হস্তশিল্পের ভাঙনের দ্বারা, শ্রম-উপকরণসমূহের বিশেষীকরণের দ্বারা, প্রত্যংশ শ্রমিকদের উদ্ভব ঘটিয়ে তাদেরকে একটিমাত্র ব্যবস্থার মধ্যে যূথবন্ধন ও সম্মিলনের দ্বারা, ম্যানুফ্যাকচার-প্রণালীতে শ্রম-বিভাগ উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি করে একটি গুণগত স্তরভেদ ও পরিমাণগত অনুপাত এবং তারা একই সময়ে গড়ে তোলে সমাজে নোতুন নোতুন উৎপাদিকা শক্তি। তার নির্দিষ্ট ধনতান্ত্রিক রূপে এবং নির্দিষ্ট অবস্থার অধীনে তার পক্ষে এই ধনতান্ত্রিক রূপ ছাড়া অন্য কোনো রূপ গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না—ম্যানুফ্যাকচার হল কেবল আপেক্ষিক উত্তমূল্য প্রজননের অথবা শ্রমিকের স্বার্থের বিনিময়ে মূলধনের আত্মপ্রসারণের একটি পদ্ধতি—যাকে সাধারণ ভাবে বলা হয় সামাজিক সম্পদ’, ‘ওয়েলথ অব নেশনস ইত্যাদি। তা কেবল শ্রমিকের স্বার্থের বিনিময়ে ধনিকের স্বার্থ সাধনের জন্যই শ্রমিকের সামাজিক উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধিই করে না, তা সেটা করে শ্রমিকদের পঙ্গু করে দিয়ে। শ্রমের উপরে মূলধনের প্রভুত্বের জন্য তা নোতুন অবস্থার সৃষ্টি করে। অতএব, এ যদি নিজেকে ঐতিহাসিক ভাবে উপস্থাপিত করে একটি অগ্রগামী পদক্ষেপ হিসাবে এবং, সমাজের বিকাশ পথে একটি আবশ্যিক পর্যায় হিসাবে, তা হলে অন্য দিকে সেটা হল শোষণের একটি সুসংস্কৃত ও সুসভ্যকৃত পদ্ধতি।
রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্ব, একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসাবে যার উদ্ভব হয় ম্যানুফ্যাকচারের আমলে, তা শ্রম-বিভাজনকে দেখে কেবল ম্যানুফ্যাকচারের দৃষ্টিকোণ থেকে।[১৪] এবং তার মধ্যে দেখে কেবল একটি উপায়-একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রমের সাহায্যে আরো বেশি পণ্যোৎপাদনের এবং তার ফলে পণ্যের মূল্য-হাসের ও দ্রুতবেগে মূলধন-সঞ্চয়ের একটি উপায় হিসাবে। পরিমাণ ও বিনিময় মূল্য বৃদ্ধির প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে জাজ্বল্যমান প্রতিতুলনা হচ্ছে চিরায়ত পুরা-বৃত্ত লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি, যাদের চোখ একান্ত ভাবেই নিবদ্ধ গুণমান ও ব্যবহার-মূল্যের উপরে।[১৫] উৎপাদনের সামাজিক শাখাগুলির পৃথগীভবনের ফলে পণ্য আরো ভাল ভাবে তৈরি হয়, মানুষের বিভিন্ন প্রবণতা ও প্রতিভা উপযুক্ত ক্ষেত্র বেছে নেয়[১৬]; এবং কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোথাও গুরুত্বপূর্ণ ফল পাওয়া যায় না।[১৭] অতএব, উৎপাদনের সামাজিক শাখাসমূহের এই পৃথগীভবনের ফলে উৎপাদন ও উৎপাদক উভয়েরই উৎকর্ষ ঘটে। যদি উৎপন্ন পরিমাণের বৃদ্ধিপ্রাপ্তির দিকটাই প্রায়শঃ উল্লিখিত হয়ে থাকে, তা হলে তা করা হয় কেবল ব্যবহার-মূল্যের অধিকতর প্রাচুর্যের পরিপ্রেক্ষিতে। একমাত্র ব্যবহার মূল্যের দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখার এই দিকটি প্লেটোও গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এম বিভাজনকে দেখেছিলেন একটি ভিত্তি হিসাবে, যার উপরে গড়ে ওঠে বিভিন্ন শ্রেণীতে সমাজের বিভাজন, যেমন দেখেছেন জেনোফোন, যিনি তার চরিত্রগত বুর্জোয়া প্রবৃত্তি থেকেই কর্মশালার অভ্যন্তরস্থ শ্রম-বিভাজনের আরো কাছে গিয়েছেন।[১৮] রাষ্ট্রের গঠনমূলক নীতি হিসাবে শ্রম-বিভাজন সম্পর্কে যে-আলোচনা প্লেটোর রিপাবলিক’এ আছে, তা হচ্ছে কেবল মিশরীয় জাতিভেদ প্রথার আথেন্সীয় আদর্শায়িত রূপ; মিশর তার সমসাময়িক অনেকের কাজেই শিল্পায়িত দেশের অনুকরণীয় নমুনা হিসাবে কাজ করত, যেমন ইসক্রেটিস-এর কাছে[১৯] এবং রোম-সাম্রাজ্যের অন্তর্গত গ্রীকদের কাছেও মিশরের এই মর্যাদা ছিল অব্যাহত।[২০]
যথার্থ ম্যানুফ্যাকচারের আমলে, যখন ম্যানুফ্যাকচারের ছিল ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের প্রধান রূপ, তখন ম্যানুফ্যাকচারের স্ব-বিশেষ প্রবণতাগুলির পূর্ণ বিকাশের পথে ছিল অনেকগুলি প্রতিবন্ধক। যদিও ম্যানুফ্যাকচার সৃষ্টি করে, যেমন আমরা দেখেছি, দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে একটি সরল বিভাজন এবং সেই সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণীতে তাদের একটি স্তরতান্ত্রিক বিন্যাস, তবু দক্ষ শ্রমিকদের বিপুলতর প্রভাবের দরুণ অদক্ষ শ্রমিকদের সংখ্যা থাকে খুবই সীমাবদ্ধ। যদিও তা শ্রমের জীবন্ত উপকরণগুলির পরিপক্কতা, শক্তি ও বিকাশের বিভিন্ন মাত্রার সঙ্গে প্রত্যংশ শ্রমিকদের অভিযোজিত করে দেয় এবং এই ভাবে নারী ও শিশুদের শোষণের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়, তা হলেও সমগ্র ভাবে এই প্রবণতা পুরুষ শ্রমিকদের অভ্যাস ও প্রতিরোধের সর্বনাশ ঘটায়। যদিও হস্তশিল্পগুলির পৃথগীভবন শ্রমিককে গড়ে তোলার খরচ কমিয়ে দেয় এবং, ফলত, তার মূল্যও কমিয়ে দেয়, তবু, অধিকতর দুরূহ প্রত্যংশ-কাজের জন্য দরকার হয় দীর্ঘতর শিক্ষানবিশি এবং, এমন কি, যেখানে তা বাহুল্য মাত্র, সেখানেও শ্রমিকেরা তার জন্য সন্দেহবশতঃ পীড়াপীড়ি করে। যেমন ইংল্যাণ্ডে আমরা দেখতে পাই সাত বছরের শিক্ষানবিশি সমেত শিক্ষানবিশির আইনগুলি ম্যানুফ্যাকচার-আমলের শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বলবৎ ছিল এবং আধুনিক শিল্পের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত সেগুলিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়নি। যেহেতু হস্তশিল্পে কৌশলই হচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারের বনিয়াদ এবং যেহেতু সমগ্র ভাবে ম্যানুফ্যাকচার-প্রণালী স্বয়ং শ্রমিকদের ছাড়া আর কোন কাঠামোর অধিকারী নয়, সেহেতু মূলধন নিরন্তর বাধ্য হয় শ্রমিকের অবাধ্যতার সঙ্গে লড়াই করতে। বন্ধু উরে বলেন, “মানব-প্রকৃতির দুর্বলতার দরুন এমন ব্যাপার ঘটে যে, শ্রমিক যতই দক্ষ হয়, ততই সে খেয়ালি ও বেয়াড়া হয় এবং স্বভাবতই হয়ে ওঠে একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ হবার অনুপযুক্ত—এমন একটি ব্যবস্থা, যার সে সমগ্র ভাবেই দারুণ ক্ষতি করতে পারে। [২১] সুতরাং গোটা ম্যানুফ্যাকচার-আমলটি জুড়েই শ্রমিকদের মধ্যে শৃংখলাহীনতার অভিযোগটি শোনা যায়। এবং আমাদের কাছে যদি সমকালীন লেখকদের সাক্ষ্য নাও থাকত, তা হলেও এই কটি সহজ ঘটনা যে, ষোড়শ শতক থেকে আধুনিক শিল্প-যুগের মধ্যবর্তী সময়কাল জুড়ে মূলধন ম্যানুফ্যাকচার-শ্রমিকদের মোট ব্যবহারযোগ্য কাজের সময়ের উপরে প্রভুত্ব অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, ম্যানুফ্যাকচার হচ্ছে স্বল্পকালস্থায়ী এবং তা শ্রমিকদের আগমন-নির্গমনের সঙ্গে সঙ্গে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থান পরিবর্তন করে—এই কটি ঘটনা থেকেই অনেক কিছু প্রকাশ পায়। যে কোনো ভাবেই হোক, শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করতেই হবে”, ১৭৭০ সালে এই কথা সোস্কারে যোষণা করেছিলেন ব্যবসা ও বাণিজ্য প্রসঙ্গে নিবন্ধ (“এসে অন ট্রেড অ্যাণ্ড কমার্স” )-এর বহু-উদ্ধত গ্রন্থকার। ৬৬ বছর পরে ডঃ অ্যান্ড্রু উরে তার প্রতিধ্বনি করে বলেন, “এম-বিভাজনের পণ্ডিতি সুত্রের উপরে প্রতিষ্ঠিত ম্যানুফ্যাকচারে শৃঙ্খলা ছিল না এবং শৃংখলা সৃষ্টি করেছিলেন আর্কাইট।”
