সেই একই বুর্জোয়া মানস, যা কর্মশালায় শ্রম-বিভাগের একটি আংশিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আজীবন সংযোজনের এবং মূলধনের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের গুণকীর্তন করে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সংগঠন হিসাবে, হঁ্যা, ঠিক সেই একই বুর্জোয়া মানসই আবার উৎপাদন-প্রক্রিয়ার সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মনের জন্য প্রত্যেকটি পচেষ্টাকে সমান তেজে ধিক্কার জানায় সম্পত্তির অধিকার এবং ব্যক্তিগত ধনিকের প্রবৃত্তির স্বাধীনতা ও অবাধ বিকাশের মত পবিত্র অধিকারগুলির উপরে অন্যায় অনুপ্রবেশ হিসাবে। এটা খুবই বৈশিষ্ট্যসূচক যে, সমাজের শ্রমের একটি সাধারণ সংগঠন গড়ে তুললে তা সমগ্র সমাজকে পর্যবসিত করবে একটি বিশাল কারখানায়-এর চেয়ে বেশি সাংঘাতিক কোন যুক্তি ছাড়া, উক্ত শ্রম-সংগঠনের বিরুদ্ধে কারখানা-ব্যবস্থার উৎসাহী উকিলদের আর কিছুই বলার নেই।
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা-সমন্বিত কোন সমাজে সামাজিক শ্রম-বিভাজনে অরাজকতা এবং কর্মশালার অভ্যন্তরস্থ শ্রম-বিভাজনে অরাজকতা যেমন একটি অপরটির পারস্পরিক শত, তেমন সমাজের সেই প্রারম্ভিক পর্যায়গুলিতেযখন বৃত্তি-বিভাজন প্রথমে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে উদ্ভূত, পরে স্ফটিকায়িত এবং শেষ পর্যন্ত আইন-প্রণয়নের মাধ্যমে স্থায়ীকৃত হচ্ছিল, তখন আমরা দেখি, একদিকে, একটি অনুমোদিত, কর্তৃত্বসমন্বিত পরিকল্পনা-অনুযায়ী শ্রম-সংগঠনের নমুনা এবং অন্য দিকে কর্মশালার মধ্যে শ্রম-বিভাজনের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি কিংবা, খুব বেশি হলে, তার এক বামনাকৃতি বা বিক্ষিপ্ত আপতিক বিকাশ। [১২]
ঐ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও অতি প্রাচীন ভারতীয় জনসমাজগুলি যাদের মধ্যে কতকগুলি টিকে আছে আজও পর্যন্ত–সেগুলির ভিত্তি হল জমির উপরে যৌথ অধিকার, কৃষি ও হস্তশিল্পের সংমিশ্রণ ও অপরিবর্তনীয় এক শ্রম-বিভাজনযে শ্রম-বিভাজন যখনি এক নোতুন জনসমাজের সূচনা হত, তখনি কাজ করত হাতের কাছে প্রস্তুত একটি দৃঢ়বদ্ধ পরিকল্পনা ও ছক হিসাবে। ১০০ থেকে কয়েক সহস্র একর জমির অধিকারী এই জাতীয় প্রত্যেকটি জনসমাজ হল এক-একটি অখণ্ড সমগ্র, যা তার প্রয়োজনীয় সব কিছুই উৎপাদন করে। উৎপাদিত পণ্যসম্ভারের প্রধান অংশটাই স্বয়ং এই জনসমাজটিরই প্রত্যক্ষ ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট। সুতরাং এখানে উৎপাদন, পণ্য-বিনিময়ের দ্বারা সমগ্র ভাবে ভারতীয় সমাজে যে শ্রম-বিভাজন সংঘটিত হয়েছে, তা থেকে নিরপেক্ষ। কেবল উত্তটাই এখানে পণ্য হয়ে ওঠে এবং এমনকি তারও একটা অংশ যে পর্যন্ত তা রাষ্ট্রের হাতে না পৌছাচ্ছে, সে পর্যন্ত নয়—যার হাতে স্মরণাতীত কাল থেকে এই উৎপন্ন দ্রব্যাদির একটি অংশ খাজনার আকারে গিয়ে জমা পড়ে আসছে। এই সমস্ত জনসমাজের গড়ন ভারতের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন রকমের। সরলতম রূপের জনসমাজ গুলির জমির চাষ হয় যৌথ ভাবে এবং তার উৎপন্ন ফসল বন্টিত হয় সদস্যদের মধ্যে। একই সময়ে প্রত্যেকটি পরিবারেই সুতো কাটা ও কাপড় বোনা চলে গৌণ শিল্প হিসাবে। এক ও অভিন্ন কাজে ব্যাপৃত জনসমষ্টির পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই “মুখ্য অধিবাসী”-কে যে একাধারে বিচারক, সান্ত্রী ও তহশিলদার, দেখতে পাই। হিসাবরক্ষককে যে কৃষিকাজের হিসাব রাখে এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাবৎ বিষয় লিপিবদ্ধ করে, অন্য একজন কর্মচারীকে যে অপরাধীদের অভিযুক্ত করে, ঐ গ্রাম অতিক্রমকারী বহিরাগতদের রক্ষা করে এবং পরবর্তী গ্রাম পর্যন্ত তাদের এগিয়ে দিয়ে আসে, সীমানা-প্রহরী যে প্রতিবেশী জনসমাজগুলির বিরুদ্ধে সীমানা পাহারা দেয়; জল-বণ্টনকারী যে সেচের কাজের জন্য যৌথ জলাশয় থেকে জল বেঁটে দেয়; ব্রাহ্মণ যে ধর্মানুষ্ঠানগুলি পরিচালনা করে; শিক্ষক যে বালির উপরে ছেলেদের লিখতে পড়তে শেখায়; পঞ্জিকাকার বা গণৎকার যে বীজ বোনা ও ফসল কাটার শুভাশুভ দিনগুলি জানিয়ে দেয়; একজন কর্মকার ও একজন সূত্রধর যারা কৃষি-উপকরণগুলি তৈরি ও মেরামত করে, কুম্ভকার যে গ্রামের প্রয়োজনীয় হাঁড়ি-কলসি ইত্যাদি তৈরি করে, একজন রৌপ্যকার কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে রৌপ্যকারের বদলে একজন কবি; কোন কোন জনসমাজে বিদ্যালয়-শিক্ষক। এই এক ডজন লোকের ভরণ-পোষণ চলে গোটা জন সমাজটির খরচে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে খালি জমিতে পুরনো ধাঁচেই একটি নোতুন জনসমাজের সূত্রপাত হয়। সমগ্র ব্যবস্থাটিতেই প্রকাশ পায় একটি শ্রম-বিভাগ কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারে যে ধরনের শ্রম-বিভাগ থাকে, এখানে তা অসম্ভব, যেহেতু কর্মকার, সূত্রধর এখানে পায় একটি অপরিবর্তনশীল বাজার এবং, বড় জোর, গ্রামগুলির আয়তন অনুসারে সেখানে দেখা দেয় একজনের বদলে প্রত্যেক ধরণের দু-তিন জন করে।[১৩] যে আইন জনসমাজ শ্রম-বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা প্রকৃতির নিয়মের মতই অপ্রতি রোধ্য কতৃত্ব নিয়ে কাজ করে; একই সময়ে প্রত্যেক ব্যক্তিগত কারিগর, কর্মকার, বা সূত্রধর ইত্যাদি তার কর্মশালায় তার হস্তশিল্পের সব কটি কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে চিরাচরিত প্রথায় কোনো উপরওয়ালা কতৃপক্ষকে না মান্য করেই। এই সমস্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ জনসমাজ, যেগুলি নিরন্তর নিজেদেরকে একই আকারে পুনরুৎপাদন করে চলে এবং যদি কখনো কোন দুর্ঘটনায় কোনটি ধ্বংস হয়ে যায়, তা হলে আবার ঐ একই জায়গায় একই নামে যাদের উদ্ভব ঘটে।[১৪] এই জনসমাজগুলির উৎপাদন-সংগঠনের সরলতা এশীয় সমাজ-সমূহের অপরিবর্তনীয়তার চাবিকাঠি যোগায়—যে অপরিবর্তনশীলতা এশীয় রাষ্ট্রগুলির নিরন্তর ভাঙন ও পুনর্গঠনের এবং বংশানুক্রমের অবিচ্ছিন্ন পবির্তন প্রবাহের তুলনায় এত জাল মান। রাজনৈতিক আকাশে ঝড়-ঝকা সত্ত্বেও সমাজের অর্থনৈতিক উপাদানগুলি থাকে অনাহত।
