যার উপরে কোন বিশেষ প্রত্যংশ কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়, এমন একটি বিচ্ছিন্ন শ্ৰমিক-গোষ্ঠী গঠিত হয় সমজাতীয় উপাদানসমূহের দ্বারা এবং এই শ্রমিক-গোষ্ঠী হবে সমগ্র ব্যবস্থাটির একটি অঙ্গগত অংশ। অবশ্য অনেক ম্যানুফ্যাকচারে এই শ্রমিক গোষ্ঠী নিজেই একটি শ্রম-সংগঠন-সমগ্র ব্যবস্থাটি হচ্ছে এই প্রাথমিক গঠনগুলির পুনরাবর্তন। দৃষ্টান্ত হিসাবে, কাচের বোতল ম্যানুফ্যাকচারের বিষয়টি নেওয়া যাক। ব্যাপারটিকে সিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রথম যখন কাদের উপকরণগুলি প্রস্তুত করা হয়, বালি ও চুন ইত্যাদি মেশানো হয় এক সেগুলিকে গলিয়ে কাচে তরল আকারে পরিণত করা হয়।[৯] বিভিন্ন প্ৰত্যংশ শ্রমিক এই পর্যায়ে নিযুক্ত হয়, যেমন তারা নিযুক্ত হয় চুড়ান্ত পায়েও, যখন বোতলগুলিকে শুকিয়ে নেবার চুল্লী থেকে সরিয়ে নিতে হয়, বাছাই করে সাজাতে হয়, প্যাক করতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। মধ্য পর্যায়ে, অর্থাৎ প্রারম্ভিক ও চূড়ান্ত—এই দুই পর্যায়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ে, আসে সঠিক কঁচ বিগলন, তরল আকারের কাচের উপযোজন। চুল্লীর প্রত্যেকটি মুখে কাজ করে একটি করে শ্রমিক-গোষ্ঠী, যাকে বলা হয় “হোল” (কোটর”) যা গঠিত হয় একজন “ফিনিশার” (বোতল-নির্মাতা), একজন “ব্লোয়ার” (হাপরদার ), একজন “গ্যাদারার” (সংগ্রাহক), একজন “পুটার-আপ” বা “হোয়েটার ইন” (শানদার) এবং একজন “টেকারইন” (উত্তোলক)-এর দ্বারা। এই পাঁচজন প্রত্যংশ কর্মী একটি একক কর্মযন্ত্রের পাঁচটি অঙ্গ, যে কর্মযন্ত্রটি কেবল একটি সমগ্র হিসাবেই কাজ করে এবং স্বভাবতই ক্রিয়াশীল হতে পারে কেবল সমগ্র পাঁচটির সহযোগে। যদি এই পাঁচটির মধ্যে কোন একটির অভাব ঘটে, তা হলে গোটা দেহটাই অসাড় হয়ে পড়বে। কিন্তু একটা কাচের চুল্লীর থাকে কয়েকটা করে মুখ (ইংল্যাণ্ডে ৪ থেকে ৬টি), প্রত্যেকটিতে থাকে তরল কাচে পরিপূর্ণ একটি মাটির ঘড়া এবং কাজ করে অনুরূপ একটি কর্মী-গোষ্ঠী। প্রত্যেকটি গোষ্ঠীর সংগঠনের ভিত্তি হল শ্রম-বিভাজন, তবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে থাকে সহযোগের বন্ধন, যা উৎপাদনের অন্যতম উপায়কে অর্থাৎ চুল্লীটিকে সম্মিলিত ভাবে ব্যবহার করার ফলে তার বাবদে ঘটায় আরো ব্যয়-সংকোচন। এমন একটি চুল্লী তার ৪ থেকে ৩টি কর্মী-গোষ্ঠী নিয়ে গঠন করে একটি কাচঘর এবং এক-একটি কঁচ-কারখানা (ম্যানুফ্যাক্টরি) গঠিত হয় এইরকম কয়েকটি কঁাচ-ঘর এবং সেই সঙ্গে প্রারম্ভিক ও চুড়ান্ত পর্যায়ের জন্য প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জাম ও শ্রমিকদের নিয়ে।
সর্বশেষে, ঠিক যেমন ম্যানুফ্যাকচারের উদ্ভব ঘটে, অংশতঃ, বিভিন্ন হস্তশিল্পের সংযোজন থেকে, ঠিক তেমনি সেও আবার বিকাশ ঘটায় বিবিধ ম্যানুফ্যাকচারের। নমুনা হিসাবে, ইংল্যাণ্ডের বড় বড় কাঁচ-ম্যানুফ্যাকচারকারীরা নিজেরাই তাদের মাটির বিগলন-পাত্রগুলি গড়ে নেয়, কেননা সেগুলির উপরে বহুল পরিমাণে নির্ভর করে প্রক্রিয়াটির সাফল্য বা ব্যর্থতা। উৎপাদন-উপায়সমূহের একটি ম্যানুফ্যাকচার এক্ষেত্রে উৎপাদনীয় জিনিসটির উৎপাদনের সঙ্গে সংযোজিত হয়ে গিয়েছে। অপর পক্ষে, জিনিসটির ম্যানুফ্যাকচার অন্যান্য ম্যানুফ্যাকচারের সঙ্গে সংযোজিত হতে পারে এমন ম্যানুফ্যাকচারের সঙ্গে যার কাঁচামাল হল এই জিনিসটি; অথবা উৎপাদনের বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে খোদ এই জিনিসটিই পরবর্তীকালে মিশ্রিত হতে পারে। যেমন আমরা দেখতে পাই চকমকি কঁচের ম্যানুফ্যাকচারের সঙ্গে কঁচ-কাটা ও পিতল ঢালাইয়ের সংযোজন—যার প্রয়োজন হয় কাচের তৈরি বিভিন্ন জিনিস সেট করবার কাজে। এইভাবে সংযোজিত বিবিধ ম্যানুফ্যাকচার পরিণত হয় একটি বৃহত্তর ম্যানুফ্যাকচারের মোটামুটি আলাদা আলাদা বিভাগে, কিন্তু সেই সঙ্গে প্রত্যেকটিই আবার একটি স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া, যার প্রত্যেকটিতেই থাকে তার নিজস্ব শ্রম-বিভাজন। বিবিধ ম্যানুফ্যাকচারের এই সংযোজন নানাবিধ সুবিধার অধিকারী হলেও, তা কখনো তার নিজস্ব তিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি প্রণালীতে বিকাশ লাভ করেনা। সেটা ঘটে কেবল তখনি, যখন তা রূপান্তরিত হয় মেশিনারি-চালিত একটি শিল্পে।
ম্যানুফ্যাকচার-যুগের গোড়ার দিকে, পণ্যোৎপাদনে আবশ্যিক শ্রম-সময়ের হ্রাস সাধনের নীতি[১০] গৃহীত ও সুত্রায়িত হত; এবং মেশিনের ব্যবহার এখানে সেখানে আত্মপ্রকাশ করত, বিশেষ করে, কয়েকটি সরল প্রাথমিক প্রক্রিয়ার জন্য, যেগুলিকে পরিচালিত করতে হত খুবই বৃহদায়তনে এবং বিপুল শক্তি-প্রয়োগে। যেমন প্রথম যুগে কাগজ ম্যানুফ্যাকচারে ন্যাকড়া-ছেড়ার কাজটি করা হত কাগজ-কলের দ্বারা ধাতু কারখানার আকর চূর্ণ করা হত পেষাইকলে।[১১] জলচক্রের (ওয়াটার-হুইল’-এর ) যাবতীয় মেশিনারির প্রাথমিক রূপটি রোম-সাম্রাজ্য দিয়ে গিয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে। [১২]
হস্তশিল্পের কাছ থেকে আমরা উত্তরাধিকার হিসাবে পেয়েছি কম্পাস’ ( দিক দর্শক যন্ত্র। গান পাউডার’ (বারুদ’, ‘টাইপ প্রিন্টিং’ (হরফ-মুদ্রণ) ও স্বয়ংক্রিয় ঘড়ির মত বড় বড় সব উদ্ভাবন। কিন্তু সমগ্র ভাবে দেখলে, শ্রম-বিভাজনের তুলনায় মেশিনারির স্থান তখন ছিল গৌণ, যে স্থানটি অ্যাডাম স্মিথ ন্যস্ত করেছিলেন তার উপরে।[১৩] সপ্তদশ শতাব্দীতে মেশিনারির বিক্ষিপ্ত ব্যবহারের ঘটনাটি চরম গুরুত্বপূর্ণ, কেননা সে যুগের মহান গণিতজ্ঞদের তা যুগিয়েছিল, বলবিজ্ঞান (মেকানিক্স’ -সৃষ্টির বাস্তব ভিত্তি ও প্রেরণা।
