দ্বিতীয় ছকে, ‘খ’ এ, প্ৰথমে ছকের চেয়ে আরো যথাযথভাবে পণ্যের মূল্যের সঙ্গে তার ব্যবহার-মূল্যের পার্থক্য দেখানো হয়েছে সর্বপ্ৰকার সম্ভাব্য আকারে, তার সমীকরণ হয়েছে ছিটের সঙ্গে, লৌহের সঙ্গে, চা-এর সঙ্গে, সংক্ষেপে, একমাত্র কোটের নিজের সঙ্গে ছাড়া বাকি সব কিছুর সঙ্গে। অথচ, ঐ সমস্ত পণ্যের মধ্যে সমভাবে বর্তমান মূল্যের সাধারণ প্ৰকাশ সরাসরি বর্জন করা হয়েছে; কারণ প্রত্যেকটি পণ্যের মূল্য-সমীকরণে অন্যান্য সমস্ত পণ্যই হাজির হচ্ছে কেবলমাত্র সমঅৰ্ঘ রূপে। গবাদি পশুর মত বিশেষ কোন শ্রমজাত দ্রব্যের সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের বিনিময় যখন আর ব্যতিক্রম হিসেবে নয়, নিয়ম হিসেবে ঘটতে থাকে, তখনি শুধু সর্বপ্রথম মূল্যের সম্প্রসারিত রূপ দেখা দেয়।
তৃতীয় এবং সর্বশেষ ছকে সমগ্র পণ্য জগতের মূল্য প্ৰকাশিত হয়েছে একটিমাত্র পণ্যের মাধ্যমে এবং শুধু এইকারণে ঐ পণ্যটিকে পৃথক করে রাখা হয়েছে; ছিট হল সেই পণ্য। ঐ সময় পণ্যের প্রত্যেকটির মূল্য ছিটের মূল্যের সমান বলে ছিট দিয়ে ঐ সমস্ত পণ্য-মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছে। ছিটের মূল্যের সমান হওয়ায়, প্ৰত্যেকটির পণ্যের মূল্যই এখন কেবলমাত্র সেই সেই বিশিষ্ট পণ্যের ব্যবহার-মূল্যের সঙ্গে নিজের পার্থক্য টানেনি, পার্থক্য টেনেছে সাধারণভাবে অন্য সমস্ত ব্যবহারমূল্যের সঙ্গেও এবং শুধু সেই কারণেই তা সমস্ত পণ্যের ভিতরকার সাধারণ সত্তা রূপে আত্মপ্রকাশ করছে। এই ছকের মধ্যে পণ্যসমূহ সর্বপ্রথম যথোচিতভাবে মূল্যরূপে পারস্পরিক সম্পর্কে স্থাপিত অথবা বিনিময় মূল্যের সাজে তাদের সজ্জিত করা হয়েছে।
আগেকার দুটো ছকে প্রত্যেকটি পণ্যের মূল্য একটিমাত্র পণ্যের অথবা বহু পণ্যের একটি রাশির মাধ্যমে প্ৰকাশ করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই প্ৰত্যেকটি পণ্যেরই যেন বিশেষ বিশেষ কাজ হল নিজ নিজ মূল্যের এক একটি সমার্ঘরূপ খুজে বের করা, এবং একাজ সে সম্পন্ন করছে অন্য কোন পণ্যের সাহায্য ব্যতিরেকে। অন্য পণ্যগুলির ভূমিকা হল নিস্ক্রিয়ভাবে তার মূল্যের সমার্ঘরূপ হিসেবে হাজির থাকা। ‘গ’ ছকে মূল্যের সাধারণ রূপটি আবির্ভূত হচ্ছে শুধুমাত্র সমগ্র পণ্য জগতের সমবেত ক্রিয়ার ফলে। কোন একটি পণ্য সাধারণভাবে সমস্ত পণ্যের মূল্য প্রকাশের কাজ করতে পারে শুধুমাত্র তখনি যখন অন্য সমস্ত পণ্য একযোগে তাদের নিজ নিজ মূল্য ঐ একই পণ্যের মাধ্যমে প্ৰকাশ করে, যে-কোন নতুন আর একটি পণ্যকেও ঐ একই পথ * অনুসরণ করতে হবে। সুতরাং একথা পরিষ্কার যে, যেহেতু পণ্য মূল্যের অস্তিত্বটাই হলো সামাজিক সত্তা, সেহেতু তা প্ৰকাশ করা যেতে পারে কেবলমাত্র তাদের সামগ্রিক সামাজিক সম্পর্কের সাহায্যেই। সুতরাং একথু ও সহজ্জসিদ্ধ যে তাদের মূল্যের। রূপটিকে অবশ্যই হতে হবে সামাজিকভাবে স্বীকৃত রূপ।।
সমস্ত পণ্য ছিটের সঙ্গে সমান করে দেখানোর ফলে এখন তারা কেবলমাত্র মূল্য হিসেবে সাধারণভাবে গুণগত সামাই প্ৰতিষ্ঠা করেনি, পরিমাণগতভাবে তারা এখন তুলনীয়। যেহেতু তাদের মূল্যের পরিমাণ ছিট নামক একটিমাত্র পণ্যের মাধ্যমে প্ৰকাশিত হচ্ছে, সেহেতু তার ফলে সমস্ত পণ্যেরই মূল্যের পরিমাণ পরস্পরের সমান হয়ে দাড়াচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ১০ পঃ চা = ২০ গজ ছিট এবং ৪০ পা: কফি = ২০ গজ ছিট; সুতরাং ১ ও পা: চা = ৪০ পা: কফি। ভাষান্তরে বলতে গেলে বলতে হয়, এক পা: কফির মধ্যে যত মূল্যের মর্মবস্তুর তথা শ্ৰম আছে, তার এক চতুর্থাংশ আছে ১পাঃ চা-এর ভিতর।
আপেক্ষিক মূল্য প্রকাশের সাধারণ ছকে সমগ্র পণ্য জগতেরই আপেক্ষিক মূল্য প্ৰকাশিত হচ্ছে একটিমাত্র পণ্যের মাধ্যমে এবং তার ফলে সেই একটি পণ্য, অন্য সমস্ত পণ্য থেকে স্বতন্ত্রভাবে তাদের পণ্যমূল্যের পরিচয় বহন করে সর্বজনীন সমার্ঘরূপে পরিণত হচ্ছে। ছিটের দেহরূপটি এখন অন্যান্য সমস্ত পণ্যের মূল্যের সাধারণ রূপ; কাজেই তার সঙ্গে এখন প্ৰত্যেক পণ্যের সরাসরি বিনিময় হতে পারে। ছিট নামক বস্তুটি এখন সর্বপ্রকার মনুষ্য-শ্রমের সাক্ষাৎ বিগ্রহ, গুটিপোকার মত শুয়ো থেকে প্ৰজাপতির স্তরে পরিণত। বস্ত্ৰ বয়ন একটি বিশেষ লোকের বিশেষ শ্ৰম, তার ফলে উৎপন্ন হচ্ছে একটি বিশেষ দ্রব্য, ছিটা। সেই বস্ত্ৰ বয়নের শ্রম এখন অন্যান্য সর্বপ্রকার শ্রমের সমার্ঘ বলে গণ্য হচ্ছে। মূল্যের সাধারণ রূপটি যে সমস্ত অসংখ্য সমীকরণের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসবে, সেই সব সমীকরণেই ছিটের মধ্যে অঙ্গীভূত শ্ৰম অন্যান্য সমস্ত পণ্যের ভিতরকার শ্রমের সমার্ঘ হয়ে দাড়াচ্ছে, তার ফলে বয়ন কার্যটি পরিণত হয়েছে নির্বিশেষ মনুষ্য শ্রমের সাধারণ বিগ্ৰহে। এইভাবে যে শ্রম দিয়ে পণ্যের মূল্য গঠিত হয় তার প্রত্যক্ষ প্রকৃতিটি এখন দৃশ্যমান হল, এখন তার পরিচয় কেবল নেতিবাচক রইল না, অর্থাৎ তা যে বিশেষ কোন এক প্রকারের শ্রম নয়, শুধু সেইটুকু জানার বদলে এখন জানা গেলো যে তা নির্বিশেষে শ্ৰম নামক একটি বস্তু।
সর্বপ্রকার শ্রমের যা নির্বিশেষে চরিত্র, অর্থাৎ যাকে বলে মানুষের শ্রমশক্তির ব্যয় শুধু তাই উঠল মূল্যের সাধারণ রূপদানের ভেতর দিয়ে। শ্রমের প্রকারভেদ গেল উঠে।
