ম্যানুফ্যাকচারে যৌথ শ্রমিক তৈরি করার জন্য এবং তার মাধ্যমে সামাজিক শক্তিতে সমৃদ্ধ মূলধন তৈরি করার জন্য, প্রত্যেক শ্রমিককে অবশ্যই পরিণত করতে হবে ব্যগিত উৎপাদিকা শক্তিতে দরিদ্র। “অজ্ঞতা যেমন শিল্পের জননী, তেমন। বুসংস্ক বেরও জননী। মনন ও কল্পনা বিভ্রমসাপেক্ষ কিন্তু একটি হাত বা পা নাড়াবার অভ্যাস এই উভয়েরই নিরপেক্ষ। স্বভাবতই ম্যানুফ্যাকচার সবচেয়ে বেশি ঋদ্ধি লাভ করতে পারে সেখানে, যেখানে মনের সঙ্গে পরামর্শ করা হয় সবচেয়ে কম এবং যেখানে কর্মশালাকে বিবেচনা করা যায় একটি ইঞ্জিন হিসাবে, মানুষেরা যার বিভিন্ন প্রত্যংশ”।[৬] বাস্তবিক পক্ষে, অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি কয়েকজন ম্যানুফ্যাকচার-কারক বিশেষ কয়েকটি কাজের জন্য বাছাই করে নিয়োগ করত আধ-হাবলা লোকদের সেই কাজগুলি ছিল তাদের ব্যবসাগত গুপ্ত রহস্য।[৭]
অ্যাডাম স্মিথ বলেন, “অধিকাংশ মানুষেরই উপলব্ধিগুলি আবশ্যিক ভাবে গঠিত হয় তাদের মামুলি কৰ্মনিযুক্তির দ্বারা। যে মানুষটির সারাজীবন কেটে যায় কয়েকটি সরল কর্মকাণ্ড সম্পাদনে তার কোনো সুযোগই হয় না তার বোধশক্তি প্রয়োগের। একটি মানবিক জীবের পক্ষে যতটা সম্ভব নির্বোধ ও অজ্ঞ হওয়া সম্ভব, সে সাধারণতঃ তাই নয়। একজন প্রত্যংশ শ্রমিকের নিবুদ্ধিতার বিবরণ দিয়ে তিনি আরো বলেন, “তার অনড় জীবনের একঘেয়েমি স্বভাবতই তার মনের সাহসকে বিকৃত করে দেয়; যে কাজটিতে বাঁধা থেকে সে বড় হয়েছে, সে কাজটি ছাড়া আর কোনো কাজে উৎসাহ ও অধ্যবসায় সহকারে শক্তি প্রয়োগে তা তাকে অক্ষম করে দেয়। এইভাবে তার নিজের কাজে তাকে কুশলতা অর্জন করতে হয় তার বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, সামরিক গুণগুলির বিনিময়ে। কিন্তু প্রত্যেকটি উন্নত ও সভ্য সমাজে এই হচ্ছে অবস্থা, যাতে শ্রমজীবী দরিদ্ররা অর্থাৎ জনগণের বিপুলতর অংশ হয় অধঃপতিত।”[৮] শ্রম-বিভাজনের দ্বারা যাতে বিপুল জনসমষ্টি সম্পূর্ণ ভাবে অধঃপাতিত না হয়, সেইজন্য অ্যাডাম স্মিথ রাষ্ট্র কতৃক জনগণেকে শিক্ষাদানের সুপারিশ করেন, কিন্তু সে শিক্ষা দিতে হবে বিবেচনা সহকারে এবং হোমিপ্যাথিক ডোজের আকারে। তার ফরাসী অনুবাদক ও টীকাকার জি গার্ণিয়ার, যিনি প্রথম ফরাসী সাম্রাজ্যের অধীনে খুব স্বাভাবিক ভাবেই অভূদিত হয়েছিলেন সিনেটর হিসাবে, তিনি ঠিক ততটা স্বাভাবিক ভাবেই তাকে এই বিষয়ে বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেন, জনগণের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার শ্রম-বিভাজনের মূল নিয়মটিকেই লংঘন করে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের গোটা ব্যবস্থাটাই তার বৈধতা হারিয়ে ফেলে।” তিনি বলেন, “অন্যান্য সর্বপ্রকার শ্রম-বিভাজনের মত, সমাজ যতই আরো ধনী হয় তিনি সঠিক ভাবেই ‘সমাজ’ কথাটি ব্যবহার করছেন মূলধন, ভূ-সম্পত্তি ও তাদের রাষ্ট্রকে বোঝতে, হাতের শ্রম ও মাথার শ্রমের মধ্যে এম বিভাজন[৯] আরো প্রকট হয়ে উঠে। অন্যান্য প্রত্যেক শ্রম-বিভাজনের মত এই শ্রম বিভাজনও অতীতের ফল ও ভবিষ্যতের হেতু। তা হলে সরকারের পক্ষে কি উচিত হবে এই শ্রম-বিভাগের বিরুদ্ধে কাজ করা এবং তার স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করা? তার পক্ষে কি উচিত হবে বিভাজন ও পৃথগীভবনের জন্য উন্মুখ এমন দুই শ্রেণীর এমকে গুলিয়ে ফেলা ও মিলিয়ে দেবার কাজ সরাসরি অর্থের একটি অংশকে ব্যয় করা?[১০]
এমন কি সমগ্রভাবে সমাজগত এম-বিভাজন থেকেও দেহ ও মনের কিছুটা পঙ্গুতা অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু যেহেতু ম্যানুফ্যাকচার শ্রমের বিভিন্ন শাখার এই পৃথগীভবনকে আরো অনেকটা এগিয়ে নিয়ে যায় এবং তার উপরে আবার, তার অদ্ভুত বিভাজনের দ্বারা ব্যক্তিকে তার জীবনের একেবারে মূলে আক্রমণ করে, সেহেতু ম্যানুফ্যাকচারই সর্বপ্রথম শিল্পগত ব্যাধি-বিজ্ঞানের জন্য মালমশলার যোগান দেয় এবং তার সূচনা করে।[১১]
কোন মানুষকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করার অর্থ হচ্ছে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী করা, যদি সেই দণ্ড তার প্রাপ্য হয়; আর তাকে হত্যা করা যদি সেই দণ্ড তার প্রাপ্য না হয়।…… শ্রমের বিভাগীকরণের অর্থ হল একটি জনসমষ্টির হত্যাকাণ্ড।[১২]
শ্রম-বিভাগের উপরে ভিত্তিশীল সহযোগিতার, ভাষান্তরে ম্যানুফ্যাকচারের, সূচনা হয় স্ততঃস্ফূর্ত সংগঠন হিসাবে। যখন তা কিছুটা সঙ্গতি ও বিস্তৃতি লাভ করে, তখনি তা হয়ে ওঠে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের নিয়মিত প্রণালীবদ্ধ রূপ। সঠিক ভাবে যাকে ম্যানুফ্যাকচার বলে অভিহিত করা যায়, সেই ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসূচক শ্রম-বিভাগ কিভাবে প্রথমে প্রথমে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, যেন অভিনেতাদের নেপথ্যে, সর্বশ্রেষ্ঠ উপযোজিত রূপটি অর্জন করে এবং পরে, গিডের অন্তর্গত হস্তশিল্পগুলির মত, এই নবলব্ধ রূপটিকে আঁকড়ে রাখবার চেষ্টা করে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী তা ধরে রাখতে ইতস্ততঃ সাফল্য লাভ করে, ইতিহাস তা তুলে ধরে। খুটিনাটি ব্যাপার ছাড়া, এই রূপটিতে কোনো পরিবর্তন সম্পূর্ণ ভাবেই ঘটে থাকে শ্রমের উপকরণে কোন বিপ্লবের ফলে। যেখনেই আধুনিক ম্যানুফ্যাকচারের উদ্ভব ঘটে—আমি এখানে মেশিনারি ভিত্তিক আধুনিক শিল্পের কথা বলছিনা-সেখানেই তা disjecta member poetae-কে প্রস্তুত অবস্থায় হাতের কাছে পায়, কেবল যেন তারা একত্রে সন্নিবিষ্ট হবার জন্যই অপেক্ষা করছে, যেমন বড় বড় শহরগুলিতে বস্ত্র-ম্যানুফ্যাকচারের ক্ষেত্রে; আর নয়তো, কোন হস্তশিল্পের (যেমন, বই-বাঁধাইয়ের) বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব একান্ত ভাবেই বিশেষ বিশেষ মানুষের উপরে সরলভাবে ন্যস্ত করে সহজেই শ্রম বিভাজনের নীতিকে প্রয়োগ করতে পারে। এই ধরনের ক্ষেত্রগুলিতে বিভিন্ন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক সংখ্যাগুলির মধ্যকার অনুপাত নির্ধারণ করার জন্য এক সপ্তাহের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট।[১৩]
