সমস্ত পূর্ণ-বিকশিত মেশিনারির থাকে তিনটি অংশ, ‘মোটর-মেকানিজম’, ‘ট্রান্সমিটিং-মেকানিজম এবং, সর্বশেষ, ‘টুল’ বা ‘কর্মর্যন্ত্র। মোটর মেকানিজম গোটা মেশিনারিটিতে গতি সঞ্চার করে। হয়, এই মেকানিজমটি তার নিজের সঞ্চলক শক্তি প্রজনন করে, যেমন টিম ইঞ্জিন, ক্যালোরিক ইঞ্জিন, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইঞ্জিন ইত্যাদি আর, নয়তো, পূর্বস্থিত কোন প্রাকৃতিক শক্তি থেকে সে তার সঞ্চলক শক্তি পেয়ে যায়, যেমন জল-চক্র তার শক্তি পায় কোন জল-মুখ-থেকে, বায়ু-যন্ত পায় বাতাস থেকে। ফ্লাই-হুইল, শ্যাফটিং, দাত-ওয়ালা হুইল, পুলি, স্ট্র্যাপ, রোপ, ব্যাণ্ড, পিনিয়ন এবং অত্যন্ত বিবিধ প্রকারের গিয়ারিং ইত্যাদি নিয়ে গঠিত ট্রান্সমিটিং-মেকানিজম মেশিনারিটির গতি নিয়ন্ত্রণ করে, প্রয়োজনমত তার রূপ পরিবর্তন করে, যেমন রেখা-রূপ থেকে চক্রাকার রূপে এবং সেই গতিকে কর্মযন্ত্র-গুলির মধ্যে বিলি-বণ্টন করে দেয়। সমগ্ৰ মেকানিজমটির এই প্রথম দুটি অংশের একমাত্র কাজ হচ্ছে কর্মযন্ত্রগুলির গতিশীল রাখা—যেগতির সাহায্যে শ্রমকে প্রয়োজনমত নিয়োজিত ও উপযোজিত করা যায়। ‘টুল’ বা কর্মযন্ত্রটি হচ্ছে মেশিনারিটির সেই অংশটি যা দিয়ে ১৮ শতকের বিপ্লব শুরু হয়। এবং আজও পর্যন্ত যখনি কোন হস্তশিল্প বা ম্যানুফ্যাকচার মেশিনারি কর্তৃক চালিত শিল্পে রূপান্তরিত হয়, সে নিরন্তর এবং বিবিধ সুচনা-বিন্দু হিসাবেই কাজ করে চলছে।
কর্মযন্ত্রটিকে আরো ভাল করে পরীক্ষা করলে আমরা তার মধ্যে সাধারণত দেখতে পাই-যদিও নিঃসন্দেহে প্রায়শই অত্যন্ত পরিবর্তিত আকারে-হস্তশিল্পী বা মা ফ্যাকচার-শ্রমিকের দ্বারা ব্যবহৃত সেই ‘অ্যাপারেটাস’ ও ‘টুলগুলি; পার্থক্য এই যে, অতীতে এগুলি ছিল মানুষের হাতিয়ার আর এখন এগুলি মেকানিজম-এর সরঞ্জাম অথবা মেকানিকের সরঞ্জাম। হয়, গোটা মেশিনটাই পুরনো হস্তশিল্পগত টুলের কম বেশি পরিবর্তিত মেকানিক্যাল সংস্করণ, যেমন, পাওয়ারলুম,[৫] নয়তো মেশিনের কাঠামোয় ফিট-করা বিভিন্ন কাজের উপকরণগুলি আমাদের পূর্ব-পরিচিত, যেমন মিউল মেশিনে মাকু, স্টকিং লুমে সুচ, করাতকলে করাত, মপিং মেশিনে ছুরি। এইসব ‘টুল’ এবং ঐ মেশিনটির মূল দেহের সঙ্গে জন্ম থেকেই পার্থক্য থাকে এবং পরবর্তী কালে মেশিনটির দেহে এগুলি সংযোজিত হয়—যে মেশিনটি মেশিনারিরই উৎপাদন।[৬] সুতরাং সঠিক অর্থে মেশিন হচ্ছে একটি মেকানিজম, যা গতি সঞ্চারিত হবার পরে, টুলগুলির সাহায্যে সেই একই সব কাজ করে, যেগুলি অতীতে শ্রমিক ঐ টুলগুলির সাহায্যে করত। এই সঞ্চলক শক্তি মানুষ থেকেই আসুক বা অন্য কোন মেশিন থেকেই আসুক, এব্যাপারে তাতে কোন তারতম্য হয়না। যে মুহূর্তে মানুষের হাত থেকে একটি টুল তুলে নিয়ে সেটাকে একটি মেকানিজমে ফিট করা হয়, সেই মুহূর্ত থেকে একটি নিছক হাতিয়ারের স্থান নেয় একটি মেশিন। পার্থক্যটা সঙ্গে সঙ্গেই নজরে পড়ে—এমনকি, যেখানে মানুষই থেকে যায় প্রধান সঞ্চলক হিসাবে। কত সংখ্যক হাতিয়ার সে নিজে যুগপং করতে পারে, তা সীমায়িত হয় তার নিজের প্রাকৃতিক উৎপাদন-উপকরণগুলির দ্বারা, তার শারীরিক উপাদানগুলির দ্বারা। জার্মানিতে প্রথমে চেষ্টা হয়েছিল একজন ‘স্পিনার দিয়ে দুটো স্পিনিং হুইল’ চালানোর, অর্থাৎ একই সঙ্গে দুহাত ও দুপা দিয়ে কাজ করানোর। কাজটা ছিল দুঃসাধ্য। পরবর্তী কালে দুটি টাকু-সমন্বিত একটি ট্রেডল স্পিনিং হুইল উদ্ভাবিত হল। কিন্তু একই সঙ্গে দুটো সুতো কাটতে পারে এমন কুশলী শ্রমিকের সংখ্যা দু-মাথালা মানুষের মতই বিরল। অন্য দিকে, জন্ম থেকেই ‘জেনি’ ১২-১৮টি টাকু দিয়ে সুতো কাটতে পারত আর স্টকিং লুম তো একসঙ্গে কয়েক হাজার কটা দিয়ে একই সঙ্গে বুনতে পারত। একজন হস্তশিল্পী কত টুল ব্যবহার করতে পারে, তা তার দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারাই সীমায়িত; মেশিন একই সঙ্গে কত সংখ্যক ‘টুল দিয়ে কাজ করতে পারে, তা গোড়া থেকেই এই সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত।
. অনেক হস্তচালিত হাতিয়ারে নিছক সঞ্চলক শক্তি হিসাবে মানুষ এবং সঠিক ভাবে যাকে শ্রমিক বা ‘অপারেটর বলা যায় সেই হিসাবে মানুষ—এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে প্রকট। যেমন পায়ের পাতা হচ্ছে স্পিনিং হুইলের প্রধান সঞ্চলক মাত্র কিন্তু স্পিনিং-এর আসল কাজটি করে হাত, যে টাকু চালায়, সুতো টানে এবং ঘোরায়। হস্তশিল্পীর এই সর্বশেষ কাজটিই সর্বপ্রথম শিল্প-বিপ্লবের আয়ত্তে আসে আর শ্রমিকের জন্য পড়ে থাকে চোখ দিয়ে মেশিনটির উপরে নজর রাখা এবং, হাত দিয়ে ভুলচুকগুলি শুধরে দেবার নোতুন কাজটি ছাড়াও, কেবল সঞ্চলক শক্তি হিসাবে কাজ করার যান্ত্রিক অংশটি। অন্যদিকে, সেই সমস্ত উপকরণ যেগুলির ক্ষেত্রে মানুষ সবসময়েই কাজ করেছে সঞ্চলক শক্তি হিসাবে, যেমন মিলের ‘র্যাংক’ ঘোরানো, পাম্প চালানো, হাপরের হাত উপর-নীচ করা, হামনদিস্তার সাহায্যে গুড়ো করা ইত্যাদি এমন সব উপকরণ যাতে অচিরেই সঞ্চলক শক্তি হিসাবে চালু হয়ে যায় পশু, জল[৭] ও বাতাস। ম্যানুফ্যাকচার আমলের অনেক আগে এবং, কিয়ৎ পরিমাণে, সেই আমল থাকা কালেই, এই হাতিয়ার গুলি এখানে-সেখানে মেশিনে রূপান্তরিত হয়ে যায় অথচ উৎপাদন-পদ্ধতিতে কোন বিপ্লব ঘটায় না। আধুনিক শিল্প-যুগে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই উপকরণগুলি এমনকি সেগুলির হস্তচালিত আকারেই মেশিন হয়ে যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ‘৮৩৬-৩৭ সালে যে পাম্পগুলি দিয়ে ওলন্দাজরা হালেম-এর লেকটিকে খালি করেছিল, সেগুলি তৈরি হয়েছিল মামুলি পাম্পেরই নীতিতে; একমাত্র পার্থক্য ছিল এই যে, সেগুলির পিস্টন চালাতে মানুষ ব্যবহার না করে, ব্যবহার করা হয়েছিল সাইক্লোপিয়ান টিম ইঞ্জিন। ইংল্যাণ্ডে কর্মকারেরা যে মামুলি ও অত্যন্ত কাঁচা ধরনের হাপর ব্যবহার করে, অনেক সময়ে সেগুলির হাতলকেই স্টিম ইঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত করে সেগুলিকেই রূপান্তরিত করা হত ব্লোয়িং ইঞ্জিনে। খোদ স্টিম ইঞ্জিনের কথাই ধরা যাক; ১৭ শতকের শেষ দিকে ম্যানুফ্যাকচার-আমলে তার উদ্ভাবনের কাল থেকে ১৭৮০ সাল পর্যন্ত তা যে-আকারে ছিল, তাতে কোন শিল্প-বিপ্লবের উত্তর ঘটেনি। পরন্তু, মেশিনের উদ্ভাবন নিন ইঞ্জিনের আকারে বিপ্লব ঘটানোকে অনিবার্য করে তুলল। যে মুহূর্তে মানুষ তার প্রশ্নের বিষয়ের উপরে হাতিয়ারের সাহায্যে কাজ করার বদলে, একটি হাতিয়ার-মেশিনের নিছক সঞ্চলক শক্তি হিসাবে কাজ করে, এটা হয়ে পড়ে একটি আপতিক ঘটনা যে, সঞ্চলক শক্তি মানুষের পেশীশক্তির রূপ পরিগ্রহ করে; এবং তা সমান সার্থক ভাবেই বাতাস, জল বা বাষ্পের রূপ পরিগ্রহ করতে পারে। অবশ্য, যে-মেকানিজমটি গোড়ায় তৈরি হয়েছিল কেবল মানুষের দ্বারা চালিত হবার জন্যই, উল্লিখিত রূপ-পরিবর্তন সেই মেকানিজমটিতে বড় বড় রদবদল না ঘটিয়ে পারেনা। আজকাল সেলাইয়ের মেশিন, রুটি তৈরির মেশিনের মত যেসব মেশিন চালু হয়, সেগুলি, হয়, তাদের প্রকৃতিবশতই ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদনের কাজ থেকে বাদ পড়ে যায় আর, নয়তো, এমন ভাবে নির্মিত হয় যে, মানুষের শ্রম এবং বিশুদ্ধ যান্ত্রিক সঞ্চলক শক্তি—উভয়ের দ্বারাই সেগুলিকে চালানো যায়।
