১৬. ড উরে তার আধুনিক যান্ত্রিক শিল্পের মহিমা কীর্তনে ব্যাবেজ-এর মত পুর্বতন অর্থতাত্ত্বিকদের তুলনায় আরো তীক্ষ্ণভাবে ম্যানুফ্যাকচারের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যটি প্রকাশ করেন; ব্যাবেজ গণিতজ্ঞ ও যন্ত্র-বিশেষজ্ঞ হিসাবে ছিলেন উরে-র চেয়ে ঢের উচুতে, কিন্তু তিনি যান্ত্রিক শিল্পকে দেখেছিলেন একমাত্র ম্যানুফ্যাকচারকারীর দৃষ্টিতে। উরে বলেন, “প্রত্যেকের জন্য এই কাজের বিলি-বণ্টন, উপযুক্ত মূল্য ও ব্যয়ের এক একজন কর্মীকে বরাদ্দকরণ-এটাই হল শ্রম-বিভাগের আসল মর্ম।” অন্য দিকে, তিনি এম-বিভাজনকে বর্ণনা করেন বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন প্রতিভার সঙ্গে শ্রমের অভিযোজন” বলে এবং সর্বশেষে সমগ্র ম্যানুফ্যাকচার-প্রণালীকে “শ্রমের-বিভাজন ও পর্যায়ীকরণের এক প্রণালী” হিসাবে, “দক্ষতার মাত্রা অনুযায়ী শ্রমের বিভাজন” হিসাবে। (উরে, “দি ফিলসফি অব ম্যানুফ্যাকচার্স”, ফরাসী অনুবাদ, পৃঃ ১৯-২৩)।
১৭. “প্রত্যেক হস্তশিল্পীকে একটি বিন্দুতে অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে নিখুৎ করে তুলতে দেওয়া হয় বলে, সে হয়ে উঠত একজন অপেক্ষাকৃত সস্তা মজুর।” (উরে, “দি ফিলসফি অব ম্যানুফ্যাকচার্স”, পৃঃ ১৯)।
.
চতুর্থ পরিচ্ছেদ — ম্যানুফ্যাকচারে শ্রম-বিভাগ এবং সমাজে এম-বিভাগ
আমরা প্রথমে বিবেচনা করেছিলাম ম্যানুফ্যাকচারের উৎপত্তি, তার পরে তার বিবিধ সরল উপাদান, তারপর প্রত্যংশ শ্রমিক ও তার বিভিন্ন উপকরণ এবং সর্বশেষে সমগ্র ভাবে এই ব্যবস্থাটি। এখন আমরা দৃষ্টি দেব ম্যানুফ্যাকচারগত এম-বিভাজন এবং সামাজিক শ্রম-বিভাজনের উপরে, যা সমস্ত পণ্যোৎপাদনের ভিত্তিস্থানীয়।
আমরা যদি একমাত্র শ্রমকেই আমাদের নজরে রাখি, তা হলে আমরা প্রধান প্রধান বিভাগে তথা গণজাতিতে—যেমন কৃষি, শিল্প ইত্যাদিতে তার পৃথগভবনকে অভিহিত করতে পারি সাধারণ শ্রম-বিভাজন হিসাবে এবং এক-একটি গণজাতির প্রজাতি ও উপ-প্রজাতিতে বিভাজনকে বিশেষ শ্রম-বিভাজন হিসাবে এবং কর্মশালার অভ্যন্তরস্থ শ্রম-বিভাজনকে একক বা প্ৰত্যংশ শ্রম-বিভাজন হিসাবে।[১]
সমাজে এম-বিভাজন এবং সেই সঙ্গে একটি বিশেষ পেশায় ব্যক্তি-মানুষদের বাধা পড়ার ব্যাপারটি বিকাশ লাভ করে বিপরীত সূচনা-বিন্দু থেকে, ঠিক যেমন ম্যানুফ্যাকচারেও ঘটে থাকে। একটি পরিবারের মধ্যে[২] এবং আরো অগ্রগতির পরে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে, স্বাভাবিক ভাবেই, উদ্ভূত হয় এক ধরনের শ্রম-বিভাগ, যার কারণ নারী-পুরুষের পার্থক্য, অতএব, শারীরবৃত্তগত পার্থক্য—যে শ্রম-বিভাগ তার উপাদানসমূহের বৃদ্ধিসাধন করে জনসমাজের বৃদ্ধিসাধনের মাধ্যমে এবং বিশেষ করে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ এবং এক গোষ্ঠীর উপরে অন্য গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে। অপর পক্ষে, যে কথা আমি আগেই বলেছি, দ্রব্য-বিনিময়ের উদ্ভব ঘটে, সেই সব ক্ষেত্রে যেখানে বিভিন্ন পরিবার, গোষ্ঠী, জনসমাজ পরস্পরের সংস্পর্শে আসে; কারণ সভ্যতার প্রারম্ভে বিভিন্ন পরিবার, গোষ্ঠী ইত্যাদির স্বাধীন মর্যাদার ভিত্তিতে মিলিত হয়, ব্যক্তিবিশেষরা নয়। বিভিন্ন জনসমাজ তাদের আপন আপন প্রাকৃতিক পরিবেশে উৎপাদনের ভিন্ন ভিন্ন উপায় ও প্রাণধারণের ভিন্ন ভিন্ন উপকরণের সন্ধান পায়। সুতরাং তাদের উৎপাদন-পদ্ধতি, জীবনধারণের পদ্ধতি এবং তাদের উৎপন্ন দ্রব্যাদিও হয় ভিন্ন ভিন্ন। যখন বিভিন্ন জনসমাজ পরস্পরের সংস্পর্শে আসে, তখন স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে বিকশিত এই বিভিন্নতাই পারস্পরিক দ্রব্য-বিনিময়ের প্রয়োজন ঘটায়। বিনিময় উৎপাদনের-ক্ষেত্রসমূহের মধ্যে বিভিন্নতা সৃষ্টি করে না, বরং যেগুলি আগে থেকেই বিভিন্ন, সেগুলির মধ্যে সম্পর্ক ঘটায় এবং যেগুলিকে রূপান্তরিত করে একটি সম্প্রসারিত সমাজের সমষ্টিগত উৎপাদনের মোটামুটি পরস্পর-নির্ভর শাখা হিসাবে। এই শেষোক্ত ক্ষেত্রে সামাজিক শ্রম-বিভাগের উদ্ভব ঘটে উৎপাদনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যে বিনিময় থেকে, যেগুলি পরস্পর থেকে মূলতঃ আলাদা ও স্বতন্ত্র। পূর্বোক্ত ক্ষেত্রে, যেখানে শারীরবৃত্তগত শ্রম-বিভাগই হচ্ছে সূচনা-বিন্দু, সেখানে একটি সুসংবদ্ধ সমগ্রের প্রধান প্রধান অঙ্গগুলি ঢিলেটালা হয়ে যায় প্রধানতঃ বিদেশী জনসমাজগুলির সঙ্গে বিনিময়ের কারণে, এবং তারপর নিজেদেরকে এতদূর পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে ফেলে যে, শেষ পর্যন্ত বিবিধ প্রকারের কাজকে যা যুক্ত করে রাখে, তা হল পণ্য হিসাবে এই উৎপন্নগুলির বিনিময়। এক ক্ষেত্রে, যা ছিল স্বনির্ভর, তাকে করা হল পরনির্ভর এবং অন্য ক্ষেত্রে, যা ছিল পরনির্ভর, তাকে করা হল স্বনির্ভর।
সুবিকশিত ও পণ্য বিনিময়ের দ্বারা সংঘটিত প্রত্যেক শ্রম-বিভাগের ভিত্তি হল শহর ও গ্রামের মধ্যে বিচ্ছেদ।[৩] এটা বলা যেতে পারে যে, সমাজের সমগ্র অর্থ নৈতিক ইতিহাস এই বৈপরীত্যের গতি-প্রক্রিয়ার মধ্যেই ক্ষুদ্রাকারে বিধৃত। সে যাক, আপাততঃ আমরা ব্যাপারটিকে ডিঙিয়ে যাচ্ছি।
যেমন যুগপৎ নিযুক্ত কিছু সংখ্যক শ্রমিক হচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারে শ্রম-বিভাজনের বাস্তব পূর্বশর্ত, ঠিক তেমনি জনসংখ্যার আয়তন ও ঘনত্ব, যা এখানে বোঝায় একটি কর্মশালায় সন্নিবিষ্ট জনসংখ্যা, ভাই হল সমাজে শ্রম-বিভাজনের আবশ্যিক ভিত্তি।[৪]
