যে কথা আমি আগেই বলেছি, একজন মালিক কতসংখ্যক শিক্ষানবিশ ও ঠিকা মজুর নিয়োগ করতে পারবে গিভের নিয়মকানুন তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া গিন্ড মাস্টার ধনিক হয়ে উঠতে পারেনি। তা ছাড়া, সে নিজে যে হস্তশিল্পের মালিক, সেখানে ছাড়া অন্যত্র সে তার ঠিকা-মজুরদের নিযুক্ত করতে পারত না। বণিকের মূলধনের প্রত্যেকটি অনুপ্রবেশকে গিল্ড প্রবল উদ্যমে প্রতিহত করত এবং কেবল এই ধরনের স্বাধীন মূলধনেরই সংস্পর্শে তারা আসত। বণিক প্রত্যেক ধরনের পণ্যই ক্রয় করতে পারত। কিন্তু শ্রমকে পণ্য হিসাবে ক্রয় করতে সে পারত না। কেবল হস্তশিল্প জাত দ্রব্যাদির কারবারি হিসাবেই তার অস্তিত্বকে মেনে নেওয়া হত। যদি ঘটনাক্রমে অধিকতর শ্রম-বিভাজনের প্রয়োজন দেখা দিত, তা হলে উপস্থিত গিম্ভগুলিই নিজেদেরকে বিভক্ত করে বিভিন্ন গিলডে পরিণত করত কিংবা পুরনন গিন্ডগুলির পাশাপাশি নোতুন গিল্ড প্রতিষ্ঠা করত; কিন্তু এসবই করা হত একটিমাত্র কর্মশালায় বিবিধ হস্তশিল্পে কেন্দ্রীভূত না করে। অতএব গিল্ড-সংগঠন হস্তশিল্পগুলিকে বিচ্ছিন্ন করে, স্বতন্ত্র করে ও পূর্ণাঙ্গ করে ম্যানুফ্যাকচারের অস্তিত্বের উপযোগী অবস্থাবলী সৃষ্টি করতে যত সাহায্যই করে থাক না কেন, তা কর্মশালা থেকে শ্রম-বিভাগকে বাদ দিয়ে রাখত। মোটামুটি ভাবে, শামুক যেমন তার খোলসটির সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত থাকে, তেমনি শ্রমিকও তার উৎপাদন-উপকরণের সঙ্গে যুক্ত থাকত এবং এই কারণেই ম্যানুফ্যাকচারের প্রধান ভিত্তিটি ছিল ‘অনুপস্থিত-যে ভিত্তিটি হচ্ছে উৎপাদনের উপায় উপকরণ থেকে শ্রমিকদের বিচ্ছেদ এবং এই উপায়-উপকরণের মূলধনে রূপান্তরণ।
যেখানে ব্যাপক সমাজে শ্রম-বিভাগ তা সে পণ্য-বিনিময়ের দ্বারাই সংঘটিত হোক বা অন্য কোন ভাবেই সংঘটিত হোক—সমাজের সবচেয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক গঠনে অভিন্ন ভাবে উপস্থিত, সেখানে ম্যানুফ্যাকচার-প্রবর্তিত শ্রম-বিভাগ একমাত্র ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতিরই-সৃষ্টি।
————
১. শ্রম-বিভাজন অগ্রসর হয় সেই বিভাজন থেকে বহুল পরিমাণে ভিন্নতর বৃত্তি বিভাজন থেকে, যেখানে কয়েকজন শ্রমিক নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় একটি অভিন্ন দ্রব্যের উৎপাদন, যেমন ম্যানুফ্যাকচার-ব্যবস্থায়। (স্টর্চ : “কোর্স অব পলিটিক্যাল ইকনমি”, ফরাসী সংস্করণ, পৃঃ ১৭৩)। “Nous rencontrons chez les peuples parvenus a un certain degre de civilisation trois genres de divisions d’industrie : la premiere, que nous nommerons generale, amene la distinction des producteurs en agriculteurs, manufacturiers et comm ercants, elle se rapporte aux trois principales branches d’industrie nationale; la seconde, qu’on pourrait appeler speciale, est la division de chaque genre d’industrie en especes… la troisieme division d’industrie, celle enfin qu’on devrait qualifier de division de la besogne ou de travail proprement dit, est celle qui s’etablit dans les arts et les metiers separes… qui ‘soetablit dans la plupart des manufactures et des ateliers.” (Skarbek, Theorie des richesses sociales vol. I 2nd, edition. Paris, 1839. pp. 84, 85.)
২. তৃতীয় সংস্করণের টীকা-পরবর্তীকালে মানুষের আদিম অবস্থা সম্পর্কে অনুসন্ধানের ফলে গ্রন্থকার এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পরিবার প্রথমে গোষ্ঠীতে বিকাশ লাভ করেনি, বরং গোষ্ঠীই হল মানবিক সংগঠনের রক্ত-সম্পর্কের উপরে প্রতিষ্ঠিত, আদিম ও স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে বিকশিত রূপ, এবং গোষ্ঠীগত বন্ধনের প্রাথমিক ক্রমবর্ধমান শিথিলতা থেকেই পরবর্তী কালে পরিবারের বহু এবং বিবিধ রূপের বিকাশ ঘটে।-এফ, এঙ্গেলস।
৩. স্যার জেমস স্টুয়ার্ট হলেন সেই অর্থনীতিবিদ, যিনি সবচেয়ে ভালভাবে এই বিষয়টি আলোচনা করেছেন। “ওয়েথ, অব নেশনস থেকে দশ বছর আগে প্রকাশিত হলেও, তার বইটি আজও পর্যন্ত কত কম পরিচিত, তা বোঝা যায় এই ঘটনাটি থেকে যে ম্যালথাসের ভক্তরা পর্যন্ত জানেন না যে, তার বইয়ের প্রথম সংস্করণটিতে, একমাত্র বাক্যালংকার ছাড়া এমন আর কিছু নেই যা প্রধানতঃ স্টুয়ার্ট থেকে এবং কিছু পরিমাণে ওয়ালেস এবং টাউনসে ণ্ড থেকে উদ্ধত অনুচ্ছেদ নয়।
৪. জনসংখ্যার এমন একটা বিশেষ মাত্রার ঘনত্ব আছে, যা সামাজিক আদান প্রদান এবং সেই শক্তি-সম্মিলন, যার দ্বারা শ্রমের উৎপন্ন বৃদ্ধি পায়—উভয়ের পক্ষে সুবিধাজনক। জেমস মিল, “এলিমেন্টস অব পলিটিক্যাল ইকনমি”, পৃঃ ৫০)। “শ্রমিকদের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পায়, সমাজের উৎপাদন ক্ষমতা তত বর্ধিত হয় সেই বৃদ্ধি সশ্রম-বিভাগের ফলসমূহের চক্রবৃদ্ধি হারে।” (থমাস হজস্কিন : “লেবর ডিফেন্ডেড এগেইনস্ট দি ক্লেইমস অব ক্যাপিট্যাল”, পৃঃ ১২৫, ১২৬)।
৫. ১৮৬১ সালের পরে তুলার বিপুল চাহিদার ফলে, ভারতের কয়েকটি ঘন বসতিপূর্ণ অঞ্চলে চালের চাষ কমিয়ে তুলার চাষ বাড়ানো হয়েছিল। পরিণামে সেখানে স্থানীয় ভাবে দুর্ভিক্ষের প্রাদুর্ভাব ঘটল; যোগাযোগের অব্যবস্থার দরুণ অন্য অঞ্চল থেকে দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলে চাল পাঠানো সম্ভব হয়নি।
