উৎপাদনের এক ক্ষেত্রে কোন আমূল পরিবর্তন ঘটলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও আমূল পরিবর্তন আবশ্যক হয়। এটা ঘটে প্রথমতঃ শিল্পের সেই সমস্ত শাখায়, যেগুলি একই প্রক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন পর্যায় হিসাবে সংলগ্ন হয়েও সামাজিক শ্রম-বিভাজন দ্বারা এমন ভাবে বিচ্ছিন্ন যে, তাদের প্রত্যেকটিই তৈরি করে এক-একটি আলাদা আলাদা পণ্য। যেমন, মেশিনারি দিয়ে সুতো কাটা মেশিনারি দিয়ে কাপড় বোনার প্রয়োজন ঘটাল এবং উভয়ে মিলিত ভাবে আবশ্যিক করে তুলল একটি যান্ত্রিক ও রাসায়নিক বিপ্লব ঘটল ‘ব্লিচিং’, ‘প্রিন্টিং’ ও ‘ডাইং’-এ। অন্য দিকে, অনুরূপ ভাবে সুতো কাটায় বিপ্লব ঘটার জন্য তুলাবীজ থেকে তুলা-তন্তুকে আলাদা করার জন্য ঘটল ‘জিন’-এর উদ্ভাবন; কেবল এই উদ্ভাবনটির কল্যাণেই সম্ভব হয়েছে বিপুল আয়তনে তুলার উৎপাদন করে। বর্তমানের প্রয়োজন মিটানো।[১৬] কিন্তু আরো বিশেষ ভাবে, শিল্প ও কৃষির উৎপাদন পদ্ধতিতে বিপ্লব অনিবার্য করে তুলল সাধারণ ভাবে উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ যোগাযোগ ও পরিবহণ-ব্যবস্থায় বিপ্লব। এমন একটি সমাজ, ফুরিয়ার-এর ভাষায়, যার চক্ৰনাভি ছিল ক্ষুদ্রায়তন কৃষিকর্ম এবং তৎসহ তার আনুসঙ্গিক ঘরোয়া শিল্প ও শহুরে হস্তশিল্প-এমন একটি সমাজে যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা ছিল ম্যানুফ্যকচার-আমলের উৎপাদন-প্রয়োজনসমূহের তুলনায় এত অনুপযোগী-যে-ম্যানু ফ্যাকচার-আমলের অনুষঙ্গ ছিল সম্প্রসারিত শ্রম-বিভাজন, উৎপাদন-উপকরণ ও শ্রমিকদের কেন্দ্রীভবন এবং ঔপনিবেশিক বাজার—সেই ম্যানুফ্যাকচার-আমলের উৎপাদন-প্রয়োজনসমূহের তুলনায় এত অনুপযোগ যে, কার্যত সেগুলিরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেল। একই ভাবে ম্যানুফ্যাকচার-আমল থেকে উত্তরাগত যোগাযোগ ও পরিবহণের উপায়গুলি আধুনিক শিল্পের পক্ষে হয়ে উঠল অসহ প্রতিবন্ধক রূপ আধুনিক শিল্প যার উৎপাদনের গতি প্রচণ্ড ক্ষিপ্র, যার বিস্তৃতি বিপুল, উৎপাদনের এক ক্ষেত্র থেকে অন্য ক্ষেত্রে যার মূলধন ও শ্রমের নিক্ষেপণ নিরন্তর এবং বিশ্ববারের সঙ্গে যার ঘটছে নোতুন সংযোগ। সুতরাং পাল-তোল। জাহাজের নির্মাণকার্যে আমূল পরিবর্তন ছাড়াও স্টিমার, রেলওয়ে, সাগরগামী ষ্টিমার প্রভৃতির ব্যবস্থার দ্বারা যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা ক্রমশই যান্ত্রিক শিল্পের নানাবিধ উৎপাদন-পদ্ধতির সঙ্গে উপযোজিত হল। কিন্তু বিশাল বিশাল লৌহপিণ্ড, যা এখন ঢালাই-পেটাই করতে হবে, কাটাই ছেদাই করতে হবে, ভিন্ন ভিন্ন আকারে রূপ দিতে হবে, তার জন্য আবার প্রয়োজন দেখা দিল সাইক্লোপিয়ান মেশিনের, যেগুলি তৈরি করার পক্ষে ম্যানুফ্যাকচার-আমলের পদ্ধতিগুলি ছিল একেবারেই অনুপযোগী।
অতএব, আধুনিক শিল্পকে হাতে তুলে নিতে হল মেশিনকে তথা তার উৎপাদন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যসূচক উপকরণটিকে এবং নির্মাণ করতে হল মেশিনের সাহায্যেই আরো সব মেশিনকে। যত দিন পর্যন্ত সে এই কাজ করে উঠতে পারেনি, তত দিন পর্যন্ত তার পক্ষে নিজের জন্য উপযুক্ত একটি কারিগরি বনিয়াদ তৈরি করা ও তার উপরে দাড়ানোও সম্ভব হয়নি। নিজের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে মেশিনারিও এই শতকের প্রথম কয়েক দশকে ধাপে ধাপে আসল মেশিন নির্মাণের কাজটিকে আত্মস্থ করে ফেলল। কিন্তু কেবল ১৮৬৬ দশকের আগের দশকেই মাত্র বিপুল আয়তনে রেলওয়ে ও সাগরগামী জাহাজ নির্মাণের তাগিদেই বিবিধ সাইক্লোপিয়ান মেশিনের আবির্ভাব ঘটল, যা এখন নিয়োজিত হচ্ছে প্রাইভ-মুভার নির্মাণের কাজে।
মেশিন দিয়ে মেশিন তৈরির জন্য সবচেয়ে আবশ্যিক শর্ত হচ্ছে একটি প্রাইভ-মুভার, যা যেকোন পরিমাণ বল প্রয়োগ করতে পারবে অথচ থাকবে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। এই শতটি স্টিম ইঞ্জিন ইতিপূর্বেই পূরণ করে দিয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে চাই জ্যামিতিক ভাবে যথাযথ ‘সরল রেখা’, ‘তল’, ‘বৃত্ত’, ‘স্তম্ভক’ (সিলিণ্ডার’ ), শঙ্কু (কোন’) ও ‘গোলক’ (ম্পিহার’ )—যেগুলির প্রয়োজন হয় মেশিনের বিস্তারিত অংশগুলিতে। স্নাইড রেস্ট’ উদ্ভাবন করে এই শতকের প্রথম দশকে হেনরি মডন্সি এই সমস্যার সমাধান করে দেন; অচিরেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয় করে দেওয়া হয় এবং কিছুটা পরিবর্তিত আকারে তা ‘লেদ ছাড়াও অন্যান্য নির্মাণমূলক মেশিনে প্রযুক্ত হয়, যদিও তা মূলত তৈরি হয়েছিল লেদ-এর জন্যই। এই যান্ত্রিক ‘অ্যাপ্লায়ান্স’-টি কেবল কোন একটি ‘টুল’-এরই স্থান দখল করেনা, স্বয়ং হাতের স্থানই দখল করে নেয়—যা লোহা বা অন্য কোন জিনিস-বরাবর কাটিং টুলটিকে প্রয়োগ ও পরিচালনা করে একটি বিশেষ আকার উৎপাদন করে। এই ভাবে সম্ভব হল কোন মেশিনারির ভিন্ন ভিন্ন অংশগুলির বিভিন্ন আকার “এতটা সহজ ও সঠিক ভাবে এবং এতটা দ্রুত গতিতে উৎপাদন করা, যা সবচেয়ে দক্ষ কারিগরের দীর্ঘ অভিজ্ঞ হাতও করতে পারে না”।[১৮]
এখন যদি আমরা মেশিনারির সেই অংশটির উপরে মনঃসংযোগ করি, যেটি তার ‘অপারেটিং টুল’, তা হলে আমরা দেখতে পাই যে হস্তচালিত হাতিয়ারগুলিই আবার আবির্ভূত হচ্ছে, কিন্তু তা হচ্ছে সাইক্লোপিয়ান আয়তনে। একটি বোরিং মেশিনের অপারেটিং অংশটি হচ্ছে একটি বৃহদাকার ড্রিল, যা চালিত হয় একটি ঠিম ইঞ্জিনের দ্বারা; অন্য দিকে আবার, এই মেশিনটি ছাড়া বড় বড় স্টিম ইঞ্জিন ও হাইড্রলিক প্রেস-এর সিলিণ্ডারগুলি তৈরি করা সম্ভব হত না। মেকানিক্যাল লেদ হচ্ছে মামুলি ফুট লেদেরই সাইক্লোপিয়ান সংস্করণ; যা সেই একই সব টুল দিয়ে লোহার উপরে কাজ করে, যেগুলি দিয়ে মানুষ-সূত্রধর কাজ করে কাঠের উপরে; লণ্ডনের জাহাজঘাটাগুলিতে যে হাতিয়ারটি তক্তা কাটে, তা হচ্ছে একটি বিরাট ক্ষুর; যে কাটাই ( ‘শিয়ারিং) মেশিন দর্জির কঁচি যেমন অনায়াসে কাপড় কাটে তেমনি অনায়াসে লোহা কাটে, সেটি একজোড়া অতিকায় কঁচিমাত্র; এবং একটি বাষ্প-হাতুড়ি (স্টিম হামার’ . কাজ করে একটি মামুলি হাতুড়ির মাথা দিয়ে কিন্তু তার ওজন এত বেশি যে স্বয়ং থর-ও সেটা নাড়াতে পারত না।[১৯] এই স্টিম হামারগুলি ন্যাস্মিথ-এর আবিষ্কার এবং সেগুলির মধ্যে এমন একটি হ্যামার আছে, যার ওজন ছয় টনেরও বেশি, যা আঘাত করে সাত ফিট উচু থেকে খাড়া-খাড়ি ভাবে নেমে এসে—এবং আঘাত করে এমন একটি নেহাইয়ের উপরে যার ওজন ৩৬ টন। গ্র্যানিট পাথরকে ভেঙে গুড়ো-গুড়ো করা এর পক্ষে নিছক ছেলেখেলা, তবু আস্তে আস্তে আঘাত করে একটি পেরেককে একটুকরো নরম কাঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে এ কম সক্ষম নয়।
