কারিগর কাজ করে একটি টুল দিয়ে, মেশিন তার জায়গায় বসায় এমন এক মেকানিজম, যা কাজ করে অনুরূপ অনেকগুলি টুল দিয়ে এবং একটি মাত্র সঞ্চলক শক্তি দ্বারা গতিশীল হয়ে—তা সেই সঞ্চলক শক্তির রূপ যাই হোক না কেন।[৮] এখানে আমরা মেশিনকে পাই, কিন্তু পাই কেবল মেশিনারি দ্বারা চালিত উৎপাদনের একটি প্রাথমিক উপাদান হিসাবে।
মেশিনের আকারে ও তার কাজের ‘টুলগুলির সংখ্যায় বৃদ্ধিপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হয় তাকে চালানোর জন্য একটি আরো অতিকায় মেকানিজম-এর এবং এই মেকানিজমটির আবার তার প্রতিবন্ধ অতিক্রম করার জন্য দরকার হয় মানুষের তুলনায় বিপুলতর ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সঞ্চলক শক্তির; তা ছাড়া, আরো একটি ঘটনা এই যে, অবিরাম সমভাবে অব্যাহত গতি-সঞ্চারের হাতিয়ার হিসাবে মানুষ একেবারেই অনুপযুক্ত। কিন্তু যদি ধরে নেওয়া হয় যে, সে কাজ করছে কেবল একটি মোটর হিসাবে এবং একটি মেশিন তার টুলের স্থান গ্রহণ করেছে, এটা স্পষ্ট যে তাহলে, প্রাকৃতিক শক্তিসমূহ তার জায়গা গ্রহণ করতে পারে। ম্যানুফ্যাকচার-আমল থেকে উত্তরাধিকার হিসাবে যেসব বড় বড় মোটর আমরা পেয়েছি, অশ্বশক্তি হচ্ছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ, অংশতঃ এই কারণে যে অশ্বের নিজস্ব একটি মাথা আছে এবং অংশতঃ এই কারণে যে অশ্ব অতি ব্যয়বহুল এবং যে-মাত্রায় তাকে কারখানায় প্রয়োগ করা যায়, তা বড়ই সীমাবদ্ধ। [৯] যাই হোক, আধুনিক শিল্পের শৈশবকালে অশ্ব ব্যবহৃত হত ব্যাপকভাবে। এটা, একদিকে যেমন প্রমাণিত হয় সম-সাময়িক কৃষিবিদদের অভিযোগ থেকে, অন্য দিকে, তেমন প্রমাণিত হয় “অশ্বশক্তি” কথাটি থেকে, যা যান্ত্রিক শক্তির অভিধা হিসাবে আজও পর্যন্ত টিকে আছে।
বাতাস বড় অনিয়মিত ও অনিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং তা ছাড়া, আধুনিক শিল্পের স্থান যে ইংল্যাণ্ডে সেই ইংল্যাণ্ডে এমনকি ম্যানুফ্যাকচার-আমলেও জলশক্তিরই ছিল প্রাধান্য। ১৭ শতকেই চেষ্টা হয়েছিল দু’জোড়া মিল-স্টোনকে একটি মাত্র জল-চক্রের সাহায্যে চালানোর। কিন্তু গিয়ারিং’-এর পরিবর্ধিত আকারটি জল-শক্তির তুলনায় হয়ে পড়ল অত্যধিক, যে জল-শক্তি আবার হয়ে উঠেছে অপ্রতুল এবং যেসব কারণের অন্য সংঘর্ষণের নিয়মাবলী’ (‘লজ অব ফ্রিকশন’ ) নিয়ে আরো যথাযথ অনুসন্ধান শুরু হল, এই ঘটনা সেগুলির মধ্যে একটি। একই ভাবে একটি লেভার’-কে ঠেলে ও টেনে মিলকে গতিশীল করার ব্যবস্থার দরুন সঞ্চলক শক্তিতে অনিয়মকতার কারণে কালক্রমে এল ফ্লাইং হুইলের তত্ত্ব ও প্রয়োগ, যা পরবর্তী কালে আধুনিক শিল্পে অধিকার করল এত গুরুত্বপূর্ণ স্থান।[১০] এই ভাবেই ম্যানুফ্যাকচারের আমলে বিকাশ লাভ করল আধুনিক যান্ত্রিক শিল্পের প্রথম বৈজ্ঞানিক ও কৃৎকৌশলগত উপাদানসমূহ। আর্কাইট এর থশ -স্পিনিং মিল শুরু থেকেই চালিত হত জলের দ্বারা। কিন্তু এসব সত্ত্বেও, প্রধান সঞ্চলুক শক্তি হিসাবে জলের ব্যবহার ছিল নানা সমস্যায় আকীর্ণ। তাকে ইচ্ছামত বাড়ানো যেত না, বছরের কোন কোন ঋতুতে হয়ে পড়ত অকেজো, এবং সবচেয়ে যেটা বড় সমস্যা, তা হল এই যে এটা মূলতঃ স্থান-নিবদ্ধ।[১১] ওয়াট-এর দ্বিতীয় এবং তথাকথিত ‘ডবল অ্যাক্টিং স্টিম ইঞ্জিন’-টি উদ্ভাবিত হবার পূর্ব পর্যন্ত এমন একটি ‘প্রাইভ-মুভার (অভি-সঞ্চলক’ }-এর সন্ধান মেলেনি, যা কয়লা ও জলকে কাজে লাগিয়ে নিজের শক্তি নিজেই জন্মাতে সক্ষম, যা নিজে সচল এবং তদুপরি সচলতার উপায়, যার শক্তি সমগ্র ভাবেই মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন, যা জল-চক্রের মত গ্রামগত নয় বরং শহরগত, যা উৎপাদনকে জলচক্রের মত গ্রামে গ্রামান্তরে বিক্ষিপ্ত না করে দিয়ে শহরে কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ সৃষ্টি করে, যা বিশ্বজনীন ভাবে কারিগরি প্রয়োগের উপযুক্ত এবং, আপেক্ষিক ভাবে বলা যায়, স্থানীয় ঘটনাবলী দ্বারা যার অবস্থান নির্বাচনের ব্যাপারটি কদাচিং ব্যাহত হয়। ১৭৮৪ সালের এপ্রিল মাসে ওয়াট যে পেটেন্ট বার করেন তার ‘স্পেসিফিকেশন’ থেকেই তাঁর প্রতিভা প্রতিভাত হয়। এই স্পেসিফিকেশনে তার স্টিম ইঞ্জিনের বিবরণ এমন ভাবে দেওয়া হয়নি যে সেটি একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য উদ্ভাবিত যন্ত্র মাত্র, পরন্তু যান্ত্রিক শিল্পে বিশ্বজনীন ব্যবহারের একটি এজেন্ট। এই অভিজ্ঞান-পত্রে তিনি এমন সব প্রয়োগের উল্লেখ করেন, যাদের অনেকগুলিই, যেমন ‘ক্টিম হামার’, পরবর্তী অর্ধ-শতাব্দীর আগে প্রবর্তিত হয়নি। অবশ্য নৌ-চলাচলের ক্ষেত্রে স্টিম ইঞ্জিনের ব্যবহার সম্পর্কে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তার দুই উত্তরসাধক, বলটন এবং ওয়াট, ১৮৭১ সালের প্রদর্শনীতে সাগরগামী স্টিমারের জন্য বিশাল আকারের স্টিম ইঞ্জিন প্রেরণ করেন।
যে মুহূর্তে বিভিন্ন টুল’ রূপান্তরিত হল মানুষের হস্তচালিত হাতিয়ার থেকে একটি মেশিনের মেকানিক্যাল অ্যাপারেটাসের উপকরণে, সেই মুহূর্তে সঞ্চলক মেকানিজমটিও অর্জন করল একটি স্বতন্ত্র রূপ, যা মনুষ্য-শক্তির সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ বিমুক্ত। তারপরে, সেই একক মেশিনটি, যার কথা আমরা এতক্ষণ বিবেচনা করেছি, পর্যবসিত হল মেশিনারি দ্বারা উৎপাদনের একটি উপাদানে মাত্র। একটি সঞ্চলক মেকানিজম সক্ষম হল একই সঙ্গে অনেকগুলি মেশিন চালু করতে। যুগপৎ চলে এমন মেশিনের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পায়, সঞ্চলক মেকানিজমটিও তত বৃদ্ধি পায় এবং সঞ্চারক (ট্রান্সমিটিং) মেকানিজমটিও হয় একটা ব্যাপক বিস্তারশীল অ্যাপারেটাস।
