এমনকি কাজের ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন ব্যতিরেকে, এক বিরাট-সংখ্যক শ্রমিকের যুগপৎ নিয়োগের ফলেই শ্রম-প্রক্রিয়ায় বাস্তব অবস্থাবলীতে একটি বিপ্লব ঘটে যায়। যে বাড়িটিতে তারা কাজ করে, যে ভাড়ার-বাড়িতে কাঁচামাল রক্ষিত হয়, যেসব সরঞ্জাম বা বাসনপত্র শ্রমিকেরা যুগপৎ বা পর্যায়ক্রমে ব্যবহার করে, সংক্ষেপে উৎপাদনের উপায় উপকরণের একটা অংশ এখন সকলে যৌথ ভাবে পরিভোগ করে। এক দিকে, উৎপাদনের এইসব উপায়-উপকরণের বিনিময়মূল্য বর্ধিত হয়, কেননা কোন পণ্যের ব্যবহার-মূল্য অধিকতর পরিপূর্ণ ভাবে ও আরো বেশি সুবিধাজনকভাবে পরিভুক্ত হলেই তার বিনিময়মূল্য বৃদ্ধি পায় না। অন্য দিকে,এই উপায়-উপকরণগুলি ব্যবহৃত হয় যৌথভাবে এবং কাজে কাজেই আগের তুলনায় বৃহত্তর আয়তনে। যে ঘরটিতে ২০ জন। তন্তুবায় কাজ করে ২০টি সঁতে, সেটি নিশ্চয়ই যে ঘরটিতে একজন তন্তুবায় তার দুজন সহকারীকে নিয়ে কাজ করে, তা থেকে বড় হবে। কিন্তু প্রতি কর্মশালায় দুজন করে তন্তুবায়ের স্থান সংকুলান হয় এমন দশটি কর্মশালার তুলনায় কুড়ি জন লোকের একটি মাত্র কর্মশালা নির্মাণ করতে কম খরচ হয়। সুতরাং দেখা যায়, বৃহায়তনে যৌথ ব্যবহারের জন্য উৎপাদনের উপায়াদি সংকেন্দ্রীভূত করলে, তার মূল্য সেই উপায়াদি সম্প্রসারণ ও তাদের ব্যবহারিক ফলবৃদ্ধির সঙ্গে প্রত্যক্ষ অনুপাতে বুদ্ধি পায় না। যখন যৌথভাবে পরিভুক্ত হয়, তারা প্রত্যেকটি উৎপাদিত দ্রব্যে তাদের মূল্যের একটি ক্ষুদ্রতর অংশ স্থানান্তরিত করে। এর আংশিক কারণ এই যে, তারা যে-মোট মূল্য হাতছাড়া করে, তা বৃহত্তর সংখ্যক দ্রব্যের মধ্যে বিস্তার লাভ করে এবং আরেকটি আংশিক কারণ এই যে, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় তাদের কর্মপরিধির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের মূল্য উৎপাদনের বিচ্ছিন্ন উপায়-উপকরণের মূল্য থেকে অনাপেক্ষিক ভাবে বেশি হলেও আপেক্ষিক ভাবে কম। এই কারণে স্থির মূলধনের একটি অংশের মূল্য হ্রাস পায় এবং এই হ্রাস-প্রাপ্তির আয়তনের সঙ্গে আনুপাতিক ভাবে পণ্যটির মূল্যও হ্রাস পায়। ফলটা এমন হয় যেন উৎপাদনের উপায়-উপকরণের খরচে কমে গিয়েছে। তাদের প্রয়োগে এই যে ব্যয়-হ্রাস, তার সামগ্রিক কারণ এই যে, তারা পরিভুক্ত হচ্ছে। বিরাট-সংখ্যক শ্রমিকের দ্বারা যৌথ ভাবে। অধিকন্তু, সামাজিক এমের আবশ্যিক শর্ত হবার এই চরিত্র—এমন একটি চরিত্র যা বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র শ্রমিকদের, কিংবা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধনিকদের, বিক্ষিপ্ত ও আপেক্ষিক ভাবে বেশি ব্যয়সাধ্য উৎপাদন-উপায় সমূহ থেকে তাদের বিশিষ্টতা দান করে—সেই চরিত্র অর্জিত হয় এমনকি যখন একত্র সমবেত অসংখ্য শ্রমিক পরস্পরকে সহায়তা না-ও করে, কিন্তু কেবল পাশাপাশি কাজ করে। শ্ৰম-প্রক্রিয়া নিজে এই চরিত্র অর্জন করার আগেই শ্রমের উপকরণাদির অংশবিশেষ তা অর্জন করে।
উৎপাদনের উপায়-উপকরণে ব্যয়-সংকোচকে দুদিক থেকে বিবেচনা করে দেখতে হবে। প্রথমত, পণ্যের মূল্য হ্রাস এবং তারা শ্রমশক্তির মূল্য হ্রাসের দিক থেকে। দ্বিতীয়ত, অগ্রিম-প্রদত্ত মোট মূলধনের উত্তমূল্যের অনুপাতের সঙ্গে অর্থাৎ স্থির ও অস্থির মূলধনের মূল্যের মোট অঙ্কের সঙ্গে পরিবর্তনের দিক থেকে। এই দ্বিতীয় দিকটি তৃতীয় গ্রন্থে উপনীত হবার আগে বিবেচনা করা হবে না যাতে সেগুলিকে তাদের যথোচিত পটভূমিকায় আলোচনা করা যায়; উপস্থিত প্রশ্নটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো অনেক বিষয় আমরা মুলতুবি রাখছি, আমাদের বিশ্লেষণের অগ্রগতি আমাদের বাধ্য করছে বিষয়বস্তুটিকে এইভাবে দুভাগে ভাগ করতেধনতান্ত্রিক উৎপাদনের প্রকৃতির সঙ্গে যে ভাগ খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা, যেহেতু এই উৎপাদন-পদ্ধতিতে শ্রমিক দেখে যে শ্রমের উপায়-উপকরণগুলি স্বতন্ত্র ভাব বিদ্যমান থাকে অন্য একজনের সম্পত্তি হিসাবে, সেহেতু তার কাছে ব্যয়সংকোচন প্রতিভাত হয় একটি পৃথক ব্যাপার হিসাবে-এমন একটি ব্যাপার, যার সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই এবং সেই কারণেই, যেসব পদ্ধতির জ্বারা তার উৎপাদনশীলতা বর্ধিত হয়, সেইসব পদ্ধতির সঙ্গেও যার কোনো যোগ নেই।
যখন বহুসংখ্যক শ্রমিক পাশাপাশি কাজ করে, তা সে এক অভিন্ন প্রক্রিয়াটি হোক কিংবা বিভিন্ন অথচ পরস্পর-সংযুক্ত প্রক্রিয়াতেই হোক, তারা সহযোগ করছে কিংবা তারা সহযোগিতায় কাজ করছে বলে কথিত হয়।[৩]
ঠিক যেমন এক স্কোয়াড্রন ঘোড়-সওয়ারের আক্রমণ-ক্ষমতা কিংবা এক রেজিমেন্ট পদাতিকের প্রতিরক্ষা-ক্ষমতা ঐ সওয়ারদের বা পদাতিকদের আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত ক্ষমতার যোগফল থেকে মূলতঃ ভিন্ন, ঠিক তেমনি একটি ভারি ওজন উত্তোলন, একটি হাতল আবর্তন, একটি প্রতিবন্ধক অপসারণ ইত্যাদির মত একটি অখণ্ড কর্মকাণ্ডে গত শত হাতের যুগপৎ অংশগ্রহণে যে সামাজিক শক্তির অভ্যুদয় ঘটে, আলাদা আলাদা ভাবে সেই সামাজিক শক্তিটি থেকে এক একজন শ্রমিক যে যান্ত্রিক শক্তির প্রয়োগ ঘটায়, সেই যান্ত্রিক শক্তিগুলির যোগফল মূলতঃ ভিন্ন।[৪] এই ধরণের ক্ষেত্রগুলিতে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত শ্রম, হয়, সম্মিলিত শ্রমের যা উৎপাদন ফল, তা উৎপন্ন করতে পারে না আর, নয়তো, যদি পারেও তা হলে তাতে ব্যয় করতে হবে বিপুল পরিমাণ সময় আর, নয়তো, তা উৎপন্ন করতে হবে একান্ত স্বীকৃত আয়তনে। সহযোগের মাধ্যমে আমরা যে এখানে কেবল উৎপাদিকা শক্তিবৃদ্ধিই করতে পারি তাই নয়, উপরও একটি নোতুন শক্তির সৃষ্টিও করতে পারিসে শক্তি হল গণশক্তি।[৫]
