যদি আমরা আমাদের মনোযোগ কোন বিশেষ ধরনের কাঁচামালের উপরে নিবদ্ধ করি, যেমন কাগজ ম্যানুফ্যাকচারের ক্ষেত্রে ছেড়া ন্যাকড়া কিংবা সুচ ম্যানুফ্যাকচারের ক্ষেত্রে তারের উপরে, আমরা লক্ষ্য করি যে, তা সম্পূর্ণ না হওয়া অবধি বিভিন্ন প্ৰত্যংশ শ্রমিকের হাতে বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে পালাক্রমে পার হয়। অপর পক্ষে, আমরা যদি সমগ্র ভাবে কর্মশালাটির উপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি, আমরা একই সময়ে কাঁচামালটিকে তার বিভিন্ন পর্যায়ে দেখতে পাই। যৌথ শ্রমিক তার অনেক হাতের মধ্যে এক ধরনের হাতিয়ারে সুসজ্জিত একপ্রস্ত হাত দিয়ে তার টানে, আরেক ধরনের হাতিয়ারে সুসজ্জিত আরেক প্রস্ত হাত দিয়ে একই সময়ে তারটিকে সোজা করে এবং আরো এক ধরনের হাতিয়ারে সুসজ্জিত আরো এক প্রন্ত হাত দিয়ে তারটিকে সুচলো করে ইত্যাদি ইত্যাদি। বিভিন্ন প্ৰত্যংশ প্রক্রিয়াগুলি, যা ছিল কালের দিক থেকে পর্যায়ক্রমিক, তাই হয়ে উঠল স্থানের দিক থেকে যুগপৎ। এই কারণেই একটি নির্দিষ্ট সময়ে উৎপন্ন হল একটি বৃহত্তর পরিমাণ তৈরি পণ্যসম্ভার। [৫] এ কথা ঠিক যে, এই যুগপত্তার হেতু হচ্ছে সমগ্র ভাবে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটির সহযোগমূলক রূপটি; কিন্তু ম্যানুফ্যাকচার কেবল সহযোগের অবস্থানগুলিকে তৈরি-অবস্থায় পায়না, হস্তশিল্প-শ্রমের আরো বিভাজন ঘটিয়ে সে নিজেও সেগুলি কিছুটা পরিমাণে তৈরি করে নেয়। অপর পক্ষে, প্রত্যেক শ্রমিককে কেবল একটি করে ভগ্নাংশিক কাজে নিবন্ধ রেখে ম্যানুফ্যাকচার এই সামাজিক সংগঠনটিকে সম্পূর্ণ করে।
যেহেতু প্রত্যেক প্রত্যংশ শ্রমিকের উৎপাদিত ভয়াংশিক দ্রব্যটি একই সঙ্গে আবার এক ও অভিন্ন তৈরি জিনিসের একটি বিশেষ পর্যায় মাত্র, সেহেতু প্রত্যেকটি শ্রমিক বা শ্রমিকগোষ্ঠী যা করে, তা হচ্ছে অন্য একজন শ্রমিক বা শ্ৰমিক-গোষ্ঠীর জন্য কাঁচামাল প্রস্তুত করে দেওয়া। একের শ্রমের ফল আর একের শ্রমের সূচনাবিন্দু। সুতরাং একজন শ্রমিক প্রত্যক্ষ ভাবেই আরেকজনকে কাজ দিচ্ছে। ঈপ্সিত ফল লাভের জন্য প্রত্যেকটি আংশিক প্রক্রিয়ায় যে শ্রম-সময়ের প্রয়োজন, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তা শেখা হয়ে যায়; এবং সমগ্রভাবে ম্যানুফ্যাকচারের যান্ত্রিক প্রণালীটি এই পূর্ব-সিদ্ধান্তের উপরে দাড়িয়ে আছে যে, একটি নির্দিষ্ট ফল একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাভ করা যায়। কেবল এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই বিবিধ অনুপূরক শ্ৰম-প্রক্রিয়া অব্যাহত ভাবে, যুগপৎ পাশাপাশি অগ্রসর হতে পারে। এটা স্পষ্ট যে, বিবিধ কর্মের, এবং, সেই কারণেই, বিভিন্ন শ্রমিকের, পরস্পরের উপরে এই প্রত্যক্ষ নির্ভরশীলতা তাদের প্রত্যেককে বাধ্য করে তার কাজের জন্য কেবল ঠিক ততটা শ্রম-সময় ব্যয় করতে যতটা আবশ্যিক শ্রম-সময়ের অনধিক এবং এই ভাবে এমন একটি অনবচ্ছিন্নতা, অভিন্নতা, নিয়মিকতা, শৃংখলা[৬] এবং এমনকি শ্ৰম-তীব্রতার জন্ম হয়, যা একটি স্বাধীন হস্তশিল্পে, এমনকি সরল সহযোগে। যা দৃষ্ট হয়, তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। কোন পণ্যের উপরে ক্যয়িত শ্রম-সময়ের পরিমাপ তার উৎপাদনের জন্য সামাজিক ভাবে আবশ্যিক শ্রম-সময়কে ছাড়িয়ে যাওয়া অনুচিত—এই যে নীতি, এটা সাধারণ ভাবে পণ্যোৎপাদনে কেবল প্রতিযোগিতার ফলশ্রুতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় বলে প্রতিভাত হয়; যেহেতু ভাসা ভাসা ভাবে বলতে গেলে, প্রত্যেক ব্যক্তিগত উৎপাদনকারী তার পণ্য তার বাজারদরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ম্যানুফ্যাকচারে কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোন দ্রব্যের নির্দিষ্ট পরিমাপের উৎপাদন স্বয়ং উৎপাদন-প্রক্রিয়ারই একটি কৃৎকৌশলগত নিয়ম।[৭]
অবশ্য, বিভিন্ন কাজ বিভিন্ন সময় লাগায় এবং সেই কারণে, সম-পরিমাণ সময় অসম। পরিমাণ ভগ্নাংশিক দ্রব্য যোগায়। সুতরাং যদি একই শ্রমিককে দিনের পর দিন একই কাজ করতে হয়, তা হলে এক-একটি কাজের জন্য অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যক শ্রমিক লাগে, যেমন টাইপ ম্যানুফ্যাকচারে চারজন ‘ফাউণ্ডার’ ও দুজন ‘ব্রেকার পিছু থাকে একজন রাবার; ফাউণ্ডার প্রতি ঘণ্টায় ছাচ ঢালাই করে ২০০০ টাইপ, বেকার ভাতে ৪০০০ এবং বাবার পালিশ করে ৮০°। এখানে আবার আমরা সহযোগের নীতিটিকে পাই তার সরলতম রূপে। একটি কাজের জন্য যুগপৎ অনেক শ্রমিকের নিয়োগ কেৱল এখানে এই নীতিটি হচ্ছে একটি অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কের অভিব্যক্তি। ম্যানুফ্যাকচারে শ্রম-বিভাজন যেভাবে পরিচালিত হয়, তাতে যে কেবল সামাজিক যৌথ-শ্রমিকের গুণগত ভাবে বিভিন্ন অংশগুলি সরলীকৃত ও পরিবর্তিত হয়, তাই নয়, সেই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক সম্পর্ক বা অনুপাতের সৃষ্টি হয়, যা ঐ অংশগুলির পরিমাণগত মাত্রাটিকে নিয়ন্ত্রিত করে যথা, প্রত্যেকটি প্রত্যংশ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিকের আপেক্ষিক সংখ্যা কিংবা শ্রমিক-গোষ্ঠীর আপেক্ষিক আকার। সামাজিক শ্রম-প্রক্রিয়ার গুণগত উপ-বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে ম্যানুফ্যাকচার-ব্যবস্থা ঐ প্রক্রিয়ার জন্য একটি পরিমাণগত নীতি ও আনুপাতিকতার বিকাশ ঘটায়।
একবার যদি একটি নির্দিষ্ট আয়তনে উৎপাদনরত বিবিধ শ্রমিক-গোষ্ঠীগুলিতে প্রত্যংশ শ্রমিকদের বিবিধ সংখ্যার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত অনুপাতটি পরীক্ষামূলক ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তা হলে কেবল প্রত্যেকটি বিশেষ শ্রমিক-গোষ্ঠীর একটি গুণিতককে কর্ম-নিযুক্ত করেই সেই আয়তনটির বিস্তার সাধন করা যায়।[৮] অধিকন্তু, কয়েক ধরনের কাজ একই ব্যক্তি বৃহদায়তনেও যতটা ভাল ভাবে করতে পারে, ক্ষুদ্রায়তনেও ঠিক ততটা ভাল ভাবেই করতে পারে, যেমন, তত্ত্বাবধানের শ্রম, এক পর্যায় থেকে পরবর্তী পর্যায়ে ভগ্নাংশিক দ্রব্যটির পরিবহণ। এই ধরনের কাজগুলির মধ্যে বিচ্ছেদ সাধন, একটি বিশেষ শ্রমিকের উপরে সেগুলির দায়িত্ব অর্পণ কখনো সুবিধাজনক হয় না, যে পর্যন্ত না নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে গিয়েছে, তবে এই সংখ্যাবৃদ্ধি প্রত্যেকটি প্রমিক-গোষ্ঠীতেই আনুপাতিক ভাবে ঘটাতে হবে।
