একটি মেশিনারী-প্রণালী, তা সে একই রকমের কয়েকটি মেশিনের নিছক সহযোগের উপরেই ভিত্তিশীল হোক, যেমন বয়নকার্যে, অথবা নানান রকমের মেশিনের একটি সংযোজনের উপরেই ভিত্তিশীল হোক, যেমন, সুতো কাটার কাজে, নিজের মধ্যেই গড়ে তোলে একটি বিশাল অটোমেশন, যখন তা চালিত হয় একটি স্বয়ংক্রিয় প্রাইমমুভারের দ্বারা। কিন্তু যদিও ফ্যাক্টরিটি সমগ্র ভাবে চালিত হয় স্টিম ইঞ্জিনের দ্বারা, তবু, হয়, কয়েকটি একক মেশিনের কয়েকটি গতিক্রিয়ার জন্য তাদের লাগতে পারে শ্রমিকের সাহায্য। (স্বয়ংক্রিয়) মিউলের আবিক্রিয়ার আগে মিউল ক্যারেজ চালানোর জন্য এইরকম সাহায্যের দরকার হত, এবং এখনো সূক্ষ্ম সুতো কাটার মিলে তার দরকার হয়, আর, নয়তো, একটি মেশিন যাতে তার কাজ করতে সক্ষম হয়, তার জন্য এই মেশিনের কয়েকটি অংশের প্রয়োজন হতে পারে শ্রমিকের হাতের তৎপরতার, যেমন, একটি হস্তচালিত “টুল’, ‘সাইড-রেস্ট’-এর ‘সেলফ-অ্যাক্টর’-এ রূপান্তরিত হবার পূর্ব পর্যন্ত মেশিন-মেকারদের কর্মশালাগুলিতে এই অবস্থাই ছিল। যে মুহূর্তে মানুষের সাহায্য ছাড়াই কেবল তার তত্ত্বাবধানেই একটি মেশিন একটি কাঁচামালের রূপায়ণের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত পর্যায়গুলি সম্পাদন করতে পারে, সেই মুহূর্তেই আমরা পাই একটি স্বয়ংক্রিয় মেশিনারি-প্রণালী—এবং এমন একটি প্রণালী যার বিভিন্ন প্ৰত্যংশ নিরন্তর উন্নয়নের সম্ভাবনাযুক্ত। একটি ‘সিলভার ভেঙে যাবার সঙ্গে সঙ্গে টানা-কাঠামোটিকে বন্ধ করে দেয়, এমন ‘অ্যাপারেটাস এবং মাকুর ‘ববিন’টি পড়ে’ (ওয়েফট) থেকে বেরিয়ে আসবার সঙ্গে সঙ্গে পাওয়ারলুমটিকে বন্ধ করে দেয়, এমন স্বয়ংক্রিয় ‘স্টপ’—এগুলি বেশ আধুনিক আবিষ্কার—উৎপাদনের নিরবচ্ছিন্নতা এবং স্বয়ংক্রিয় নীতির ক্রিয়াশীলতা—এই উভয়েরই একটি দৃষ্টান্ত হিসাবে আমরা একটি আধুনিক কাগজ-কলকে নিতে পারি। সাধারণ ভাবে কাগজ-শিল্পে আমরা যে কেবল বিভিন্ন উৎপাদন-উপায়ের উপরে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন উৎপাদন-পদ্ধতির মধ্যেকার পার্থক্যগুলি সবিস্তারে সুবিধাজনক ভাবে অনুধাবন করতে পারি, তাই নয়, সেই সঙ্গে ঐ পদ্ধতি গুলির সঙ্গে সামাজিক সংযোগটি অনুরূপ ভাবে অনুধাবন করতে পারি, কেননা পুরনো জার্মান কাগজ-তৈরির পদ্ধতিটি আমাদের যোগায় হস্তশিল্পের একটি নমুনা; ১৭ শতকের ওলন্দাজ ও ১৮ শতকের ফরাসী কাগজ-তৈরির পদ্ধতি আমাদের যোগায় ঐ জিনিসটির স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনের নমুনা। তা ছাড়া, ভারতে ও চীনে এখনো চালু আছে ঐ শিল্পটির দুটি স্বতন্ত্র প্রাচীন এশীয় রূপ।
বিবিধ মেশিনের একটি সংগঠিত প্রণালী, যাতে একটি ট্রান্সমিটিং মেকানিজমের দ্বারা গতি সঞ্চারিত হয় একটি কেন্দ্রীয় অটোমেশন থেকে—এটাই হচ্ছে মেশিনারি-পরিচালিত উৎপাদনের সবচেয়ে বিকশিত রূপ। একটি একক মেশিনের জায়গায় এখানে আমরা পাই একটি যান্ত্রিক দানব, যার দেহটা জুড়ে থাকে গোটা গোটা কারখানা, এবং যার দানবীয় শক্তি গোড়ার দিকে তার দানবোচিত প্রত্যঙ্গসমূহে অবগুণ্ঠিত থাকে মন্থর ও পরিমিত খণ্ড খণ্ড গতি-প্রক্রিয়ার মধ্যে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফেটে পড়ে তার অগণিত অঙ্গের ক্ষিপ্র ও প্রচণ্ড ঘূর্ণীতে।
যাদের একমাত্র পেশা হল মিউল ও ক্টিম ইঞ্জিন তৈরি করা, এমন শ্রমিকদের আগেও মিউল ও স্টিম ইঞ্জিন ছিল; ঠিক যেমন দর্জির আবির্ভাবের আগেও মানুষ জামা-কাপড় পরত। কিন্তু ভকানসন, আর্কাইট, ওয়াট ও অন্যান্যদের নানাবিধ উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছিল, কেননা এই উদ্ভাবকেরা হাতের কাছে প্রস্তুত অবস্থায় পেয়েছিলেন ম্যানুফ্যাকচারের যুগের তৈরি বহুসংখ্যক কুশলী কারিগর। এদের মধ্যে কিছু অংশ বিভিন্ন ব্যবসায়ের স্বাধীন হস্তশিল্পী, কিছু ছিল ম্যানুফ্যাকচারের মধ্যে সংঘবদ্ধ, যে কথা আগেই বলা হয়েছে, যে-ম্যানুফ্যাকচারগুলিতে কঠোর ভাবে শ্রম-বিভাগ সংঘটিত হয়েছিল। উদ্ভাবনের সংখ্যা যতই বাড়তে লাগল, তই মেশিন নির্মাণ শিল্পটি বিভক্ত হতে লাগল আরো আরো বহুসংখ্যক শাখায়; এবং এই সমস্ত ম্যানুফ্যাকচারে শ্রম বিভাগও আরো আরো বিকাশ লাভ করতে লাগল। এই ভাবে এখানেই আমরা পেয়ে যাই আধুনিক শিল্পের প্রত্যক্ষ বনিয়াদ। ম্যানুফ্যাকচার উৎপাদন করল মেশিনারি আর এই মেশিনারি দিয়েই আধুনিক শিল্প, যেসব উৎপাদন-ক্ষেত্রে তা আগে আত্মবিস্তার করল, সে সব ক্ষেত্র থেকে হস্তশিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারকে নির্বাসিত কর। সুতরাং ঘটনাপ্রবাহের স্বাভাবিক ধারাতেই ফ্যাক্টরি-ব্যবস্থা গঠিত হল এক অনুপযোগী ভিত্তির উপরে। যখন এই ব্যবস্থা উন্নীত হল বিকাশের একটি বিশেষ পর্যায়ে, তখন তাকে উপড়ে ফেলতে হল এই তৈরি-হওয়া ভিত্তিটি, যেটি ইতিমধ্যেই বিস্তার লাভ করেছিল পুরনো ধাঁচে; এবং সেই ভিত্তিটির জায়গায় তাকে গড়ে তুলতে হল এমন একটি ভিত্তি, যা হবে তার উৎপাদন-পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যত কাল পর্যন্ত মনুষ্য-শক্তিতে পরিচালিত হয়, তত কাল পর্যন্ত যেমন একটি একক মেশিন তার বামন-আকৃতি রক্ষা করে, ঠিক তেমনি যত দিন পর্যন্ত জন্তু, বাতাস, এমনকি জলের মত পূর্বত সঞ্চলক শক্তিসমূহের স্থান গ্রহণে টিম ইঞ্জিন সক্ষম হয়নি, তত দিন পর্যন্ত কোন মেশিনারি-প্রণালী সঠিক অর্থে বিকাশ লাভ করতে পারেনি, ঠিক তেমনি আধুনিক শিল্পের বৈশিষ্ট্যসূচক উৎপাদন-উপকরণের যে মেশিন, তা যত দিন পর্যন্ত তার অস্তিত্বের জন্য দায়ী ছিল ব্যক্তিগত বল ও ব্যক্তিগত দক্ষতার কাছে এবং নির্ভর করত প্রত্যংশ কর্মীরা ও হস্তশিল্প কারিগরেরা যে পেশীগত বল, দৃষ্টিগত তীক্ষ্ণতা ও হস্তগত দক্ষতার সাহায্যে তাদের ছোট ছোট হাতিয়ারগুলিকে ব্যবহার করত, সেই বল, দৃষ্টি ও দক্ষতার উপরে, তত দিন পর্যন্ত আধুনিক শিল্প তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশে ছিল অশক্ত। সুতরাং এই ভাবে নির্মিত মেশিনের মহার্ঘতা ছাড়াও-যে ঘটনাটি সর্বদাই ধনিকের মনে জাগরূক থাকে, সে ঘটনাটি ছাড়াও—মেশিন-পরিচালিত শিল্পসমূহের সম্প্রসারণ এবং নোতুন উৎপাদনশাখায় তার আক্রমণ নির্ভর করে এক শ্রেণীর কর্মীর উপরে, যারা তাদের নিয়োগের প্রায় শিল্পকলা সুলভ প্রকৃতির দরুন, নিজেদের সংখ্যা লাফে লাফে বাড়াতে পারেনা, পারে কেবল ক্রমে ক্রমে। কিন্তু তা ছাড়াও বিকাশের একটি বিশেষ স্তরে আধুনিক শিল্প হস্তশিল্প ও ম্যানুফ্যাকচার দ্বারা রচিত ভিত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন হয়ে ওঠে। প্রাইমমুভার, ট্রান্সমিটিং মেকানিজম এবং খোদ মেশিনগুলির ক্রমবর্ধমান আকার শারীরিক শ্রম শুরুতে এগুলিকে যেভাবে তৈরি করেছিল সেই মূল রূপটি থেকে ক্রমাগত সরে যাবার দরুন মেশিনের অংশগুলির জটিলতা, বিভিন্নতার ও নিয়মিকতার বৃদ্ধিপ্রাপ্তি কাজের অবস্থা জনিত নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বাকি সমস্ত নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত এমন একটি, রূপ অর্জন।[১৫] স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মোয়ন এবং কাঠের পরিবর্তে লোহার ব্যবহারের মত আরো দুর্বল সামী ব্যবহারের দৈনিক বর্ধমান অপ্রতিরোধ্য চাপ-ঘটনাপ্রবাহের প্রকোপে উদ্ভূত এই সমস্ত সমস্যার সমাধান সর্বত্রই বাধাপ্রাপ্ত হল ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা-রূপ প্রতিবন্ধকের দ্বারা যে সীমাবদ্ধতা এমনকি ম্যানুফ্যাকচার-যুগের যৌথ শ্রমিকও সীমিত মাত্রায় ছাড়া ভেদ করতে পারত না। আধুনিক হাইড্রলিক প্রেস, আধুনিক পাওয়ার লুম এবং আধুনিক কার্ডিং ইঞ্জিনের মত মেশিন কখনো ম্যানুফ্যাকচারের দ্বারা উৎপাদিত হতে পারত না।
