ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের পরিচালিকা প্রেরণা, তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে যথাসম্ভব অধিকতম পরিমাণ উত্তমূল্য আদায় করে নেওয়া এবং স্বভাবতই শ্রমশক্তিকে যথাসম্ভব অধিকতম মাত্রায় শোষণ করা।[১৪] সহযোগকারী শ্রমিকদের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পায়, মূলধনের আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধও ততটা বৃদ্ধি পায় এবং সেই সঙ্গে পালটা চাপের সাহায্যে তাদের প্রতিরোধকে অতিক্রম করার আবশ্যকতাও বৃদ্ধি পায়। ধনিক যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ভোগ করে, তা কেবল সামাজিক শ্রম-প্রক্রিয়ার প্রকৃতি ও সেই প্রকৃতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের দরুণই নয়, উপরন্তু সেই সঙ্গে এটা সামাজিক শ্রম প্রক্রিয়া শোষণের একটি অনুষঙ্গও বটে এবং স্বভাবতই এক দিকে শোষক ও অন্য দিকে জীবন্ত ও শ্রমরত কাঁচামাল, যা সে শোষণ করে—এই দুয়ের মধ্যকার অপরিহার্য বৈরিতার মধ্যে প্রথিতও বটে।
আবার উৎপাদনের উপায়-উপকরণ, যা এখন আর শ্রমিকের সম্পত্তি নয়, মালিকের সম্পত্তি, তার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবার অনুপাতে, এইসব উপায়-উপকরণের সঠিক প্রয়োগের উপরে কার্যকরী নিয়ন্ত্রণের আবশ্যকতাও বৃদ্ধি পায়।[১৫] অধিকন্তু, মজুরি শ্রমিকদের এই সহযোগ সমগ্র ভাবেই সংঘটিত হয় মূলধনের দ্বারা, যে মূলধন তাদের নিয়োগ করে। একটি উৎপাদক-সমষ্টিতে তাদের সম্মেলন এবং তাদের ব্যক্তিগত কাজকর্মগুলির মধ্যে সংযোগ-সাধন তাদের কাছে অপরিচিত ও বহিরাগত; এই ব্যাপার দুটি তাদের কাজ নয়, কিন্তু মূলধনটির কাজ হচ্ছে যে সে তাদের এক জায়গায় জড় করে এবং একত্রিত রাখে তার কাজ। সুতরাং তাদের বিভিন্ন ধরনের শ্রমের মধ্যে এই সংযোগ তাদের কাছে ভাগবত ভাবে প্রতীয়মান হয় ধনিকের একটি পূর্ব-চিন্তিত পরিকল্পনার আকারে এবং কার্যত সেই ধনিকের কর্তৃত্বের আকারে, যে ব্যক্তি তাদের কাজকর্মকে তার নিজের উদ্দেশ্যে বশীভূত করেছে এমন অন্য একজনের ইচ্ছাশক্তির আকারে। যদি সেক্ষেত্রে ধনিকের নিয়ন্ত্রণ খোদ উৎপাদন-প্রক্রিয়ার নিজেরই দ্বিবিধ প্রকৃতির দরুণ মর্মগত ভাবে দ্বিবিধ হয়—যে-উৎপাদন-প্রক্রিয়া, এক দিক থেকে, ব্যবহার-মূল্য উৎপাদনের জন্য একটি সামাজিক প্রক্রিয়া এবং, অন্য দিক থেকে, উত্তমূল্য উৎপাদনের জন্যও একটি প্রক্রিয়া, তা হলে রূপগত ভাবে তা স্বৈরতান্ত্রিক। সহযোগের আয়তন যতই বৃদ্ধি পায়, এই স্বৈরতন্ত্রও ততই একান্ত ভাবে স্বকীয় বিশেষ বিশেষ ধারণ করে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন বলতে যা বোঝায়, তা শুরু করার মত ন্যূনতম পরিমাণে মূলধন পৌছে গেলেই যেমন প্রথমে ধনিক সত্যকার শ্রম থেকে নিষ্কৃতি পায়, ঠিক তেমনি এখন সে ব্যতিগত শ্রমিকদের ও শ্রমিক-গোষ্ঠীদের প্রত্যক্ষ ও নিরন্তর তদারকির কাজ এক বিশেষ ধরনের মজুরি-শ্রমিকের হাতে তুলে দেয়। সত্যকার সেনাবাহিনীর মত, শিল্প-শ্রমিক বাহিনীরও চাই একজন ধনিকের অধিনায়কত্বের অধীনে উপযুক্ত সংখ্যক অফিসার (ম্যানেজার) ও সার্জেন্ট (ফোরম্যান ও ওভারসিয়ার ), যারা কাজ চলাকালে ধনিকের নামে নির্দেশ দেয়। তদারকির কাজই হয় তাদের সুনির্দিষ্ট ও একমাত্র কাজ। দাসশ্রম কর্তৃক উৎপাদনের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন কৃষক ও কারিগরদের উৎপাদন-পদ্ধতি তুলনা করার সময়ে অর্থনীতিবিদ তদারকির এই শ্রমকে গণ্য করেন উৎপাদনের ‘faux taris হিসাবে।[১৬] ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির বিবেচনাকালে তিনি কিন্তু উল্টো ভাবে, শ্রম প্রক্রিয়ার সহযোগী প্রকৃতি-জনিত এই নিয়ন্ত্রণের কাজটিকে উক্ত প্রক্রিয়ার ধনতান্ত্রিক প্রকৃতি-জনিত এবং ধনিক ও শ্রমিকের সংঘাত-জনিত এই নিয়ন্ত্রণের ভিন্নতর কাজটির সঙ্গে অভিন্ন বলে গণ্য করে থাকেন।[১৭] কোন লোক শিল্পের নেতা বলেই ধনিক নয়, বরং সে ধনিক বলেই শিল্পের নেতা। যেমন, সামন্ততান্ত্রিক আমলে ভূমি-সম্পত্তির চরিত্র বৈশিষ্ট্য ছিল সেনাপতি ও বিচারকের কাজ, ঠিক তেমনি মূলধনের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শিল্পের নেতৃত্ব।[১৮]
যে পর্যন্ত না শ্রমিক তার শ্রমশক্তিকে বেচে দেবার জন্য ধনিকের সঙ্গে তার দর কষাকষি সম্পন্ন করেছে, সে পর্যন্ত সে তার শ্রমশক্তির মালিক থাকে; এবং তার যা আছে তার বেশি, অর্থাৎ তার ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্ন-শ্রমশক্তির বেশি, সে কিছু বিক্রি করতে পারে না। একজন মানুষের শ্রমশক্তির জায়গায় ধনিক যে ১০০ জনের শ্রমশক্তি জয় করে, এবং একজনের জায়গায় ১০০ জন অসযুক্ত মানুষের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুত্তিতে প্রবেশ করে, এই ঘটনার দ্বারা উল্লিখিত পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনা। তাদের পরস্পরের সঙ্গে সহযোগ করতে না দিয়ে ধনিক ঐ ১০০ জন মানুষকে কাজে লাগাবার স্বাধীনতা ভোগ করে। সে তাদেরকে প্রদান করে ১০০ আলাদা আলাদা স্বতন্ত্র শ্রমশক্তির মূল্য, কিন্তু ঐ ১০০ জনের সংযোজিত শ্রমশক্তির মূল্য প্রদান করে না। যেহেতু পরস্পর-নিরপেক্ষ, সেহেতু শ্রমিকেরা হল ভিন্ন ভিন্ন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি, যারা ধনিকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে নয়। পরস্পরের সঙ্গে এই সহযোগ শুরু হয় কেবল শ্রম-প্রক্রিয়া শুরু হবার সঙ্গেই, কিন্তু তখন তারা আর নিজেদের মালিক থাকে না। শ্রম-প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে তারা মূলধনের সঙ্গে সংবদ্ধ হয়। সহযোগকারী হিসাবে, একটি কর্ম-নিযুক্ত সংগঠন হিসাবে, তারা পরিণত হয় মূলধনেরই অস্তিত্বের বিশেষ বিশেষ ধরণে। সুতরাং পারস্পরিক সহযোগে কাজ করার সময়ে শ্রমিক যে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটায়, তা মূলধনেরই উৎপাদিকা শক্তি। যখনি শ্রমিকদেরকে বিশেষ অবস্থায় স্থাপন করা হয়, তখনি বিনামূল্যে এই উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটে। এবং সেই বিশেষ অবস্থায় মূলধনই তাদেরকে স্থাপন করে। যেহেতু এই উৎপাদিকা শক্তির জন্য মূলধনের কিছুই ব্যয় হয় না অথচ যেহেতু অন্য দিকে তার শ্রম মূলধনের মালিকানায় যাবার আগে শ্রমিক নিজে তা উৎপাদন করেনা, সেহেতু তা প্রতীয়মান হয় এমন একটি শক্তি হিসাবে যা দিয়ে প্রকৃতি যেন মূলধনকে সমৃদ্ধ করেছে- এমন একটি উৎপাদিকা শক্তি যা যেন মূলধনেই অন্তর্নিহিত।
