আলাদা আলাদা শ্রম-দিবসের যোগফল একটি সংযোজিত শ্রম-দিবসের সমান হলেও প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টি বৃহত্তর পরিমাণ ব্যবহারমূল্য উৎপাদন করে এ এইভাবে একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনীয় ফল উৎপাদনের জন্য আবশ্যিক শ্রম-সময়ের হ্রাসসাধন করে। যেহেতু তা শ্রমের যান্ত্রিক শক্তি বাড়িয়ে দেয় কিংবা তার কাজের পরিধিকে একটি বৃহত্তর জায়গায় ছড়িয়ে দেয় কিংবা উৎপাদনের আয়তনের তুলনায় উৎপাদনের ক্ষেত্রটিকে ছোট করে আনে কিংবা সংকট মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ শ্রমকে কাজে লাগায় কিংবা ব্যক্তিতে ব্যত্তিতে পরস্পরকে ছাড়িয়ে যাবার প্রেরণা যোগায়, এবং তাদের মধ্যে জৈব কর্মোদ্যম জাগিয়ে দেয় কিংবা বহুসংখ্যক মানুষের দ্বারা পরিচালিত অনুরূপ কর্ম কাণ্ডের উপরে অনবচ্ছিন্নতা ও বহুমুখিতার ছাপ একে দেয় কিংবা একই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করে কিংবা যৌথ ব্যবহারের দ্বারা উৎপাদন-উপকরণাদির সাশ্রয় ঘটায় কিংবা ব্যক্তিগত শ্রমকে সামাজিক শ্রমের চরিত্র দান করে, সেই হেতু একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সংযোজিত শ্রম-দিবসটি এই বর্ধিত উৎপাদিকা শক্তি অর্জন করে কিনা—উল্লিখিত হেতুগুলির মধ্যে যে কোনটিই এই বৃদ্ধির কারণ হোক না কেন, সংযোজিত শ্রম দিবসটির বিশেষ উৎপাদিকা শক্তিটি সমস্ত অবস্থাতেই হচ্ছে শ্রমের সামাজিক উৎপাদিকা শক্তি কিংবা সামাজিক শ্রমের উৎপাদিকা শক্তি। সহযোগই হচ্ছে এই শক্তির কারণ। শ্রমিক যখন নিয়মিত অবে অন্যান্যদের সঙ্গে সহযোগিতা করে, সে তখন তার ব্যক্তিগত চরিত্রের বন্ধনগুলি থেকে যুক্ত হয় এবং তার প্রজাতির চারিত্র-ক্ষমতাগুলির অধিকারী হয়। [১৩]
সাধারণ নিয়ম এই যে, এক জায়গায় আনীত না হলে শ্রমিকেরা সহযোগিতা করতে পারে না। তাদের এই এক জায়গায় সমাবেশ তাদের সহযোগের একটি আবশ্যিক শর্ত। সুতরাং মজুরি-শ্রমিকরা পরস্পরের সঙ্গে সহযোগ করতে পারে না, যদি তারা একই মূলধনের দ্বারা, একই ধনিকের দ্বারা, একই সঙ্গে নিযুক্ত না হয় এবং সেই কারণে একই সঙ্গে ক্রীত না হয়। এই শ্রমশক্তিসমূহের এক দিনের মোট মূ কিংবা এই শ্রমিকদের এক দিনের মজুরিসমূহের পরিমাণ উৎপাদন-প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের সমবেত করার আগেই ধনিকের পকেটে প্রস্তুত রাখতে হবে। একটা গোটা বছর জুড়ে সপ্তাহে সপ্তাহে একটি ক্ষুদ্রতর সংখ্যক মানুষের মজুরি দেবার জন্য যে মূলধন বিনিয়োগের দরকার হয়, তার তুলনায় ৩০০ শ্রমিকের এককালীন মজুরি দেবার জন্য, যদিও মাত্র এক দিনের জন্য, বৃহত্তর পরিমাণ বিনিয়োগের দরকার হয়। অতএব, সহযোগকারী শ্রমিকদের সংখ্যা অথবা উৎপাদনের আয়তন নির্ভর করে, প্রথমতঃ শ্রমশক্তি ক্রয়ের জন্য ব্যক্তিগত ধনিক কত পরিমাণ মূলধন খাটাতে পারে, তার উপরে, অর্থাৎ কত সংখ্যক শ্রমিকের জীবনধারণের উপকরণাদির ব্যবস্থা একজন নিক করতে পারে, তার উপরে।
এবং অস্থির মূলধনের ক্ষেত্রেও যেমন, স্থির মূলধনের ক্ষেত্রেও তেমন। নমুনা হিসাবে, ১০ জন করে শ্রমিক নিয়োগ করে এমন ৩০ জন ধনিকের প্রতিএকজনের বেলায় যে-পরিমাণ কাঁচা মাল বিনিয়োগের দরকার হয়, ৩০০ জন শ্রমিক নিয়োগ করে এমন একজন ধনিকের বেলায় তুলনায় ৩০ গুণ বেশি কঁচামালের দরকার হয়। একথা ঠিক যে, শ্রমিক-সংখ্যা যে-হারে বৃদ্ধি পায়, যৌথ ভাবে ব্যবহৃত শ্ৰম-উপকরণসমূহের মূল্য ওপরিমাণ সেই একই হারে বৃদ্ধি পায়না, কিন্তু তারা বেশ লক্ষণীয় ভাবেই বৃদ্ধি পায়। অতএব, মজুরি-শ্রমিকদের পারস্পরিক সহযোগের একটি বাস্তব শর্তই হচ্ছে ব্যক্তিগত ধনিকের হাতে বড় বড় পরিমাণ মূলধনের কেন্দ্রীভবন এবং এই সহযোগ কিংবা উৎপাদন-আয়তনের মাত্রা নির্ভর করে এই কেন্দ্রীভবনের উপরে।
পূর্ববর্তী এক অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে, যাতে করে যুগপৎ নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা এবং, কাজে কাজেই, উৎপাদিত উদ্বৃত্ত-মূল্যের পরিমাণ স্বয়ং নিয়োগকারীকে দৈহিক শ্রম থেকে মুক্তি দেবার পক্ষে এবং তাকে ক্ষুদ্র মালিক থেকে একজন ধনিকে রূপান্তরিত করার পক্ষে এবং আনুষ্ঠানিক ভাবে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন প্রতিষ্ঠা করার পক্ষে যথেষ্ট হয়, তার জন্য একটি বিশেষ পরিমাণ মূলধনের প্রয়োজন হয়। এখন আমরা দেখছি যে, বহুসংখ্যক বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র প্রক্রিয়াকে একটি সামাজিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করার জন্যও একটি ন্যূনতম পরিমাণ মূলধন হল একটি অপরিহার্য শর্ত।
আমরা প্রথমে আরো দেখেছিলাম যে, শ্রমিক নিজের জন্য কাজ করার পরিবর্তে কাজ করে ধনিকের জন্য এবং স্বভাবতই তার অধীনে এই ঘটনারই একটি আনুষ্ঠানিক ফলশ্রুতি হচ্ছে মূলধনের কাছে শ্রমের বশ্যতা। বহু সংখ্যক মজুৰ্বি-শ্রমিকের সহযোগের মাধ্যমে মূলধনের কর্তৃত্ব খোদ শ্রম-প্রক্রিয়াটিকেই চালিয়ে নিয়ে যাবার একটি পূর্বশর্তে, উৎপাদনের একটি যথার্থ পূর্বশর্তে পরিণতি লাভ করে। রণক্ষেত্রে সেনাপতির কর্তৃত্ব যেমন অপরিহার্য, শ্রম ক্ষেত্রেও এখন ধনিকের কর্তৃত্ব তেমন অপরিহার্য।
ব্যক্তিগত শ্রমিকদের কাজকর্মগুলিকে সুশৃঙ্খল ভাবে পরিচালিত করার জন্য এবং যে সমস্ত সাধারণ কর্তব্যগুলির উৎপত্তি সম্মিলিত সংগঠনটির বিভিন্ন অঙ্গ থেকে না ঘটে, ঘটে সমগ্র সংগঠনটি থেকে, সেই সমস্ত কর্তব্যগুলি সম্পন্ন করার জন্য সমস্ত বৃহদায়তন সম্মিলিত মেরই চাই মোটামুটি একটি নির্দেশক কর্তৃপক্ষ। একজন একক বেহালা বাদক নিজেই নিজের নির্দেশক; কিন্তু বৃন্দ-বাদনে চাই একজন স্বতন্ত্র নির্দেশক। যে মুহূর্তে মূলধনের নিয়ন্ত্রণাধীন শ্রম পরস্পর সহযোগী হয়, সেই মুহূর্ত থেকে নির্দেশনা তদারকি ও সমন্বয়সাধন মূলধনের অন্যতম কাজ হয়ে ওঠা মাত্র তা বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়।
