.
তৃতীয় পরিচ্ছেদ — ম্যানুফ্যাকচারের দুটি মৌলরূপঃ বিমিশ্র ম্যানুফ্যাকচার ও ক্রমিক ম্যানুফ্যাকচার
ম্যানুফ্যাকচার-সংগঠনের দুটি মৌল রূপ আছে, যে দুটি রূপ কখনন কখনোপরস্পরের সঙ্গে মিশে গেলেও মূলতঃ ভিন্ন প্রকারের এবং, তা ছাড়াও, পরবর্তীকালে ম্যানুফ্যাক ‘চারের মেশিনারি-পরিচালিত আধুনিক শিল্পে রূপান্তরণে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা গ্রহণ করে। এই দ্বৈত চরিত্রের উদ্ভব ঘটে উৎপাদিত জিনিসটির প্রকৃতি থেকে। হয়, সেই জিনিসটি স্বতন্ত্র ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন আংশিক দ্রব্যের নিছক যান্ত্রিক সংযোজনের ফল আর, নয়তো, তার পূর্ণায়ত আকারটি এক প্রস্ত পরস্পর সংযুক্ত-প্রক্রিয়ার পরিণতি।
নমুনা হিসাবে বলা যায়, একটি লোকোমোটিত গঠিত হয় … স্বতন্ত্র অংশের সংযোজনের ফলে। কিন্তু এটাকে প্রথম ধরনের বিশুদ্ধ ম্যানুফ্যাকচারের নমুনা হিসাবে নেওয়া যায়না, কেননা, তার অবয়বটি আধুনিক যান্ত্রিক শিল্পের দ্বারা গঠিত। তবে একটি ঘড়িকে তেমন নমুনা হিসাবে নেয়া যায়; এবং উইলিয়ম পেটি এটাকে ব্যবহার করতেন শ্রম-বিভাজনের দৃষ্টান্ত দেবার জন্য। আগে রেমবার্গের ঘড়ি ছিল একজন কারিগরের ব্যক্তিগত কাজ, পরে তা রূপান্তরিত হয় বিরাট-সংখ্যক প্ৰত্যংশ শ্রমিকের একটি সামাজিক উৎপাদনে, যেমন মেইন শ্রিং মেকার’, ‘ডায়াল মেকার, স্পাইরাল স্ক্রি মেকার’, ‘জুয়েল্ড হোল মেকার’, ‘রুবি লেভার মেকার’, ‘হ্যাণ্ড মেকার’, ‘কেসমেকার, কে, মেকার’, ‘গিলডার’—এবং সেই সঙ্গে আরো অসংখ্য উপ-বিভাগ যেমন হুইল-মেকার (পিতল ও ইস্পাতের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ), পিন-মেকার’, ‘মুভমেন্ট-মেকার’, ‘আশেভ দ্য পিগন (অ্যাক্সেল-এর উপরে হুইল বা চাকা লাগায় ), পিভট-মেকার’, ‘প্লাত্য দ্য ফিনিসাজ’ (হুইল ও স্প্রিং ওয়ার্কস-এর মধ্যে স্থাপন করে, ‘র্যাকোয়েট-মেকার ( ঘড়িটি রেগুলেট করার যন্ত্র), ‘প্লাত দ্য এশকাপমেন্ট (এসকেপমেন্ট-মেকার ); তারপরে আছে ‘রিপাশুর দ্য ব্যারিলেট’ (স্প্রিং-এর বক্সটি তৈরি করে ), ‘স্টিল পলিশার’, ‘হুইল পলিশার’, ‘, পলিশার’, ‘ফিগার-পেণ্টার’, ‘ডায়াল-এনামেলার (তামার উপরে কলাই করে), ফ্যাব্রিকঁাত দ্য পেদা (কেসটি ঝুলিয়ে রাখার আংটিটি তৈরি করে ), ‘ফিনিশু দ্য শার্নিয়ের’ (কভারের মধ্যে পিতলের কাটা স্থাপন করে, ‘গ্রাভর, ফেইসু্যর দ্য সিক্রেট কেসটি যে স্প্রিংটি দিয়ে ভোলা হয়, সেটি পরায়) ‘সিসের’, ‘পলির দ্য বয়েতে’ ইত্যাদি ইত্যাদি এবং, সর্বশেষে, রিপার’, যে গোটা ঘড়িটাকে ফিট করে এবং চালু অবস্থায় তা হাতে তুলে দেয়। ঘড়িটির কয়েকটি মাত্র অংশ বিভিন্ন হাতের মধ্য দিয়ে যায়। এবং এই সমস্ত “মেম্ব ডিসজেক্টা” প্রথম বারের মত সমবেত হয় সেই ব্যক্তিটির হাতে, যে তাদের এক সঙ্গে সন্নিবিষ্ট করে একটি যান্ত্রিক সমগ্রতায় রূপ দেয়। তৈরি সামগ্রীটি এবং তার বিবিধ বিচিত্র উপাদানগুলি, যা দিয়ে তা তৈরি হয়, সেগুলির মধ্যে এই যে বাহ সম্পর্ক, তা যেমন এই ক্ষেত্রে তেমনি অনুরূপ সমস্ত ক্ষেত্রেই, এই ব্যাপারটিকে একটি দৈবাৎ ঘটনায় পরিণত করে যে, প্রত্যংশ শ্রমিকদের একই কর্মশালায় সমবেত করা হল কিনা। প্রত্যংশ কাজগুলি আবার কতকগুলি স্বতন্ত্র ক্রিয়াকাণ্ড হিসাবেও চালানো যায়, যেমন করা হয় ভাউড ও চ্যাটেল-এর ক্যান্টনগুলিতে; অন্য দিকে, জেনেভায় আছে বড় বড় ঘড়ি ম্যানুফ্যাক্টরি (এম-কারখানা) যেখানে প্রত্যংশ শ্রমিকেরা প্রত্যক্ষ ভাবে একজন ধনিকের নিয়ন্ত্রণাধীনে কাজ করে। এবং এই পরবর্তী ক্ষেত্রেও ‘ডায়াল’, ‘ম্পিং’ ও ‘কেল’ কদাচিৎ ঐ কারখানাতেই তৈরি হয়। ঘড়ির ব্যবসায়ে শ্রমিকদের এক জায়গায় জড় করে তাকে ম্যানুফ্যাকচার হিসাবে পরিচালনা করা কেবল বিরল ক্ষেত্রেই লাভজনক হয়, কেননা যে সব শ্রমিক বাড়িতে সে কাজ করতে চায়, তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকে তীব্রতর এবং কেননা কতকগুলি ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ায় কাজের বিভাজনের ফলে যৌথ ভাবে ব্যবহার্য শ্রম-উপকরণসমূহের ব্যবহারের সুযোগ ঘটে কদাচিৎ; এবং সেই কারণে ধনিক শ্রমিকদের ছড়িয়ে দিয়ে কর্মশালা ইত্যাদির উপরে তার বিনিয়োগের সাশ্রয় করে ইত্যাদি।[১] সে যাইহোক, যে কারিগর তার খরিদ্দারের জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করে, তার তুলনায় এই যে প্রত্যংশ শ্রমিক, সে যদিও কাজ করে তার বাড়িতে বসে কিন্তু কাজ করে খনিকেরই জন্য, তার অবস্থান একেবারেই ভিন্ন।[২]
দ্বিতীয় ধরনের ম্যানুফ্যাকচার, তার উন্নতকৃত রূপ, এমন সব জিনিস তৈরি করে, সেগুলি পরস্পর-সংযুক্ত বিবিধ বিকাশ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে, এক প্রস্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, ধাপে ধাপে অতিক্রম করে, যেমন সুচ ম্যানুফ্যাকচারে সুচের তার অতিক্রম করে ৭২ জন, এমন কি, কখনো কখনো ৯২ জন ভিন্ন ভিন্ন শ্রমিকের হাতের মধ্য দিয়ে।
যখন প্রথম শুরু করা হয়, তখন এমন একটি ম্যানুফ্যাকচার বিক্ষিপ্ত হস্তশিল্পগুলিকে যতটা মাত্রায় সংযোজিত করতে পারে, ততটা মাত্রায় তা উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায় যে-ব্যবধান দ্বারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, সেই ব্যবধানকে কমিয়ে আনে। এক পর্যায় থেকে আরেক পর্যায়ে অতিক্রান্তির সময়কালও হ্রাসপ্রাপ্ত হয়, যেমন হ্রাসপ্রাপ্ত হয় সেই শ্রম, যে শ্রম এই অতিক্রান্তি ঘটিয়ে থাকে।[৩] হস্তশিল্পের তুলনায় অধিক উৎপাদন শক্তি লব্ধ হয়, এবং এই লাভ উদ্ভূত হয় ম্যানুফ্যাকচারের সাধারণ চরিত্র থেকে। অপর পক্ষে, এম-বিভাজন, যা ম্যানুফ্যাকচারের একটি বৈশিষ্ট্যসূচক নীতি, তা দাবি করে উৎপাদনের বিবিধ পর্যায়ের বিচ্ছিন্নতা এবং তাদের পারস্পরিক স্বতন্ত্রতা। বিচ্ছিন্ন কাজগুলির মধ্যে সংযোগ স্থাপন ও সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন হয় এক হাত থেকে অন্য হাতে, এক প্রক্রিয়া থেকে অন্য প্রক্রিয়ায় নিরন্তর স্থানান্তর। আধুনিক যান্ত্রিক শিল্পের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই প্রয়োজনটি প্রতিভাত হয় একটি চরিত্রগত ও ব্যয়বহুল অসুবিধা হিসাবে এবং এমন একটি অসুবিধা হিসাবে, যা ম্যানুফ্যাকচারের নীতির মধ্যেই নিহিত। [৪]
