.
পঞ্চম পরিচ্ছেদ — ম্যানুফ্যাকচারের গনতান্ত্রিক চরিত্র।
যেমন সাধারণ ভাবে সহযোগের, তেমনি বিশেষ ভাবে ম্যানুফ্যাকচারের, স্বাভাবিক সূচনা-বিন্দু হচ্ছে একজন ধনিকের নিয়ন্ত্রণাধীনে বর্ধিত-সংখ্যক শ্রমিকের অবস্থান। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারে শ্রম-বিভাগ শ্রমিকদের এই সংখ্যাবৃদ্ধিকে পরিণত করে একটি কৃৎকৌশল গত প্রয়োজনে। কোন এক নির্দিষ্ট ধনিক ন্যূনতম কতসংখ্যক শ্রমিককে নিয়োগ করতে বাধ্য, তা এখানে পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত শ্রম-বিভাজনের দ্বারা নির্ধারিত। অন্য দিকে, আরো শ্রম-বিভাজনের সুবিধা পাওয়া যায় কেবল শ্রমিকদের আরো সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটিয়ে এবং তা করা যেতে পারে কেবল বিভিন্ন প্ৰত্যংশ শ্রমিক-গোষ্ঠীর বিবিধ গুণিতক যোগ দিয়ে। কিন্তু বিনিয়োজিত মূলধনের অস্থির অংশের বৃদ্ধি করলে তার স্থির অংশেরও বৃদ্ধিসাধন জরুরি হয়ে পড়ে—যেমন, কর্মশালা, উপকরণ ইত্যাদিতে এবং বিশেষ করে, কাচামালে, যার দরকার পড়ে শ্রমিকদের সংখ্যার চেয়েও তাড়াতাড়ি। একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রমের দ্বারা ব্যবহৃত কঁচামালের পরিমাণ একই অনুপাতে বাড়ে-যে অনুপাতে বাড়ে শ্রম-বিভাজনের ফলে ঐ শ্রমের উৎপাদন-ক্ষমতা। সুতরাং ম্যানুফ্যাকচারের নিজস্ব প্রকৃতির উপরেই প্রতিষ্ঠিত এটা একটা নিয়ম যে, প্রত্যেক ধনিকের হাতে যে ন্যূনতম পরিমাণ মূলধন থাকতে বাধ্য, তা অবশ্যই বেড়ে যেতে থাকবে। অন্য ভাবে বলা যায়, উৎপাদনের ও জীবনধারণের সামাজিক উপায়সমূহের মূলধনে রূপান্তরণ অবশ্যই সম্প্রসারিত হতে থাকবে।[১]
যেমন সরল সহযোগে তেমন ম্যানুফ্যাকচারেও যৌথ কর্মব্যবস্থাটি মূলধনের অস্তিত্বের একটি রূপ। বহুসংখ্যক প্রত্যংশ শ্রমিক নিয়ে গঠিত ব্যবস্থার মালিক হচ্ছে ধনিক। সুতরাং শ্রমিকদের সংযোজন থেকে যে উৎপাদন-ক্ষমতার উদ্ভব হয়, তা প্রতিভাত হয় মূলধনের উৎপাদিত ক্ষমতা বলে। সঠিক ম্যানুফ্যাকচার যে কেবল প্রাক্তন স্বাধীন শ্রমিককে মূলধনের শাসন ও হুকুমতের অধীনস্থ করে, তাই নয়, উপরন্তু তা শ্রমিকদের নিজেদের মধ্যেই একটি ক্রমোচ্চ-স্বরতন্ত্র প্রবর্তন করে। যেখানে সরল সহযোগ ব্যক্তির কর্মপদ্ধতিকে প্রধানতঃ অপরিবর্তিত রাখে, ম্যানুফ্যাকচার তার কর্মপদ্ধতিতে আদ্যন্ত বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয় এবং শ্রমশক্তিকে একেবারে তার মূল ধরে টান দেয়। সুবিপুলসংখ্যক উৎপাদন শক্তি ও প্রবৃত্তি বিনষ্ট করে তার উপরে এক প্রত্যংশ-কর্মপটুতা সবলে চাপিয়ে দিয়ে শ্রমিককে তা পর্যবসিত করে একটি বিকলাঙ্গ কিম্ভুত সত্তায়, ঠিক যেমন লা প্লাটা যুক্তরাষ্ট্রের লোকেরা কেবল তার চামড়া বা চর্বির জন্য একটা গোটা পশুকেই হত্যা করে। প্রত্যংশ কাজটি যে কেবল বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়, কেবল তাই নয়, স্বয়ং সেই ব্যক্তিটিকেই পরিণত করা হয় একটি ভগ্নাংশিক কাজের স্বয়ংক্রিয় মোটরে[২] এবং, মেনিনিয়াস অ্যাগ্রিপ্পার সেই আজগুবি গল্পটি, যাতে মানুষকে পরিণত করা হয়েছে তারই দেহের একটি অংশ বিশেষে, সেটি বাস্তবে রূপ পরিগ্রহ করে।[৩] যদি, প্রথমে শ্রমিক তার শ্রমশক্তির মূলধনের কাছে বিক্রয় করে কারণ। পণ্য-উৎপাদনের বাস্তব উপায়সমূহ তার হাতে নেই, তবে এখন তার হাতে নেই, তবে এখন তার নিজেরই শ্রমশক্তি কাজ করতে অস্বীকার করে, যদি না তা মূলধনের কাছে বিক্রীত হয়। বিক্রয়ের পরে সেই শ্রমশক্তি এখন কার্যকরী করা যায় এমন একটি পরিবেশে, যা কেবল ধনিকের কারখানাতেই বিদ্যমান। প্রকৃতিগত ভাবেই কোন কিছু স্বাধীন ভাবে করার অনুপযুক্ত, ম্যানুফ্যাকচারের অন্তর্গত শ্রমিক উৎপাদনশীল তৎপরতার বিকাশ ঘটাতে পারে কেবল ধনিকের কর্মশালার একটি উপাঙ্গ হিসাবে।[৪] যেমন মনোনীত ব্যক্তিবর্গ তাদের অবয়বে জিহোবর স্বাক্ষর বহন করে, তেমনি শ্রম-বিভাগ ম্যানুফ্যাকচারে কর্মনিযুক্ত শ্রমিককে চিহ্নিত করে দেয় মূলধনের-সম্পত্তি বলে।
যেমন করে বন্য মানুষ সমগ্র যুদ্ধকৌশলকে পরিণত করে তার ব্যক্তিগত চাতুর্য প্রদর্শনের ক্রিয়াকাণ্ডে, ঠিক তেমন করেই ক্ষুদ্র চাষী ও হস্তশিল্পী, তা যত সামান্য মাত্রায়ই হোক না কেন, প্রয়োগ করে তার জ্ঞান বিবেচনা ও ইচ্ছাশক্তি—এখন সেই গুণগুলির প্রয়োজন হয় কেবল সমগ্রভাবে কর্মশালাটির জন্য। উৎপাদনে বুদ্ধিমত্তার বিস্তার ঘটে একদিকে, কেননা তার বিনাশ ঘটে বাকি সকল দিকে। প্ৰত্যংশ শ্রমিকেরা যা হারায়, তা গিয়ে পুঞ্জীভূত হয় মূলধনে, যে তাদের নিয়োগ করে।[৫] ম্যানুফ্যাকচারে শ্রম বিভাজনের একটা ফল এই যে, শ্রমিককে এনে দাড় করিয়ে দেওয়া হয় অপর একজনের সম্পত্তি-স্বরূপ এবং একটি কর্তৃত্বশীল ক্ষমতা-স্বরূপ বাস্তব উৎপাদন প্রক্রিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক শজিসমূহের মুখোমুখি। এই বিচ্ছেদ শুরু হয় সরল সহযোগ থেকে, যেখানে ধনিক, একক শ্রমিকের কাছে সম্মিলিত শ্রমের একত্ব ও ইচ্ছাশক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। এর বিকাশ ঘটে ম্যানুফ্যাকচারে, যা শ্রমিককে কেটে পরিণত করে একজন প্রত্যংশ শ্রমিকে। এটা সম্পূর্ণতা পায় আধুনিক শিল্পে, যা বিজ্ঞানকে করে তোলে শ্রম থেকে স্বতন্ত্র একটি উৎপাদনশীল শক্তি এবং তাকে নিয়োগ করে মূলধনের সেবায়।
