একটি মাত্র শক্তির মধ্যে বহু শক্তির এই সম্মিলন থেকে নোতুন একটি শক্তি উদ্ভব ছাড়াও, কেবল সামাজিক সংস্পর্শ থেকেই অধিকাংশ শিল্পে জন্ম নেয় পরস্পরকে ছাড়িয়ে যাবার প্রচেষ্টা ও প্রেরণার জৈব আবেগ, যার ফলে প্রত্যেক ব্যক্তিগত শ্রমিকের নৈপুণ্য উন্নীত হয়। সুতরাং আলাদা আলাদা ভাবে প্রত্যেকে ১২ ঘণ্টা করে কাজ করে এমন বার জন কিংবা পরপর বার দিন কাজ করছে এমন শ্রমিকের তুলনায়, একজন শ্রমিক তাদের ১৪৪ ঘণ্টার শ্রম-দিবসে টের বেশি উৎপাদন করে।[৬] এর কারণ এই যে, মানুষ একটি রাজনৈতিক জীব[৭], যে কথা অ্যারিস্তোতল বলে গেছেন, তা নাও হয়, তবু সে অবশ্যই একটি সামাজিক জীব।
যদিও এক দল মানুষ একই সময়ে একই কাজ বা একই ধরনের কাজে লিপ্ত থাকতে পারে, তবু প্রত্যেকের প্রম, সমষ্টিগত শ্রমের অংশ হিসাবে, শ্রম-প্রক্রিয়ার একটি বিশিষ্ট পর্যায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকতে পারে যে প্রক্রিয়াটির সমস্ত পর্যায়ের মাধ্যমে, সহযোগের ফলশ্রুতি হিসাবে, তাদের শ্রমের বিষয়টি অধিকতর দ্রুতগতিতে অতিক্রম করে। যেমন, যদি এক ডজন রাজমিস্ত্রি নিজেদেরকে এক সারিতে এমনভাবে স্থাপন করে, যাতে তারা একটি মইয়ের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পাথর তুলে দিতে পারে, তা হলে। তাদের প্রত্যেকেই একই জিনিস করে থাকে, তবু কিন্তু তাদের বিচ্ছিন্ন কাজগুলি হয়ে ওঠে একটি সমগ্র কর্মকাণ্ডের পরম্পর-সংযুক্ত অংশ, এই অংশগুলি হচ্ছে বিশেষ বিশেষ পর্যায় যাদের মধ্য দিয়ে প্রত্যেকটি পাথরকেই পার হতে হয়, প্রত্যেকটি লোক যদি আলাদা আলাদা ভাবে মই বেয়ে আপন আপন বোঝা নিয়ে ওঠা-নামা করত; তা হলে তারা যত তাড়াতাড়ি তা উপরে তুলতে পারত, তার চেয়ে ঢের তাড়াতাড়ি ঐ পাথর গুলিকে উপরে তোলা যায় যদি ঐ এক সারি লোকের ২৪টি হাত সে কাজটি করে।[৮]
বিষয়টিকে একই দূরত্বে বয়ে নেওয়া যায় অল্পতর সময়ের মধ্যে। আবার যখন, দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, একটি বিডিং-এর বিভিন্ন পার্শ্বে একই সঙ্গে হাত লাগানো হয়, তখনো একটি শ্রম-সংযোজন ঘটে থাকে, যদিও এখানেও সহযোগী রাজমিস্ত্রিরা একই কাজ বা একই ধরনের কাজ করতে থাকে। একজন রাজমিস্ত্রি বারো দিন বা ১৪৪, ঘণ্টা যা করে, তার চেয়ে ১২ জন রাজমিস্ত্রি তাদের ১৪৪ ঘণ্টার সমষ্টিগত শ্রম-দিবসে ঐ বিডিংটি নির্মাণে ঢের বেশি অগ্রগতি করে। এর কারণ এই যে, একসঙ্গে কর্মরত লোকদের একটি দলের পেছনে ও সামনে উভয় দিকেই হাত ও চোখ থাকে এবং একটা মাত্রা পর্যন্ত তা সর্বচারী। আর কাজটির সমস্ত অংশ যুগপৎ এগিয়ে যায়।
উল্লিখিত দৃষ্টান্তগুলিতে আমরা এই বিষয়টির উপরে জোর দিয়েছি যে, বহু মানুষ একই কাজে বা একই ধরনের কাজে লিপ্ত হয়, কেননা যৌথ শ্রমের সবচেয়ে সরল এই রূপটি সহযোগের ক্ষেত্রে একটি বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করে, এমনকি সহযোগের সর্বাপেক্ষা পূর্ণ-বিকশিত পর্যায়টিতেও। কাজটি যদি জটিল হয়, তা হলে সহযোগকারী লোকদের নিছক সংখ্যাই বিভিন্ন কর্ম-প্রক্রিয়াটিকে বিভিন্ন হাতে ভাগ বাটোয়ারা করে দেবার এবং একই সঙ্গে সেগুলিকে চালিয়ে যাবার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। গোটা কাজটি সম্পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় এইভাবে হ্রস্বীভূত হয়।[৯]
অনেক শিল্পে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটির দ্বারা নির্ধারিত সংকট সময়সীমা আছে যার মধ্যে নির্দিষ্ট কয়েকটি ফল অবশ্যই লাভ করতে হবে। যেমন, যদি একপাল ভেড়ার লোম কেটে নিতে হয়, কিংবা একটি গমের ক্ষেতের ফসল কাটতে এবং গোলাজাত করতে হয় তাহলে উৎপন্ন জিনিসটির গুণমান ও পরিমাণ নির্ভর করবে কাজটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শুরু করা ও শেষ করার উপরে। এই ধরনের ব্যাপারগুলিতে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটিতে কতটা সময় নেওয়া উচিত তা নির্দিষ্ট করা থাকে, ঠিক যেমন হেরিং মাছ ধরার ব্যাপারে। একজন মানুষ একটি স্বাভাবিক দিবস থেকে, ধরুন, ১২ ঘণ্টার বেশি একটি শ্রম-দিবস বার করে নিতে পারে না, কিন্তু পরস্পরের সহযোগকারী ১০০ গুন মানুষ ১২… ঘন্টা পর্যন্ত একটি শ্রম-দিবসকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। উক্ত কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময়কালের এই যে হ্রাস-সাধন, তা পুষিয়ে দেওয়া হয় উৎপাদন ক্ষেত্রে উপযুক্ত সময়ে বিপুল পরিমাণ শ্রম কাজে লাগিয়ে দিয়ে। যথাচিত সময়ের মধ্যে কর্তব্য-কৰ্মটি সম্পূর্ণ হবে কিনা তা নির্ভর করে বহুসংখ্যক সংযোজিত শ্রম-দিবসের প্রয়োগের উপরে, প্রয়োজনীয় ফলের পরিমাণ নির্ভর করে শ্রমিকের সংখ্যার উপরে, কিন্তু ঐ একই সময়ের মধ্যে একই পরিমাণ কাজ করতে যতজন বিচ্ছিন্ন শ্রমিকের দরকার হয় তাদের সংখ্যার তুলনায় উপরিলিখিত শ্রমিকদের সংখ্যা সব সময়েই কম।[১০] এই ধরনের সহযোগের অভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাংশে বিপুল পরিমাণ শস্য এবং পূর্ব ভারতের সেই সব অংশে, যেখানে ইংরেজ প্রাচীন জন-সমাজগুলিকে ধ্বংস করে দিয়েছে, সেখানে বিপুল পরিমাণ তুলো প্রতি বছর নষ্ট হয়।[১১]
এক দিকে, সহযোগের কাজটিকে একটি বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়; এর জন্য কয়েক ধরনের প্রতিষ্ঠান আবশ্যিক ভাবেই প্রয়োজন হয়; যেমন পয়ঃপ্রণালীর সংস্থান, বাঁধ ( ডাইক) নির্মাণ, সেচের বন্দোবস্ত এবং খাল, রাস্তা ও রেলপথের ব্যবস্থা। অন্যদিকে, উৎপাদনের আয়তন সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এর কারণে সম্ভব হয় কর্মাঙ্গনের পরিধির সংকোচ সাধন। আয়তনের সম্প্রসারণ, যার ফলে অনেক অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের কাটছাট করা সম্ভব হয়—সেই আয়তনগত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে যুগপৎ বা তজ্জনিত কৰ্মাঙ্গনের সংকোচন ঘটে শ্রমিকদের একত্রীভবন, বিবিধ প্রক্রিয়ার সংযোজন এবং উৎপাদনের উপায়-উপকরণের কেন্দ্রীভবন থেকে।[১২]
