শ্রমোৎপন্ন সমস্ত দ্রব্যেই সাধারণ মূল্য-রূপের মাধ্যমে অভিব্যক্তি হয় নির্বিশেষ মনুষ্য-শ্রমের ঘনীভূত রূপ হিসেবে; সাধারণ মূল্যস্বরূপের গঠন থেকেই এটা স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, সাধারণ মূল্য রূপ-সমগ্র পণ্য-জগতের সামাজিক চুম্বকরূপ। সুতরাং এই সাধারণ মূল্যস্নপ থেকে একথা তর্কান্তিতভাবে প্রমাণ হয়ে যায় যে পণ্যজগতে সমস্ত শ্রমের চরিত্রই এই যে তা মনুষ্যশ্রম, আর এটাই হচ্ছে তার সুনির্দিষ্ট সামাজিক চরিত্র।
২। মূল্যের আপেক্ষিক রূপ এবং সমঅৰ্থ রূপে পরস্পরসাপেক্ষ ক্রমবিকাশ
যে মাত্রায় মূল্যের আপেক্ষিক রূপ বিকশিত হয়, সমঅৰ্ঘ রূপও বিকশিত হয় ঠিক সেই মাত্রায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সমঅৰ্ঘ রূপের বিকাশ মূল্যেরই অভিব্যক্তি মাত্র, তারই বিকাশের ফলশ্রুতি মাত্ৰ।
কোন একটি পণ্যের প্রাথমিক আপেক্ষিক মূল্য-রূপ। যখন বিচ্ছিন্নভাবে দেখানো হয়, তখন আর একটি পণ্য বিচ্ছিন্নভাবে তার সমার্ঘরূপে পরিণত হয়। কোন একটি পণ্যের মূল্য যখন অন্য সমস্ত পণ্যের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় তখন আমরা পাই আপেক্ষিক মূল্যের সম্প্রসারিত রূপ, তার ফলে ঐ সমস্ত পণ্যই ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের সমাৰ্থ জ্ঞাপক জিনিসের আকার ধারণ করে। সর্বশেষে, একটি বিশেষ প্ৰকার পণ্যের মাধ্যমে যখন অন্য সমস্ত পণ্যের মূল্য প্ৰকাশিত হয়, তখন ঐ পণ্যটি সর্বজনীন সমর্ঘরাপের চরিত্র লাভ করে।
আপেক্ষিক মূল্য এবং সমার্ঘ মূল্য-মূল্যের এই দুই বিপরীত রূপের মধ্যে যে বিরোধ আছে তা বিকশিত হয় ঐ রূপের ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে।
২০ গজ ছিট = ১ কোট–এই প্ৰথম সমীকরণের মধ্যেই বিরোধ রয়েছে, যদিও তা নির্দিষ্ট করে ধরা যায় না। সমীকরণটিকে উল্টে-পাণ্টে নিলে ছিট এবং কোটের ভূমিকা উল্টে-পাণ্টে যায়। এক ভাবে ধরলে ছিটের আপেক্ষিক মূল্য প্ৰকাশিত হয় কোটের মাধ্যমে, আর এক ভাবে ধরলে কোটের আপেক্ষিক মূল্য প্ৰকাশিত হয় ছিটের মাধ্যমে। কাজেই মূল্য প্রকাশের এই প্ৰথম পর্যায়ে দুই বিপরীত মেরুত্ব বৈপরীত্য অনুধাবন করা কঠিন।
‘খ’ সমীকরণ অনুসারে একই সময়ে একটি মাত্র পণ্য তার আপেক্ষিক মূল্য সম্পূর্ণভাবে সম্প্রসারিত করতে পারে। তার সঙ্গে তুলনায় অন্য সমস্ত পণ্যই তার সমঅৰ্থ মূল্য বলেই ঐ পণ্যটি এই রূপ ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। ২০ গজ ছিট= ১ কোট-এই সমীকরণটিকে আমরা উল্টো করেও ধরতে পারি, কিন্তু তা করলে তার সাধারণ চরিত্রই বদলে যাবে, সম্প্রসারিত মূল্যরূপ মূল্যের সাধারণ রূপে। পরিণত হবে।
সর্বশেষে, ‘গ’ সমীকরণে পণ্যজগতে মূল্যের সাধারণ আপেক্ষিক রূপটি দেখা দিয়েছে, কারণ এখানে একটি পণ্য ছাড়া আর কোন পণ্যই সমঅৰ্থ রূপ ধারণ করতে পারে না। সুতরাং একটি একক পণ্য, যেমন ছিট কাপড় অন্য প্ৰত্যেক রকম পণ্যের সঙ্গে প্ৰত্যক্ষভাবে বিনিময়যোগ্য হবার চরিত্র অর্জন করে; এবং এই চরিত্র অন্য প্রত্যেকটি পণ্যের ক্ষেত্রে অস্বীকৃত হয়।(১০)
উপরন্তু যে পণ্যটি সর্বজনীন সমঅৰ্থ রূপের কাজ করে সে পণ্যটি আর আপেক্ষিক মূল্য রূপ ধারণ করতে পারে না। ছিট অথবা অন্য কোন পণ্য যদি একই সঙ্গে সমঅৰ্ঘ রূপ এবং মূল্যের আপেক্ষিক রূপ-এই দুই রূপই ধারণ করতে পারতো, তাহলে ওই পণ্যটি নিজের সমঅৰ্থ বলে গণ্য হতো , তার মানে দাডাতে ২০ গজ ছিট = ২০ গজ ছিট। এইরকম একই কথার পুনরুক্তি দ্বারা মূল্যও প্রকাশিত হয় না, মূল্যের আয়তনত প্রকাশিত হয় না। সর্বজনীন সমঅৰ্থ রূপের আপেক্ষিক মূল্য প্রকাশ করতে হলে বরং ‘গ’ রূপটিকে উলটে দেওয়া যেতে পারে। অন্যান্য পণ্যের মতো সমঅৰ্ঘ রূপটির নিজস্ব কোন আপেক্ষিক মূল্যরূপ নেই, কিন্তু তার মূল্য অপেক্ষিক ভাবে প্রকাশিত হয় পণ্যের এক সীমাহীন রাশিমালার দ্বারা। এইভাবে খ অর্থাৎ আপেক্ষিক মূল্যরূপের সম্প্রসারিত ছকটি এখানে দেখা দিল সমঅৰ্থ পণ্যটির আপেক্ষিক মূল্যরূপের একটি বিশিষ্ট অভিব্যক্তি হিসেবে।
৩। মূল্যের সাধারণ রূপ থেকে অৰ্থরূপে অতিক্রান্ত
সর্বজনীন সমঅৰ্ঘ রূপটি সাধারণভাবে মূল্যেরই একটি রূপ। কাজেই যে-কোন পণ্য এই রূপ ধারণ করতে পারে। অথচ, কোন একটি পণ্য একবার মন্দি সর্বজনীন সমঅৰ্ঘ্যরূপে গ সমীকরণ ধারণ কৰে, তাহলে বুঝতে হবে যে অন্য কোন পণ্য আর এইরূপে গণ্য হতে পারবে না এবং তার কারণ ঐ সমস্ত পণ্যেরই ক্রিয়া! যে মুহূর্তে একটি মাত্র পণ্য আলাদাভাবে এইরকম শুধুমাত্র সমঅৰ্ঘ রূপে বাছাই হয়ে গেল, কেবল তখন থেকেই পণ্য জগতের সাধারণ আপেক্ষিক রূপ সু-সংগীতু হয়ে দাড়ালো এবং লাভ করলে সামাজিক স্বীকৃতি।
এখন, যে পণ্যটির অবয়ব দিয়ে সমাজে সমঅৰ্ঘ্যরূপ কাজ করার রেওয়াজ দেখা দিল, তাকেই বলা হয় অর্থ নামক পণ্য বা অর্থ। পণ্য জগতে সৰ্বজনীন সমঅৰ্ঘ রূপের পালন করা এখন ঐ পণ্যটির বিশ্লিষ্ট সামাজিক কর্তব্য হয়ে দাড়ালো। যে সমস্ত পণ্য খ সমীকরণের ছিটের সমঅৰ্ঘ রূপ ধারণ করতে পারে এবং গ সমীকরণে ছিটের মাধ্যমে অন্য সমস্ত পণ্যের প্রকাশ করে তাদের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করছে একটি পণ্য-স্বর্ণ। সুতরাং গ সমীকরণে ছিটের বদলে স্বর্ণ বসিয়ে নিলে পাওয়া যায়,-
ঘ] অর্থরূপ
২০ গজ ছিট= ২ আউন্স স্বর্ণ
১ কোট = ২ আউন্স স্বর্ণ
