একজন কারিগর, যে একটি তৈরি জিনিসের উৎপাদনে বিভিন্ন ভগ্নাংশিক কাজগুলি পরপর সম্পন্ন করে, তাকে এক সময়ে বদলাতে হয় তার স্থান, অন্য সময়ে বদলাতে হয় তার হাতিয়ার। এক কাজ থেকে পরবর্তী কাজে যেতে তার প্রমের প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং, বলা যায়, তার শ্রমদিবসে মাঝে মাঝে ছেদ পড়ে। এই ছেদগুলি তখনি ছোট হয়ে আসে, যখনি সে একই কাজে সারা দিন বাঁধা থাকে; তার কাজের প্রক্রিয়ার পরিবর্তন যত কমে যায়, ততই এই ছেদগুলি অন্তর্হিত হয়ে যায়। এর ফলে উৎপাদিকা শক্তির যে-বৃদ্ধি ঘটে তার কারণ, হয়, শ্রমের বর্ধিত নিয়োগ অর্থাৎ শ্রমের বর্ধিত নিবিড়তা, নয়তো অনুৎপাদক ভাবে ব্যবহৃত শ্রমশক্তির হ্রাস। বিরতি থেকে গতিতে যেতে শ্রমের বাড়তি ব্যয় পোষানো হয় স্বাভাবিক গতিবেগের স্থিতিকালকে দীর্ঘায়িত করে, যখন তা একবার অর্জিত হয়ে যায়। অপর পক্ষে, এক ও অভিন্ন ধরণের নিরন্তর শ্রম মানুষের জৈব কর্মশক্তির প্রবাহ ও নিবিড়তাকে ক্ষুন্ন করে, যে কর্মশক্তি নিছক পরিবর্তনেই স্মৃতি ও আনন্দ পায়।
শ্রমের উৎপাদনশীলতা কেবল শ্রমিকের নৈপুণ্যের উপরেই নির্ভর করে না, তার হাতিয়ারগুলির উন্নয়নের উপরেও নির্ভর করে। একই ধরনের সব হাতিয়ার, যেমন, ছুরি, তুরপুন, ক্ষুদে তুরপুন,হাতুড়ি ইত্যাদি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হতে পারে এবং একই হাতিয়ার একই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে। কিন্তু যখনি একটি শ্রম-প্রক্রিয়ার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে পরস্পর থেকে বিযুক্ত করে দেওয়া হয় এবং প্রত্যেকটি ভগ্নাংশিক পর্যায় এক একজন প্রত্যংশ শ্রমিকের হাতে একটি যথোপযুক্ত ও বিশিষ্ট রূপ ধারণ করে, তখনি যে-সমস্ত হাতিয়ার পূর্বে একাধিক উদ্দেশ্য সাধন করত, সেগুলিতে পরিবর্তন সাধনের দরকার হয়। সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটির অপরিবর্তিত রূপটিতে কি কি অসুবিধা হচ্ছিল, তাই দিয়েই নির্ধারিত হয় পরিবর্তন কোন্ দিকে ঘটবে। ম্যানুফ্যাকচারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উপকরণসমূহে বিশেষীভবন—এমন বিশেষীভবন যার দ্বারা এক এক ধরনের হাতিয়ার এক এক বিশেষ প্রয়োগের সঙ্গে উপযোজিত হয়ে নির্দিষ্ট আকারপ্রাপ্ত হয় এবং ঐসব হাতিয়ারের বিশেষীভবন যার ফলে প্রত্যেকটি বিশেষ হাতিয়ার কেবল একজন নির্দিষ্ট প্রত্যংশ শ্রমিকের হাতেই পূর্ণভাবে খেলতে পারে। একমাত্র বার্মিংহামেই উৎপাদিত হয় ৫০০ রকমের হাতুড়ি এবং তাদের এক-একটি রকম যে কেবল এক-একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার সঙ্গেই উপযোজিত তা নয়, প্রায়শঃই এমন ঘটে যে, কয়েকটি ধরন একান্ত ভাবে একই অভিন্ন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন সাধন করে। প্রত্যেক প্রত্যংশ শ্রমিকের একান্ত স্ববিশেষ কাজগুলির শ্রমের হাতিয়ারসমূহের অভিযোজন ঘটিয়ে ম্যানুফ্যাকচারের যুগ সেগুলিকে সরলীকৃত, উন্নীত ও বহুগুণিত করে।[৬] এইভাবে তা মেশিনারির অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব অবস্থানগুলির মধ্যে একটি অবস্থার সৃষ্টি করে; মেশিনারি হল কয়েকটি সরল হাতিয়ারের সংযোজিত রূপ।
. প্রত্যংশ শ্রমিক এবং তার হাতিয়ারগুলিই হচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারের সরলতম উপাদান। এখন আমরা সমগ্র ভাবে এই দিকটি উপরে মনোনিবেশ করব।
————
১. প্রত্যংশ শ্রমিক : “ডিটেইল লেবারার”
২. “অধিক বৈচিত্র্যপূর্ণ কোন ম্যানুফ্যাকচার যত বেশি বন্টিত হবে এবং বিভিন্ন শিল্পীকে বরাদ্দ করা হবে, সেটি অবশ্যই আরো ভাল ভাবে তৈরি হবে আরো বেশি দ্রুত গতিতে, আবো কম সময়ে ও শ্রমে।” (“দি অ্যাডভান্টেজেন অব দি ইস্ট ইঞ্জি ট্রেড,” ১৭২০, পৃঃ ৭১)।
৩. “সহজ এম হল হস্তান্তরিত দক্ষতা।” (মস হজস্কিন : “পপুলার পলিটিক্যাল ইকনমি” পৃ: ৪৮)
৪. “কারুশিল্পও…….মিশরে পৌছেছিল উৎকর্ষের শিখরে। কেননা এটাই একমাত্র দেশ যেখানে কারুশিল্পীরা আরেক শ্রেণীর নাগরিকদের কাজে মাথা গলাত না; লেগে থাকত কেবল সেই একটি মাত্র বৃত্তিতে যেটি তাদের গোষ্ঠীতে আইন। অনুসারে উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছিল। অন্য দেশে দেখা যায় যে, কারুশিল্পীরা নানান বিষয়ে মনোনিবেশ করত। এক সময়ে তারা মন দিত কৃষিতে, অন্য সময়ে তারা শুরু করত বাণিজ্য, আরেক সময়ে তারা আবার একই সঙ্গে ধরত একাধিক পেশা। স্বাধীন দেশগুলিতে তারা প্রায়ই হানা দিত জন-পরিষদসমূহে। অন্য দিকে মিশরে প্রত্যেক কারুশিল্পীকে কঠোর ভাবে দণ্ড দেওয়া হত যদি সে মাথা গলাতে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে, কিংবা লিপ্ত হত একাধিক পেশায়। সুতরাং তাদের বৃত্তিতে ব্যাঘাত ঘটাবার মত কিছুই ছিল না। অধিকন্তু, যেহেতু তারা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেত অসংখ্য রীতি-পদ্ধতি, সেই হেতু তারা আগ্রহী হত নোতুন। নোতুন সুবিধা আবিষ্কার করতে।” { ডিওডারাস : সিকিউলাস : Historische Bibliothek vols l. 111 Stuttgart. 1828, 74),
৫. “হিস্টরিক্যাল অ্যাণ্ড ডেস্ক্রিপটিভ অ্যাকাউন্ট অব ব্রিটিশ ইণ্ডিয়া ইত্যাদি”, হিউ মারে এবং জেমস উইলসন, এডিনবরা ১৮৩২, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৪৯। ভারতীয় তাঁত থাকে খাড়া অর্থাৎ টানা সুতো থাকে খাড়াখাড়ি।
৬. প্রজাতির উৎপত্তি সম্বন্ধে তার যুগান্তকারী গ্রন্থে ডারউইন উদ্ভিদ ও জীবদের প্রাকৃতিক অঙ্গসমূহ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত একটি অভিন্ন অঙ্গের ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের কার্য সম্পাদন করতে হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তার পরিবর্মীয়তার একটি ভিত্তি সম্ভবতঃ এই ব্যাপারটিতে পাওয়া যায় যে, যদি সেই অঙ্গটি কেবল একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নির্দিষ্ট থাকত তা হলে, তার তুলনায় অল্পতর যত্নভরে প্রাকৃতিক নির্বাচন রূপগত প্রত্যেকটি পরিবর্তনকে রক্ষা করত বা দমন করত। যেমন, যে সব ছুরি সব রকমের জিনিস কাটবার সঙ্গে অভিযোজিত, সেগুলি মোটামুটি ভাবে একই আকারের হতে পারে; কিন্তু একটি যন্ত্র, যা কেবল একভাবেই ব্যবহৃত হবার জন্য নির্দিষ্ট, তার আকার হবে প্রত্যেকটি বিভিন্ন ব্যবহারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন।”
