অতএব, যে পদ্ধতিতে ম্যানুফ্যাকচারের উদ্ভব হয়, হস্তশিল্প থেকে এর জন্ম ও বৃদ্ধি, তা দ্বিন্ধি। এক দিকে, এ উদ্ভূত হয় বিভিন্ন স্বতন্ত্র হস্তশিল্পের সম্মিলন থেকে, যে-হস্তশিল্পগুলি তাদের স্বাতন্ত্র থেকে বঞ্চিত হয় এবং এত দূর পর্যন্ত বিশেষীকৃত হয়। যে, তারা পর্যবসিত হয় একটি বিশেষ পণ্য উৎপাদনের বিবিধ পরিপূরক আংশিক প্রক্রিয়ায়। অন্য দিকে, এ উদ্ভূত হয় একটি হস্তশিল্পের কারিগরবৃন্দের সহযোগ থেকে; সেই বিশেষ হস্তশিল্পটিকে এ বিভক্ত করে বিভিন্ন প্রত্যংশ কর্মকাণ্ডে এবং তা করতে গিয়ে সেই কর্মকাণ্ডগুলিকে পরস্পর থেকে এত দূর পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র করে দেয় মে। প্রত্যেকটিই আবার হয়ে ওঠে এক একজন বিশেষ কারিগরের একান্ত কার্য। সুতরাং এক দিক থেকে, ম্যানুফ্যাকচার, হয়, একটি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রম-বিভাজন প্রবর্তন করে আর, নয়তো, শ্রম বিভাজনকে আরো বিকশিত করে; অন্য দিকে, যে সমস্ত হস্তশিল্প ইতোপূর্বে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল, সেগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে। কিন্তু এর সুচনা-বিন্দু যাই হোক না কেন, এর চুড়ান্ত রূপ অবশ্যই এক ও অভিন্ন—এমন একটি উৎপাদন-যন্ত্র যার বিভিন্ন অংশ হচ্ছে মানুষেরা।
ম্যানুফ্যাকচারে শ্রম-বিভাজন সম্পর্কে সঠিক ধারণা করার জন্য, নিম্নলিখিত বিষয়গুলি সম্পর্কে সুস্পষ্ট উপলব্ধি থাকা অত্যাবশ্যক। প্রথমত, পরস্পরাগত বিভিন্ন পর্যায়ে একটি উৎপাদন-প্রক্রিয়ার বিভাজন এখানে একটি হস্তশিল্পের পরম্পরাগত বিভিন্ন শারীরিক কর্মপ্রক্রিয়ার পৃথগীভবনের সঙ্গে যুগপৎ সংঘটিত হয়। জটিলই হোক আর সরলই হোক, প্রত্যেকটি কর্মপ্রক্রিয়া হাত দিয়ে করতে হবে, প্রত্যেকটিই বজায় রাখে হস্তশিল্পের চরিত্র, কাজে কাজেই প্রত্যেকটিই নির্ভর করে ব্যক্তিগত কর্মী কতটা শক্তি, দক্ষতা, ক্ষিপ্রতা ও প্রত্যয়ের সঙ্গে তার হাতিয়ারগুলি ব্যবহার করে, তার উপরে। হস্তশিল্পই কাজ করতে থাকে ভিত্তি হিসাবে। শিল্প উৎপাদনের কোন একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার সত্যকার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এই সংকীর্ণ কৃৎকৌশলগত ভিত্তির দরুণ বাঙ্গ পড়ে যায়, কেননা এটা এখনো একটা শর্ত যে, উৎপন্ন দ্রব্যটি যে সমস্ত প্রত্যংশ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পার হয়, সেগুলির প্রত্যেকটি প্রক্রিয়াকেই অবশ্যই এমন হতে হবে যে, তাকে হাতের সাহায্য সম্পাদন করা যায় এবং একটি আলাদা হস্তশিল্প হিসাবে গঠন করা যায়। এই কারণেই যেহেতু, হস্তশিল্প-সুলভ দক্ষতা এই ভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভিত্তি হিসাবে চালু থাকে, ঠিক সেই হেতুই প্রত্যেকটি কর্মীকে এক-একটি আংশিক কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তার বাকি জীবনের জন্য তার শ্রমশক্তি এই খণ্ড কাজটির উপায়মাত্রে পরিণত হয়।
দ্বিতীয়ত, এই শ্রম বিভাগ হচ্ছে এক ধরনের সহযোগ এবং এর অসুবিধাগুলির অনেকটাই উদ্ভূত হয় সহযোগের সাধারণ চরিত্র থেকে, তার এই বিশেষ রূপটি থেকে নয়।
————
১. একটি আরো আধুনিক দৃষ্টান্ত : লায়ন্স ও নাইমূস-এর রেশম সুতোকাটা ও Catati “est toute patriarcale; elle emploie beaucoup de femmes et d’enfants, mais sans les epuiser ni les corrompre; elle les laisse dans leur belles vallees de la Drome, du Var, de l’Isere, de Vaucluse, pour y elever des vers et devider leurs cocos; jamais elle p’entre dans une veritable fabrique. Pour etre aussi bien observe… le principe de la division du travail s’y revet d’un caractere special Ily a biendes devideuses des moulineurs, des teinturiers, des encolleurs, puis des tisserands; mais ils ne sont pas reunis dans un meme etablissement. ne dependent pas d’un meme maitre tous ils sontindependants.” (A. Blanqui :“Cours d’Econ. Industrielle.” Recueilli-Para. Blais. Paris, 1838-39, p. 79 )। কি একথা লেখার পর থেকে বিভিন্ন ধরনের স্বতন্ত্র শ্রমিক, কিছু মাত্রায়, বিবিধ কারখানায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। [ এবং মার্কস উল্লিখিত কথা লেখার পর থেকে, শক্তিচালিত তাঁত এই সব কারখানা আক্রমণ করেছে, এবং, এখন—১৮৬৬ সালেহস্তচালিত তাঁতকে দ্রুতবেগে স্থানচ্যুত করছে। (চতুর্থ জার্মান সংস্করণে সংযোজিত। এ ব্যাপারে কেড়ে রেশম শিল্পেরও কিছু বলা আছে)-এফ এঙ্গেলস ]
.
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ — প্রত্যংশ শ্রমিক[১] ও তার উপকরণাদি
আমরা যদি এখন আরো একটু বিশদ আলোচনায় যাই, তা হলে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, একজন শ্রমিক যদি তার সাৱা জীবন একই অভিন্ন সরল সহযোগে নিযুক্ত থাকে, তা হলে তার সমগ্র দেহটি সেই কর্মপ্রক্রিয়ার একটি স্বয়ংক্রিয়, বিশেষীকৃত যকে রূপান্তরিত হয়ে যায়। কাজে কাজেই, যে কারিগরকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি গোটা প্রণালীর সব কটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়, তার চেয়ে ঐ কাজটি করতে তার অল্পতর সময় লাগে। কিন্তু যে যৌথ শ্রমিকটি হচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারের জীবন্ত যন্ত্র, সে সম্পূর্ণ ভাবেই এই ধরনের বিশেষীকৃত প্রত্যাশ ( ‘ডিটেল’) শ্রমিকদের দ্বারাই গঠিত। সুতরাং স্বতন্ত্র হস্তশিল্পের তুলনায় একটি নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদনের পরিমাণ হয় অধিকতর কিংবা শ্রমিকের উৎপাদিকা শক্তি হয় বর্ধিত।[২] অধিকন্তু, যখন এই ভগ্নাংশিক কাজ প্রতিষ্ঠিত হয় একজন ব্যক্তির একান্ত কার্য হিসাবে, তখন প্রযুক্ত পদ্ধতিগুলিরও উৎকর্ষ সাধিত হয়। একই সরল কাজের অবিরত পুনরাবৃত্তি এবং তার উপরে তার একান্ত মনোনিবেশ শ্রমিককে তার অভিজ্ঞতা দিয়ে শেখায় কত কম খাটুনির সাহায্যে ঈগিত ফল লাভ করা যায়। কিন্তু যেহেতু সব সময়েই কয়েক প্রজন্মের শ্রমিক একই সময়ে বাস করে এবং একটি নির্দিষ্ট দ্রব্য ম্যানুফ্যাকচারে একত্রে কাজ করে, সেইহেতু এই ভাবে অর্জিত উক্ত বৃত্তিটির কারিগরি কলাকৌশল প্রচলন লাভ করে এবং সঞ্চিত হতে হতে উত্তরাগতদের হাতে হস্তান্তরিত হয়।[৩] বাস্তবিক পক্ষে, ব্যাপক জনসমাজ হাতের কাছে প্রচলিত অবস্থায় পাওয়া, স্বাভাবিক ভাবে বিকশিত বৃত্তি-বিভাজনকে কর্মশালার অভ্যন্তরে পুনরুৎপাদিত ও ধারাবাহিক ভাবে চূড়ান্ত মাত্রায় বিকশিত করে ম্যানুফ্যাকচার প্রত্যংশ ( ‘ডিটেল’ ) শ্রমিকের দক্ষতা উৎপাদন করে। অপর পক্ষে, একজন মানুষের ভগ্নাংশিক কাজের এই আজীবন জীবিকায় রূপান্তরণে এমন একটা প্রবণতা আত্মপ্রকাশ করে, যা পূর্ববর্তী সমাজ-সমুহে বিভিন্ন বৃত্তিকে বংশানুক্রমিক করে, হয়, সেগুলিকে বিভিন্ন জাতি-বর্ণে শিলীভূত রূপদান করে আর, নয়ত, যেখানে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতির ফলে ব্যক্তিমানসে এমন একটি প্রবণতার জন্ম হয়, যা তাকে জাতি-বর্ণের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিহীন মানসিকতায় পরিবর্তিত করে, সেখানে সেগুলিকে প্রস্তরীভৃত আকার দান করে। যে প্রাকৃতিক নিয়মটি উদ্ভিদ ও প্রাণীদের বিভিন্ন প্রজাতি ও প্রকারে পৃথগীভূত হবার ঘটনাটিকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই একই নিয়মটির কার্যকারিতার ফলে জাতি ও গিল্ড-এর উদ্ভব ঘটে, তবে একটি ক্ষেত্রে ছাড়া বিকাশের একটি বিশেষ মাত্রায় উপনীত হবার পরে জাতির বংশানুক্রমিতা ও গিলতে এক-পৰ্বত নির্দেশিত, হয় সমাজের নিয়ম হিসাবে। [৪] “সূক্ষ্মতার দিক থেকে ঢাকার মসলিন, উজ্জ্বল ও অস্থায়ী, বর্ণাঢ্যতার দিক থেকে করমণ্ডলের ক্যালিকো ও অন্যান্য সামঞ্জসম্ভার আজও অনতিক্রান্ত। অথচ মূলধন, যন্ত্রপাতি, এমবিভাগ এক যেসব উপায় ইউরোপের ম্যানুফ্যাকচারকারী স্বার্থকে এত সুবিধা দিয়ে থাকে, সেসবের কোনো কিছুর সুযোগ ছাড়াই ঐ মসলিন,ক্যালিকো ইত্যাদি উৎপাদিত হয়। যে তন্তুবায় তা করে, সে একজন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিমাত্ৰ; কোন ক্রেতার কাছ থেকে ফরমায়েস পেলেই কেবল সে কোনক্রমে জোড়াতালি-দেওয়া কয়েকটি ডাল বা কাঠের টুকরো দিয়ে স্কুলত ভাবে তৈরি তার তাঁতের সাহায্যে সে বোনে সেই উর্ণজাল। এমনকি টানা সুতো গুটিয়ে রাখবার মত সাজ-সরঞ্জামও নেই; তাঁতটিকে প্রসারিত করে রাখতে হয় তার পুরো দৈর্ঘ্যে; ফলে তা এমন বেয়াড়া ধরণের বড় হয়ে যায় যে, সেটি প্রস্তুতকারকের কুটিরের মধ্যে ধরে না; তাই সে তখন বাধ্য হয় খোলা জায়গায় তার কাজ চালাতে, যার ফলে আবহাওয়ার প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে তা ব্যাহত হয়।[৫] বংশপরম্পরায় সঞ্চিত এবং পিতা থেকে পুত্রের হাতে সঞ্চারিত বিশেষ কুশলতাই কেবল ভারতীয়কে দিয়ে থাকে এই নৈপুণ্য, যেমন দিয়ে থাকে মাকড়সাকে। কিন্তু তবু একজন ম্যানুফ্যাকচার-শ্রমিকের তুলনায় একজন হিন্দু (ভারতীয়) তাঁতীর কাজ ঢের বেশি জটিল।
