২১. “একই কাজে অনেকের একত্রে ঐক্যবদ্ধ দক্ষতা, পরিশ্রম ও প্রতিযোগিতা কি তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার একটি পন্থা হবে না? এবং ইংল্যাণ্ড যে তার পশম শিল্পোৎপাদনকে এত নিখুত করে তুলেছে, তা কি অন্য কোন ভাবে সম্ভব হত? (বার্কলে, “দি কোয়েরিস্ট”, পৃঃ ৫৬, অনুচ্ছেদ : ৫২১)।
১৪. ম্যানুফ্যাকচারের দ্বিবিধ উৎপত্তি
চতুর্দশ অধ্যায় — শ্রম বিভাগ ও ম্যানুফ্যাকচার
প্রথম পরিচ্ছেদ — ম্যানুফ্যাকচারের দ্বিবিধ উৎপত্তি
শ্রম-বিভাগের উপরে যে সহযোগের ভিত্তি, ম্যানুফ্যাকচারে তার প্রতিভূ-রূপ ধারণ করে এবং ম্যানুফ্যাকচারের যুগ’ বলতে সঠিক ভাবে যে যুগটিকে অভিহিত করা যায়, সেটা গোটা যুগটি জুড়ে তা থাকে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-প্রক্রিয়ার চরিত্র-রূপ। মোটামুটি ভাবে বলা যায়, যোড়শ শতকের মধ্য ভাগ থেকে শুরু করে অষ্টাদশ শতকের শেষ তৃতীয় ভাগ পর্যন্ত এইযুগের বিস্তৃতি।
ম্যানুফ্যাকচারের উদ্ভব ঘটে দুভাবে : (১) একটি মাত্র কর্মশালায় একজন মাত্র ধনিকের নিয়ন্ত্রণে নানাবিধ আলাদা আলাদা হস্তশিল্পের অন্তর্গত কারিগরদের সমাবেশ সম্পূর্ণ হতে হলে কোন জিনিসকে অবশ্যই এই কারিগরদের হাত দিয়ে পার হতে হবে। যেমন, একটি শকট অতীতে ছিল বহুসংখ্যক আলাদা আলাদা কারিগরের শ্রমের ফল, যথা হইলরাইট’ (যারা চাকা বানায়), হারনেস-মেকার’ ( যারা পশুটির সাজ-সরঞ্জাম তৈরি করে), টেইলর (যারা দর্জির কাজ করে ), লক-স্মিথ (যারা তালা-চাবি ইত্যাদি বানায় ), আপহলস্টার (যারা ভিতরের গদি-সাজসজ্জা ইত্যাদি তৈরি করে), “টার্নার (যারা কুঁদ বা খরাদের কাজ করে ), ‘ফ্রিঞ্জ-মেকার (যারা ঝালর বানায়, ‘গেডিয়ার (যারা কঁচ বসায় ), ‘পেইন্টার (যারা রঙের কাজ করে ), ‘পলিশার (যারা পালিশের কাজ করে ), গিভার (যারা গিলটি করে) ইত্যাদি ইত্যাদি। শকট-ম্যানুফ্যাকচারের কাজে কিন্তু এই সমস্ত কারিগর একই বাড়িতে সমবেত হয়। যেখানে তারা পরস্পরের হাত থেকে হাতে কাজ করে। এটা ঠিক যে, একটি শকট তৈরি হয়ে যাবার আগে সেটাকে গিটি করা যায় না। তবে একসঙ্গে যদি অনেকগুলি শকট তৈরি করা হয়, তা হলে কয়েকটি যখন গিটিকারদের হাতে, তখন কয়েকটি ‘আবার পূর্ববর্তী কোন এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে। এতদূর পর্যন্ত আমরা এখনো রয়েছি সরল সহযোগের পর্যায়ে, যে পর্যায়ে মাল-মশলাগুলি মানুষ ও জিনিসের আকারে হাতের কাছেই প্রস্তুত থাকে। কিন্তু অচিরেই ঘটে যায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। দরজি, তালা-মিস্ত্রি প্রভৃতিরা একমাত্র শকটের কাজেই একান্ত ভাবে নিযুক্ত, থাকায় তাদের প্রত্যেকেই অভ্যাসের অভাবে নিজ নিজ পুরনো হস্তশিল্পটি পুরোপুরি ভাবে সম্পাদন করার সামর্থ্য ক্রমে ক্রমে হারিয়ে ফেলে। কিন্তু অন্যদিকে, এখন তার কাজকর্ম একটি ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়ায়, তা ধারণ করে এমন একটি রূপ যা এই সংকীর্ণ কর্মপরিধির সঙ্গে সবচেয়ে বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ। ধাপে ধাপে শকট তৈরির কাজটি তার বিভিন্ন প্ৰত্যংশ-প্রক্রিয়ায় বিভক্ত হয়ে যায়, তাদের প্রত্যেকটি আবার পরিণতি লাভ করে এক-একজন বিশেষ কারিগরের একান্ত কাজ হিসাবে, সমগ্র ভাবে ম্যানুফ্যাকচারটি সম্পাদিত হয় সম্মিলিত ভাবে বহু লোকের দ্বারা। এই একই ভাবে একজন মাত্র ধনিকের নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন হস্তশিল্পের সংযোজনের মাধ্যমেই কাপড় তৈরির মত আরো একগাদা জিনিসের ম্যানুফ্যাকচারের উদ্ভব ঘটে।[১]
(২) উল্লিখিত প্রক্রিয়ার ঠিক বিপরীত প্রক্রিয়াতেও ম্যানুফ্যাকচারের উদ্ভব ঘটে, যেমন, কাগজ, হরফ বা সুচ তৈরির মত একই কাজ বা একই ধরনের কাজ করে, এমন বহুসংখ্যক কারিগরকে একই কারখানায় একজন মাত্র ধনিকের দ্বারা নিয়োগের প্রক্রিয়ায়। এটা হচ্ছে সবচেয়ে সরল ধরনের সহযোগ। এই কারিগরদের প্রত্যেকে (সম্ভবত দু-একজন শিক্ষানবিশের সাহায্য নিয়ে গোটা জিনিসটিকে তৈরি করে এবং স্বভাবতই সেই জিনিসটি উৎপাদন করতে যেসব প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়, সেগুলি সে একাই পরপর সম্পাদন করে। সে কাজ করে তার পুরনো হস্তশিল্পেরই কায়দায়। কিন্তু অতি শীগ্রই বাইরের ঘটনাবলী একই জায়গায় বহুসংখ্যক কর্মীর এই সমাবেশকে এবং তাদের কাজের এই যুগপৎ সম্পাদনকে অন্য একটি কাজে ব্যবহার করতে বাধ্য করে। হয়তো একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্য জিনিসটির একটি বাড়তি পরিমাণ যোগাতে হবে। সুতরাং কাজটির পুনর্বণ্টন করা হয়। প্রত্যেকটি লোককে পরপর সব কটি প্রক্রিয়া না করতে দিয়ে, এই প্রক্রিয়াগুলিকে বিচ্ছিন্ন খণ্ড খণ্ড প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত করা হয় যেগুলি সম্পাদিত হবে পাশাপাশি; এক একটি খণ্ড প্রক্রিয়ার ভার দেওয়া হয় এক-একজন কর্মীকে এবং গোটা কাজটি যুগপং সম্পাদিত হয় পরস্পর-সহযোগী কর্মীদের দ্বারা। এই আপতিক পুনর্বণ্টন পুনরাবর্তিত হয়; নোতুন সুবিধার উদ্ভব ঘটায় এবং কালক্রমে সুব্যবস্থিত শ্ৰম-বিভাগে দৃঢ় রূপে পর্যবসিত হয়। পণ্যটি আর কোন একজন স্বতন্ত্র কারিগরের ব্যক্তিগত ম-ফল না থেকে, একটি কারিগর-সমষ্টির সামাজিক ম-ফলে পরিণত হয়, ঐ কারিগরদের এক-একজন যার এক-একটি আংশিক প্রক্রিয়া সম্পাদন। করছে। যেখানে একটি জার্মান গিল্ড-এর একজন কাগজ-নির্মাতার ক্ষেত্রে যে-প্রক্রিয়াগুলি একজন কারিগরের পরপর-করণীয় কাজ হিসাবে পরস্পরের মধ্যে মিলে যেত, সেই প্রক্রিয়াগুলিই আবার একটি ওলন্দাজ কাগজ-ম্যানুফ্যাকচারে সম্পাদিত হত বহুসংখ্যক কারিগরের দ্বারা পাশাপাশি-সম্পাদিত অনেকগুলি আংশিক প্রক্রিয়া হিসাবে। নুরেমবার্গ গিল্ড-এর সুচ নির্মাতা ছিল ভিত্তিপ্রস্তর, যার উপরে নির্মিত হয়েছিল ইংরেজ সুচ ম্যানুফ্যাকচারের সৌধ। কিন্তু সেখানে নুরেমবার্গে একজন মাত্র কারিগর সম্পাদন করত পরপর সম্ভবতঃ ২০টি প্রক্রিয়া, সেখানে ইংল্যাণ্ডে, বেশি দিন আগে নয়, ২০ জন সুচ-নির্মাতা পাশাপাশি প্রত্যেকে সম্পাদন করত ঐ ২০টি প্রক্রিয়ার মধ্যে মাত্র। একটি প্রক্রিয়া; এবং আরো অভিজ্ঞতার কল্যাণে এই ২০টি প্রক্রিয়ার প্রত্যেকেটিই আবার হল খণ্ডিত ও বিভক্ত এবং ন্যস্ত হল এক একজন আলাদা আলাদা কারিগরের একান্ত দায়িত্বে।
