সরল সহযোগের বিরাট বিরাট ফলশ্রুতি প্রাচীন এশিয়াবাসী, মিশরবাসী, এরিয়া বাসী প্রভৃতিদের অতিকায় ইমারতগুলির মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। “অতীত কালে এমন ঘটেছে যে প্রাচ্যের এই রাষ্ট্রগুলি নিজেদের সামরিক ও অসামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহের খরচ যুগিয়েও, নিজেদের অধিকারে এমন পরিমাণ উদ্বুত্ত পেত, যা তারা জমকালো বা প্রয়োজনীয় নির্মাণকার্যে প্রয়োগ করতে পারত এবং এই সমস্ত নির্মাণকার্যে প্রায় সমগ্র অ-কৃষক জনসংখ্যার হাত ও বাহুর উপরে তাদের কর্তৃত্ব সৃষ্টি করেছে বিশাল বিশাল সৌধ, যা আজও তাদের শক্তির পরিচয় বহন করে। নীল নদের উর্বর উপত্যকা দ্রুত বর্ধমান অ-কৃষক জনসংখ্যার জন্য খাদ্য উৎপাদন করত এবং রাজা ও পুরোহিততন্ত্রের মালিকানাধীন এই খাদ্যসম্ভার বিশাল বিশাল সৌধ নির্মাণের ব্যয়ভার যোগাত যে সৌধগুলি ভরে রেখেছিল গোটা দেশটিকে। অতিকায় মূর্তিসমূহ ও তাদের সুবিশাল আকার, যাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহণ বিস্ময় সৃষ্টি করে, সেগুলির স্থানান্তর সাধনে অমিত হস্তে ব্যবহৃত হয়েছিল প্রায় একক ভাবেই মনুষ্য-প্রম। শ্রমিকদের সংখ্যা ও একত্রীভূত চেষ্টাই ছিল যথেষ্ট। আমরা দেখি সমুদ্রগর্ভ থেকে উখিত বিশাল প্রবালশূপের দ্বীপ ও সুদৃঢ় ভূমিতে তার পরিণতি, যদিও প্রত্যেকটি প্রবালের একক অবদান ক্ষুদ্র, দুর্বল ও অবজ্ঞেয়। এশীয় রাজতন্ত্রের অধীনস্থ অ-কৃষক শ্রমিকদের ব্যক্তিগত শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া দেবার মত আর কিছুই ছিল না। কিন্তু তাদের সংখ্যাই তাদের বল এবং এই জনসমষ্টিগুলিকে চালাবার শক্তিই উদ্ভব ঘটিয়েছে কত প্রাসাদ ও মন্দিরের, কত পিরামিড ও অতিকায় মূর্তিবাহিনীর, যাদের ধ্বংসাবশেষগুলি পর্যন্ত আমাদের বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দেয়। এক বা কয়েকের হাতে কেন্দ্রীভূত রাজস্ব থেকে তাদের পোষণ করা হত বলেই এই ধরনের কর্মকাণ্ড সম্ভব হয়েছিল।[১৯] এশীয় ও মিশরীয় রাজাদের এবং এরিয়ার দিব্য শাসক প্রভৃতিদের এই শক্তি এখন স্থানান্তরিত হয়েছে ধনিকের হাতে, তা সে একজন বিচ্ছিন্ন ধনিকই হোক কিংবা যৌথ মূলধনী প্রতিষ্ঠানগুলির মত সমষ্টিগত ধনিকই হোক।
মানবিক বিকাশের ঊষাকালে আমরা মৃগয়াজীবী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে[২০] অথবা, ধরুন, ভারতীয় জনসমাজগুলির কৃষিকার্যের মধ্যে যে ধরনের সহযোগ লক্ষ্য করি, তার ভিত্তি ছিল, একদিকে, উৎপাদনের উপায়গুলির উপরে যৌথ মালিকানা এবং, অন্যদিকে, এই ঘটনাটির উপরে যে, ঐসব ক্ষেত্রে, প্রত্যেকটি মৌমাছি তার মৌচাকের সঙ্গে ঘটা সংযোগ-বিচ্ছিন্ন, তার তুলনায় প্রত্যেকটি ব্যক্তি তার গোষ্ঠী বা সমাজের সঙ্গে তার নাড়ির সংযোগ থেকে বেশি বিচ্ছিন্ন নয়। উল্লিখিত এই দুটি বৈশিষ্ট্যের দিক থেকেই এই সহযোগ ধনতান্ত্রিক সহযোগ থেকে ভিন্ন। প্রাচীন কালে, মধ্যযুগে এবং আধুনিক উপনিবেশগুলিতে যে সহযোগের বৃহদায়তন প্রয়োগের বিক্ষিপ্ত দৃষ্টান্ত লক্ষিত হয়, তার ভিত্তি হচ্ছে আধিপত্য ও বন্যার সম্পর্কের উপরে, প্রধানতঃ ক্রীতদাসত্বর উপরে। বিপরীত দিকে, সহযোগের ধনতান্ত্রিক রূপটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে নেয় স্বাধীন মজুরি-শ্রমিকের অস্তিত্ব, যে তার শ্রমশক্তিকে বিক্রয় করে ধনিকের কাছে। ঐতিহাসিক ভাবে, অবশ্য এই রূপটি বিকশিত হয় ক্ষুদ্র চাষীর কৃষিকর্ম ও স্বাধীন হস্তশিল্পের সঙ্গে বিরোধিতার পথে, তা সে হস্তশিল্প গিলডের অভ্যন্তরেই হোক বা না-ই হোক।[২১] এই সবকিছুর পরিপ্রেক্ষিতে, ধনতান্ত্রিক সহযোগ, সহযোগের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক রূপ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেনা বরং স্বয়ং সহযোগই আত্মপ্রকাশ করে এমন একটি ঐতিহাসিক রূপ হিসাবে, যা উৎপাদনের ধনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বকীয় ও বিশেষ ভাবে পার্থক্য-সূচক একটি বৈশিষ্ট্য।
সহযোগিতা দ্বারা বিকশিত শ্রমের সামাজিক উৎপাদিকা শক্তি যেমন প্রতীয়মান হয় মূলধনের উৎপাদিকা শক্তি হিসাবে, ঠিক তেমনি বিচ্ছিন্ন, স্বতন্ত্র শ্রমিকের দ্বারা, এমনকি, ক্ষুদ্র নিয়োগকারীদের দ্বারা সম্পাদিত উৎপাদন-প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রতিতুলনায় স্বয়ং সহযোগও প্রতীয়মান হয় ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট রূপ হিসাবে। চলমান শ্রম-প্রক্রিয়া যখন মূলধনের নিয়ন্ত্রণাধীনে আসে, তখন এই পরিবর্তনই হয় তার প্রথম অভিজ্ঞতা। এই পরিবর্তন ঘটে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে। একই অভিন্ন প্রক্রিয়ায় বহুসংখ্যক শ্রমিকের নিয়োগ, যা এই পরিবর্তনের একটি আবশ্যিক শর্ত, তাই আবার ধনতান্ত্রিক উৎপাদনেরও সূচনা-বিন্দু। স্বয়ং মূলধনের জন্ম এই সূচনা-বিন্দুর সমকালীন। তা হলে, যদি একদিকে, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-প্রক্রিয়া আমাদের কাছে ঐতিহাসিক ভাবে আত্মপ্রকাশ করে সামাজিক প্রক্রিয়ায় শ্রম-প্রক্রিয়ায় রূপান্তরণে আবশ্যিক শর্ত হিসাবে, তা হলে, অন্যদিকে, শ্রম-প্রক্রিয়ার এই সামাজিক রূপ আত্মপ্রকাশ করে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে তার অধিকতর লাভজনক ব্যবহার হিসাবে।
প্রাথমিক রূপে, যে রূপটিতে আমরা তাকে এতক্ষণ দেখেছি, সহযোগ সমস্ত বৃহদায়তন উৎপাদনেরই একটি আবশ্যিক অনুষঙ্গ। কিন্তু ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-প্রক্রিয়ার বিকাশে একটি বিশেষ যুগের বৈশিষ্ট্যসূচক কোন নির্দিষ্টরূপের প্রতিনিধিত্ব করেনা। বড় জোর, তা তেমন কিছু করে বলে মনে হতে পারে, তাও মোটামুটি ভাবেই, কেবল দুটি ক্ষেত্রে প্রথমত, ম্যানুফ্যাকচারের হস্তশিল্পবৎ সুচনার মধ্যে এবং, দ্বিতীয়ত, কৃষি-কর্মের সেই বৃহদায়তন রূপের মধ্যে, যা ম্যানুফ্যাকচার-যুগের সহগামী এবং যা যুগপৎ কর্মনিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা ও তাদের ব্যবহারের জন্য কেন্দ্রীকৃত উৎপাদন উপকরণাদির বিপুল সমাবেশের দ্বারা বিশেষিত। উৎপাদনের যেসব শাখায় মূলধন বৃহদায়তনে কাজ করে এবং শ্রম ও যন্ত্রপাতির বিভাজন কেবল গৌণ ভূমিকা পালন করে, সে সব শাখায় সরল সহযোগই হচ্ছে প্রচলিত রূপ।
