বিবিধ প্রত্যংশ-শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত যৌথ শ্রমিকটিই হচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারযুগের বৈশিষ্ট্যসূচক মেশিনারি। নানাবিধ কর্মকাণ্ড, যেগুলি একজন পণ্যের উৎপাদক পালাক্রমে সম্পাদন করে এবং যেগুলি উৎপাদনের অগ্রগমনের পথে পরস্পরের সঙ্গে মিলে যায়, সেগুলি তার উপরে নানা ভাবে দাবি হাজির করত। একটি কর্মকাণ্ডে
তাকে দিতে হবে অধিকতর দৈহিক শক্তি, আর একটিতে অধিকতর অভিনিবেশ এবং একই ব্যক্তি এই সমস্ত কয়টি গুণ সমান ভাবে ধারণ করে না। একবার যখন ম্যানুফ্যাকচার বিবিধ প্রক্রিয়াগুলিকে বিভক্ত, বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র করে দিয়েছে, তখন শ্রমিকেরাও তাদের নিজ নিজ প্রধান গুণ অনুসারে বিভক্ত, শ্রেণীবিন্যস্ত ও গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে যায়। একদিকে তাদের প্রকৃতি-প্রদত্ত গুণাবলী হয় শ্রম-বিভাজনের ভিত্তি এবং অন্য দিক ম্যানুফ্যাকচার একবার প্রবর্তিত হলে তাদের মধ্যে ঘটায় নোতুন নোতুন ক্ষমতার বিকাশ—যে ক্ষমতাগুলি স্বভাবতই সীমিত ও বিশেষ কাজের জন্যই উপযোগ। তখন যৌথ শ্রমিকটি, সমমাত্রার উৎকর্ষে, উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কয়টি গুণেরই অধিকারী হয় এবং বিশেষ বিশেষ শ্রমিকেরা বা শ্ৰমিক-গোষ্ঠীর দ্বারা গঠিত তার সব কয়টি অঙ্গকে একান্ত ভাবেই তাদের স্ব স্ব বিশেষ কাজে নিযুক্ত করে সে সেই গুণগুলিকে প্রয়োগ করে সর্বাপেক্ষা মিতব্যয়ী ভাবে।[১৩] প্রত্যংশ শ্রমিকের একপেশেমি ও খুৎগুলি তখন হয়ে ওঠে সর্বাঙ্গীণ ও নিখুৎ, কেননা তখন সে যৌথ প্রমিকটির একটি অঙ্গ।[১৪] একটি মাত্র কাজ করবার অভ্যাস তাকে পরিণত করে একটি অব্যর্থ উপকণে, আর অন্য দিকে গোটা সংগঠনটির সঙ্গে তার সংযোগ তাকে বাধ্য করে একটি মেশিনের অংশ-সুলভ নিয়মিকতার সঙ্গে কাজ করতে।[১৫]
যেহেতু যৌথ শ্রমিকটির সরল ও জটিল, উচু ও নিচু—দু রকমেরই কাজ আছে, সেই হেতু তার সদস্যদের অর্থাৎ ব্যক্তি-শ্রমিকদের প্রয়োজন হয় বিভিন্ন মাত্রার প্রশিক্ষণের এক সেই কারণে তাদের মূল্যও হয় বিভিন্ন। সুতরাং ম্যানুফ্যাকচার গড়ে তোলে শ্রমশক্তিসমূহের একটি ক্রমোচ্চ-রতন্ত্র, যার এক-একটি স্তরের জন্য নির্দিষ্ট হয় এক-এক রকম মজুরির হার। এক দিকে, যখন ব্যক্তি-শ্রমিকেরা সারা জীবনের জন্য একটি সীমিত কাজে নিযুক্ত ও আবদ্ধ থাকে, অন্য দিকে তখন ঐ ভতন্ত্রের নানাবিধ কাজগুলি শ্রমিকদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয় তাদের নিজ নিজ স্বাভাবিক ও অর্জিত গুণাবলী অনুসারে।[১৬] অবশ্য, প্রত্যেকটি উৎপাদন-প্রক্রিয়াতেই এমন কিছু প্রকৌশল-ক্ষমতার দরকার হয় যা প্রত্যেক মানুষেরই ক্ষমতার মধ্যে। কর্মতৎপরতার অধিকতর পূর্ণ-গর্ভ মুহূর্তের সঙ্গে এই প্রকৌশলগুলির সংযোগ থেকেও এখন এগুলির বিচ্ছেদ ঘটানো হয় এবং এগুলিকে শিলীভূত রূপ দেওয়া হয় বিশেষ ভাৰে নিযুক্ত শ্রমিকদের একান্ত কার্যে। অতএব, ম্যানুফ্যাকচার যে হস্তশিল্পেই হাত বাড়াক না কেন, সেখানেই তা সৃষ্টি করে তথাকথিত অদক্ষ শ্রমিকদের একটি শ্রেণী এমন একটি শ্রেণী যার কোনো স্থান নেই হস্তশিল্পে। ম্যানুফ্যাকচার ষছি এমন মানুষের সমগ্র কর্মক্ষমতার বিনিময়ে একটি একপেশে বৈশিষ্ট্যের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটায়, তবে তা আবার সমস্ত বিকাশের অভাবকেও একটি বৈশিষ্ট্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা-দানের সূচনা করে। একটি ক্রমোচ্চ-স্ততন্ত্র প্রবর্তনের পাশাপাশি আলে দক্ষ ও অক্ষ শ্রমিকদের একটি সহজ সরল শ্রেণীভাগ। অদক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশি ব্যয় হয় অন্তর্হিত; দক্ষদের জন্য এই ব্যয় হস্তশিল্পীদের তুলনায় হ্রাস পায়, কেননা কাজগুলি তখন সরল হয়ে যায়। উভয় ক্ষেত্রেই শ্রমের মূল্য পড়ে যায়।[১৭] এই নিয়মটি একটি ব্যতিক্রম ঘটে কেবল তখনি, যখন শ্ৰম-প্রক্রিয়ার ভাঙনের ফলে নোতুন ও বিস্তারিত কাজের জন্ম হয়—এমন সব কাজ যার, হয়, হস্তশিল্পে কোনো স্থান ছিলনা; নয়তে, থাকলেও তা ছিল সামান্য। শিক্ষানবিশির বাবদে ব্যয়ের এই অবলুপ্তি হ্রাসপ্রাপ্তির অর্থ দাঁড়ায় মূলধনের সেবায় উত্তমূল্যের সরাসরি বৃদ্ধিপ্রাপ্তি, কেননা তা আবশ্যক শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় আবশ্যিক শ্রম-সময়ের হ্রাস ঘটায়, তাই উত্ত-শ্রমের পরিধিরও বিস্তার ঘটায়।
————
১. ১৮৫৪ সালে জেনেভা উৎপাদন করেছিল ৮০,০০০ ঘড়ি, যা নিউফচ্যাটেল-এর ক্যান্টনে যা উৎপাদিত হয় তার এক-পঞ্চমাংশও নয়। যাকে আমরা একটা বিশাল ঘড়ি ম্যানুফ্যাক্টরি বলে গণ্য করতে পারি, সেই লা দ্য-দ্য-ফদ একা বছরে উৎপাদন করত জেনেভার দ্বিগুণ। ১৮৫০ থেকে ১৮৬১ পর্যন্ত জেনেভা উৎপাদন করে ৭,২০,০০০ ঘড়ি। “জেনেভা থেকে ঘড়ি-ব্যবসা প্রসঙ্গে প্রতিবেদন,” “ম্যানুফ্যাকচার, কমার্স ইত্যাদি প্রসঙ্গে এমব্যাসি ও লিগেশন-এর রাজকীয় সেক্রেটারিদের রিপোর্ট, নং ৬, ১৮৬৩” দ্রষ্টব্য। যে-সমস্ত প্রক্রিয়ায়, সেই সমস্ত জিনিস—যেগুলি কেবল একসঙ্গে ফিট-করা বিভিন্ন অংশ—সেগুলির উৎপাদন বিভক্ত, সেই সমস্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে সংযোগের অভাব এই ধরনের একটি ম্যানুফ্যাকচারকে মেশিনারি-চালিত আধুনিক শিল্পের একটি শাখায় রূপান্তর-সাধনকে খুবই কঠিন করে তোলে। কিন্তু ঘড়ির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আরো দুটি প্রতিবন্ধক আছে তার বিভিন্ন অংশের ক্ষুদ্রতা ও সুক্ষ্মতা এবং বিলাসদ্রব্য হিসাবে তার চরিত্র। এই কারণেই তার এত বৈচিত্র, যা এত বিবিধ যে এমনকি লণ্ডনের সেরা ঘড়ি-ঘরগুলি পর্যন্ত এক বছরে একই রকমের এক ডজন ঘড়িও তৈরি করে কিনা সন্দেহ। মেসার্স ভ্যাচিরন অ্যাণ্ড কনস্ট্যানটিন’ এর ঘড়ি-কারখানা, যেখানে সাফল্যের সঙ্গে মেশিনারি প্রতিবর্তিত হয়েছে, সেখানে বড় জোর তিন-চার রকমের আকার ও রূপের ঘড়ি তৈরি হয়।
