তি মানুষ, তা হল ‘টুল; কিন্তু একটা লাঙল যার চালক-শক্তি পশু, বা উইণ্ড-মিল ইত্যাদি হল ‘মেশিন’ (উইলহেলম শুলৎস, Die Bewegung der produktion”, ১৮৪৩,
৪. তার সময়ের আগেই সুতো কাটার যন্ত্র বেরিয়ে গিয়েছে, যদিও খুবই স্কুল ধরনের। প্রথম আবির্ভাবের স্থান সম্ভবত ইতালি। কৃৎবিজ্ঞানের ইতিহাস খুঁটিয়ে পড়লে জানা যায় আঠারো শতকের উদ্ভাবনগুলির প্রায় কোনটাই একক ব্যক্তির উদ্ভাবন নয়। এখন পর্যন্ত তেমন কানন বই নেই। ডারউইন আমাদের আগ্রহ সৃষ্টি করেছেন প্রকৃতির কৃৎবিজ্ঞানে অর্থাৎ উদ্ভিদ ও জীবের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠনে, যেগুলি জীবনকে পোষণ করার উৎপাদন-উপকরণ হিসাবে কাজ করে। মানুষের উৎপাদনশীল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি—যেগুলি হচ্ছে সমস্ত সামাজিক সংগঠনের বস্তুগত ভিত্তি—সেগুলি কি একই মনোযোগ দাবি করেনা? এবং এমন একটি ইতিহাস সংকলন করা কি সহজ হবে না, কেননা, যেকথা ভিলে বলেছেন, মানবিক ইতিহাসের সঙ্গে প্রাকৃতিক ইতিহাসের পার্থক্য এইখানে যে, আমরা প্রথমটি তৈরি করেছি কিন্তু দ্বিতীয়টি নয়? কৃৎবিজ্ঞান প্রকাশ করে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ক্রিয়া কলাপ-উৎপাদনের প্রক্রিয়া যার দ্বারা সে জীবনকে পোষণ করে, এবং তারা উদ্ঘাটিত করে তার সামাজিক সম্পর্কসমূহের গঠন-প্রণালী এবং, সেই সঙ্গে, তা থেকে গড়ে ওঠা মানসিক ধ্যান-ধারণাসমূহ। ধর্মের প্রত্যেকটি ইতিহাসই, যা এই বস্তুগত ভিত্তিটিকে হিসাবের মধ্যে ধরে না, তা ভাসাভাসা। বস্তুতঃ পক্ষে, জীবনের বাস্তব সম্পর্কসমূহের ভিত্তি থেকে ঐ সমস্ত সম্পর্কের আনুষঙ্গিক ধর্মগত রূপ গড়ে তোলর তুলনায় বিশ্লেষণের মাধ্যমে ধর্মের সেই কুয়াশাবৃত সৃষ্টিগুলির পার্থিব মর্মবস্তু আবিষ্কার করা অনেক সহজতর। এই পদ্ধতিটিই হল একমাত্র বস্তুবাদী, অতএব, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। প্রকৃতি বিজ্ঞানের অমৃত বস্তুবাদের—যা ইতিহাস এবং তার প্রক্রিয়াকে বাদ দেয়, সেই বস্তুবাদের দুর্বলতাগুলি তার মুখপাত্রদের অমূর্ত ও ভাবাদর্শগত ধ্যান-ধারণা থেকে তখনি প্রকট হয়ে ওঠে, যখনি তারা তাদের বিশেষ পরিধির বাইরে পা বাড়ান।
৫. বিশেষ করে শক্তিচালিত তাঁতের (পাওয়ার লুম’-এর) মূল রূপটির মধ্যে আমরা প্রথম দৃষ্টিতেই চিনতে পারি প্রাচীন আঁতটিকে। শক্তিচালিত তাঁতের আধুনিক আকারে অনেক অদল-বদল ঘটেছে।
৬. কেবল গত ১৫ বছর ধরে ( অর্থাৎ প্রায় ১৮৫০ সাল থেকে), এই মেশিন-টুল গুলির একটি নিরন্তর বর্তমান অংশ ইংল্যাণ্ডে তৈরি হচ্ছে মেশিনারির সাহায্যে এবং তৈরি হচ্ছে সেই ম্যানুফ্যাকচারকারীদের দ্বারা, যারা মেশিন তৈরি করে না। এই সব মেকানিক্যাল টুল তৈরি করার মেশিনের দৃষ্টান্ত স্বয়ংক্রিয় ববিন-মেকিং ইঞ্জিন, ‘কার্ড-সেটিং ইঞ্জিন’, ‘শাটল-মেকিং ইঞ্জিন’ ইত্যাদি।
৭. মোজস বলেন, “যে-বলদ তোমার শস্য মাড়িয়ে দেয়, তুমি তার মুখ বেঁধে দিও না। অন্য দিকে, জার্মানির খ্রীস্টান লোক-হিতৈষীগণ ভূমিদাসের গলা বেড় দিয়ে একটা কাঠের ফলক বেঁধে দিত, যাদের তারা ব্যবহার করত ময়দা-পেষার সঞ্চলক শক্তি হিসাবে; এটা তারা করত যাতে ওরা ওদের হাত দিয়ে মুখের মধ্যে পুরে না দিতে পারে।
৮. একটি মাত্র মোটরের দ্বারা পরিচালিত এই সমস্ত সরল উপকরণের একটি সমষ্টিকে বলা হয় একটি মেশিন। (ব্যাবেজ, ঐ।
৯. ১৮৬১ সালের জানুয়ারি মাসে জন সি মর্টন ‘সোসাইটি অব আর্টস’-এ একটি নিবন্ধ পাঠ করেন, বিষয় ছিল কৃষিকর্মে নিয়োজিত শক্তিসমূহ। সেখানে তিনি বলেন, জমির সমরূপতা বৃদ্ধি করে, এখন প্রত্যেকটি উন্নয়ন বিশুদ্ধ যান্ত্রিক শক্তি উৎপাদনে স্টিম ইঞ্জিনের প্রয়োগ আরো আরো বৃদ্ধি করে। অশ্বশক্তির প্রয়োজন হয় সেখানে, যেখানে এলোমেলো বেড়া ও অন্যান্য বাধা সমরূপতার কর্মকাণ্ডের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। এই সমস্ত বাধা দিনে দিনে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। যথার্থ শক্তির তুলনায় যেখানে ইচ্ছা শক্তির প্রয়োজনই প্রধান সেখানে চাই এমন শক্তি, যাকে প্রতি মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের মন—অর্থাৎ চাই মনুষ্য-শক্তি। তার পরে, মর্টন বাম্প-শক্তি, অশ্ব-শক্তি ও মনুষ্য-শক্তিকে পর্যবসিত করেন ঠিম-ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে সাধারণ ভাবে প্রচলিত ‘ইউনিট’-এ এবং এই ভাবে হিসাব করে দেখান যে স্কিম-ইঞ্জিন থেকে প্রাপ্ত এক ইউনিট অশ্ব-শক্তি। অশ্ব থেকে প্রাপ্ত এক ইউনিট অশ্বশক্তির তুলনায় সা। তা ছাড়া, যদি একটা ঘোড়ার স্বাস্থ্য অক্ষুন্ন রাখতে হয়, তা হলে তাকে দিয়ে দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যায় না। জমি-চাষের কাজ থেকে প্রতি ৭টি ঘোড়াব মধ্যে অন্তত ৩টিকে বিদায় দিয়ে; সেখানে বাম্প-শক্তি প্রয়োগ করলে ঐ ঘোড়ার জন্য ৩-৪ মাসে যা খরচ হয়, তার সমানই খরচ হবে, আর ৩-৪ মাসের বেশি একটা ঘোড়াকে ফলপ্রসূ ভাবে কাজ করানোও যায় না। সর্বশেষে, যে-সব কৃষিগত কাজকর্মে বাষ্প-শক্তিকে ব্যবহার করা যায়, সেখানে অশ্বশক্তির তুলনায় কাজের গুনমান উন্নততর হয়। একটা সিম-ইঞ্জিনের কাজ করতে লাগবে ঘণ্টা-পিছু ১৬ শিলিং মোট ব্যয়ে ৬৬ জন মানুষ, আর একটা ঘোড়র কাজ করতে লাগবে ঘণ্টা-পিছু ৮ শিলিং মোট ব্যয়ে ৩২ জন মানুষ।
