যাই হোক, এই ঘনত্ব কমবেশি আপেক্ষিক। মোগাযোগের সুব্যবস্থা রয়েছে এমন একটি আপেক্ষিক ভাবে জনবিরল দেশ যোগাযোগের সুব্যবস্থা নাই এমন একটি অধিকতর জনবহুল দেশের তুলনায় ঘনতর জনবসতির অধিকারী; এবং এই অর্থে, দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায় যে, ভারতের তুলনায় আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলের জনবসতি ঘনতর।[৫]
যেহেতু পণ্যের উৎপাদন ও সঞ্চলন হচ্ছে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির পূর্বশর্ত, সেহেতু ম্যানুফ্যাকচারে শ্রম-বিভাজন পূর্বাহ্নেই একটি বিশেষ মাত্রায় বিকশিত হয়ে গিয়েছে। বিপরীত ভাবে বলা যায়, পূর্ববর্তী শ্রম-বিভাজন পরবর্তী শ্রম-বিভাজনের বিকাশ ও বৃদ্ধি ঘটায়। সেই একই সময়ে, শ্রম-উপকরণসমূহের সঙ্গে সঙ্গে, যেসব শিল্প এইসব উপকরণ উৎপাদন করে সেগুলিও আরো বেশি করে পৃথগীভূত হয়।[৬] ম্যানুফ্যাকচার যদি এমন কোন শিল্পের উপরে আধিপত্য বিস্তার করে, যে-শিল্প পূর্বে প্রধান বা অধীন হিসাবে অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে সংযোগে এবং একজন উৎপাদনকারকের পরিচালনায় পরিচালিত হত, তা হলে এই শিল্পগুলি তৎক্ষণাৎ তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নেয় এবং স্বতন্ত্র হয়ে যায়। ম্যানুফ্যাকচার যদি কোন পণ্যের উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় কোন একটি পর্যায়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা করে, তা হলে তার অন্যান্য পর্যায়গুলি ভিন্ন ভিন্ন স্বতন্ত্র শিল্পে রূপান্তরিত হয়ে যায়। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, যেখানে পূর্ণ-প্রস্তুত জিনিসটি কেবল একত্র-সংযোজিত কয়েকটি অংশ মাত্র, সেখানে প্রত্যংশ কর্মকাণ্ডগুলি নিজেদেরকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে বিবিধ, বিচ্ছিন্ন, বিশুদ্ধ হস্তশিল্প হিসাবে। ম্যানুফ্যাকচারে এম-বিভাজনকে আরো নিখুৎ ভাবে কার্যকরী করে তোলার জন্য, উৎপাদনের একটি একক শাখা তার কাচামালের বিভিন্নতা অনুযায়ী কিংবা একই কাঁচামাল যে-সমস্ত বিভিন্ন আকার ধারণ করতে পারে, তদনুযায়ী অসংখ্য, এবং কিছুটা মাত্রায় সম্পূর্ণ নোতুন ম্যানুফ্যাকচারে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। তদনুযায়ী, আঠারো শতকের প্রথমার্ধে একমাত্র ফ্রান্সেই ১০০ বিভিন্ন ধরনের রেশম-সামগ্রী বোনা হত এবং অ্যাভিগননে আইন ছিল যে, প্রত্যেক শিক্ষানবিশ আত্মনিয়োগ করবে কেবল একধরনের কারিগরি কাজে এবং সে কোনমতেই একাধিক ধরনের সামগ্রী প্রস্তুত করার কাজ শিখবে না। শ্রমের আঞ্চলিক বিভাজন উৎপাদনের বিশেষ বিশেষ শাখাকে একটি দেশের বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে নিবদ্ধ করে এবং এই কাজে ম্যানুফ্যাকচার থেকে প্রেরণা লাভ করে, যার কাজই হল সব রকমের বিশেষ সুবিধার সুযোগ গ্রহণ।[৭] ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা ও বিশ্বের বাজারসমূহের উন্মোচন যেদুটি ব্যাপারই ম্যানুফ্যাকচার-যুগের অস্তিত্বের সাধারণ শর্তাবলীর অন্তভুক্ত-সমাজে শ্রম-বিভাজনের বিকাশ ঘটানোর পক্ষে সমৃদ্ধ উপাদান যোগায়। শ্রম-বিভাজন কিভাবে কেবল অর্থ নৈতিক ক্ষেত্রটিই নয়, পরন্তু বাকি সমস্ত সামাজিক ক্ষেত্রেও আত্মবিস্তার করে এবং সর্বত্রই ভিত্তি স্থাপন করে মানুষের বিশেষীকরণ ও বিন্যাস-সাধনের সর্বব্যাপক ব্যবস্থাটির যা মানুষের সমস্ত কর্মশক্তির বিনিময়ে কেবল একটি মাত্র শক্তির বিকাশ ঘটায়, যে সম্পর্কে অ্যাডাম স্মিথের প্রভু এ ফার্গুসন এই বলে চেঁচিয়ে উঠতে বাধ্য হয়েছিলেন, “আমরা গড়ে তুলছি হেলটদের একটি জাতি; আমাদের এখানে নেই কোনো স্বাধীন নাগরিক”—সেই ব্যবস্থাটি সম্পর্কে আলোচনা চালিয়ে যাবার অবকাশ এখানে নেই।[৮]
কিন্তু তাদের মধ্যে অসংখ্য সাদৃশ্য ও সংযোগ থাকা সত্ত্বেও সমাজের অভ্যন্তরস্থ শ্রম-বিভাগ কেবল মাত্রাগত ভাবেই নয়, প্রকারগত ভাবেও পরস্পর থেকে ভিন্ন। যেখানে সংশ্লিষ্ট শিল্পটির বিভিন্ন শাখাকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি অদৃশ্য বন্ধন বিদ্যমান থাকে, কেবল সেখানেই সাদৃশ্যটি সবচেয়ে তর্কাতীত ভাবে প্রতিভাত হয়। যেমন, গো-পালক কাচা চামড়া উৎপাদন করে, চর্মকার সেই চামড়াকে পাকা চামড়ায় পরিণত করে, পাদুকাকার তা দিয়ে জুতো তৈরি করে। এখানে তারা প্রত্যেকে যে যা করছে, তাই হল চূড়ান্ত রূপটির দিকে একটি করে পদক্ষেপ, যা হবে তাদের সকলের সংযোজিত শ্রমের ফল। তা ছাড়া রয়েছে বিবিধ শিল্প যা গো-পালককে, চর্মকারকে, পাদুকাকারকে সরবরাহ করে উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ। এখন অ্যাডাম স্মিথের সঙ্গে আমরাও কল্পনা করতে পারি যে, উল্লিখিত সামাজিক শ্রম-বিভাগ এবং ম্যানুফ্যাকচার-গত শ্রম-বিভাগের মধ্যে পার্থক্যটি নিছক বিষয়ীগত, যার অস্তিত্ব কেবল পর্যবেক্ষকের চোখে, যে একটি ম্যানুফ্যাকচারে এক নজরে দেখতে পায় সমস্ত কয়টি কর্মকাণ্ডকে ঘটনাস্থলে সম্পাদিত হতে, অন্য দিকে, উপরে বর্ণিত দষ্টান্তটিতে সংশ্লিষ্ট কাজটি বিরাট বিরাট এলাকায় ছড়িয়ে থাকায় এবং প্রত্যেকটি শ্রমশাখায় বহুসংখ্যক লোক নিযুক্ত থাকায় ব্যাপারটা থেকে যায় অন্তরালে।[৯] কিন্তু কী সেই ব্যাপার, যা গো-পালক চর্মকার ও পাদুকাকারের ভিন্ন ভিন্ন শ্রমের মধ্যে বন্ধন হিসাবে কাজ করে? সেই ঘটনাটি হচ্ছে এই যে তাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ উৎপন্ন সামগ্রীই হল পণ্য। অন্যদিকে ম্যানুফ্যাকচার ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য কি? সেই বৈশিষ্ট্যটি হল এই ঘটনা যে, প্রত্যংশ শ্রমিক কোন পণ্যই উৎপাদন করে না।[১০] সমস্ত প্রত্যংশ শ্রমিকের যৌথ উৎপন্ন ফলটিই হচ্ছে কেবল পণ্য।[১১] সমাজে এম-বিভাগ সংঘটিত হয় শিল্পের বিভিন্ন শাখায় উৎপন্ন দ্রব্যাদির বিক্রয় ও ক্রয়ের দ্বারা; অন্য দিকে, একটি কর্মশালায় প্রত্যংশ কর্মকাণ্ডগুলির মধ্যে যোগটির হেতু হচ্ছে একই ধনিকের কাছে অনেক শ্রমিকের শ্রমশক্তি বিক্রয়ের ঘটনাটি, যে-ধনিক সেই শক্তিকে প্রয়োগ করে। সংযোজিত শ্রমশক্তি হিসাবে। কর্মশালায় শ্রম-বিভাগের তাৎপর্য হচ্ছে একজন খনিকের হাতে উৎপাদনের উপায়সমূহের কেন্দ্রীভবন; অন্য দিকে, সমাজে এম-বিভাগের তাৎপর্য হচ্ছে বহুসংখ্যক স্বতন্ত্র পণ্যোৎপাদনকারীর মধ্যে তাদের বিক্ষিপ্ত বিকেন্দ্রীভূত অবস্থান। কর্মশালার ভিতরে যখন আনুপাতিকতার লৌহ বিধান নির্দিষ্টসংখ্যক শ্রমিককে নির্দিষ্ট কাজেকর্মে আবদ্ধ রাখে, তখন কর্মশালার বাইরেকার সমাজে শিল্পের বিভিন্ন শাখার মধ্যে উৎপাদনকারীদের ও তাদের উৎপাদনের উপায়সমূহের বিলিবণ্টনে আকস্মিকতা ও খেয়ালখুশি অবাধে কাজ করে। এটা ঠিক যে, উৎপাদনের বিভিন্ন ক্ষেত্র নিরন্তর একটা ভারসাম্যের দিকে যাবার প্রবণতা দেখায়, কেননা যখন, একদিকে, একটি পণ্যের প্রত্যেকটি উৎপাদনকারী একটি বিশেষ সামাজিক অভাব পূরণের জন্য একটি ব্যবহার-মূল্য উৎপাদন করতে বাধ্য এবং যখন ঐ সমস্ত অভাবের পরিমাপ মাত্রাগত ভাবে বিভিন্ন, তখন সেখানে থাকে এমন একটি অন্তলীন সম্পর্ক, যা তাদের অনুপাতকে একটি নিয়মিত প্রণালীর মধ্যে স্থিত করে দেয়। অন্য দিকে, পণ্যের মূল্য-নিয়মটি শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত করে দেয় তার কতটা নিয়োগ-যোগ্য এম-সময়কে সমাজ প্রত্যেকটি বিশেষ শ্রেণীর পণ্যের জন্য ব্যয় করতে পারে। কিন্তু উৎপাদনের এই বিবিধ ক্ষেত্রের ভারসাম্যের দিকে যাবার প্রবণতা অভিব্যক্ত হয় কেবল এই ভারসাম্যের নিরন্তর বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার আকারেই। যে-এমবিভাগ অবরোহমূলক প্রণালীর ভিত্তিতে কর্মশালার অভ্যন্তরে নিয়মিত সম্পাদিত হয়, তাই আবার সমাজের অভ্যন্তরে পরিণত হয় আরোহমূলক প্রণালী-সঞ্জাত প্রকৃতি-প্ৰতিত আবশ্যিক প্রয়োজন হিসাবে, যা নিয়ন্ত্রণ করে উৎপাদনকারীদের উচ্ছল খেয়ালখুশিকে এবং আত্মপ্রকাশ করে বাজার দরের তাপমান-যন্ত্রসুলভ উত্থান-পতনে। কর্মশালার অভ্যন্তরস্থ শ্রম-বিভাগের নিহিতার্থ হচ্ছে মানুষজনের উপরে ধনিকের তর্কাতীত প্রাধান্য-মানুষজন হচ্ছে কেবল একটা যন্ত্রের বিভিন্ন অংশস্বরূপ, যে যন্ত্রটির মালিক হল ঐ ধনিক। সমাজের অভ্যন্তরস্থ শ্রম-বিভাগ স্বতন্ত্র উৎপাদনকারীদের নিয়ে আসে পারস্পরিক সংস্পর্শে, যারা প্রতিযোগিতা-ব্যতিরেকে, পারস্পরিক স্বার্থ-সংঘাতজনিত জবরদস্তি ব্যতিরেকে অন্য কোনো কর্তৃত্বকে স্বীকার করেনা ঠিক যেমন পশুরাজ্যে bellum omnium contra omnes প্রত্যেকটি প্রজাতির অস্তিত্বকে রক্ষা করে।
